‘ঠিকমতো ভাতই জোটে না। এত দামের খেজুর খামু কীভাবে? বাজারে এসে খেজুরের দাম শুইনা ভয় পাইছি। জিনিসপাতির যে দাম, রমজান মাসে চলমু কীভাবে হেইডা নিয়াই চিন্তায় আছি। খেজুর কেনাতো দূরের কথা। খেজুরের দাম বাড়ায় বাজারে এসে এভাবে নিজের আক্ষেপের কথা বলছিলেন বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে ফুটপাথের কাপড় ব্যবসায়ী রোকন উদ্দিন। তিনি বলেন, খেজুর ছাড়া ইফতারি জমে না। কিন্তু এইবার মনে হয় খেজুর খেতে পারমু না। দোকানে গেলাম নরমাল খেজুরই কেজি ৩০০ টাকা চায়। এই খেজুর কয়েকমাস আগেই ১২০ টাকায় নিয়েছি। রমজান আইলেই সবকিছুর দাম বাড়ে।
পল্টনের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সানজিদা আক্তার বলেন, রমজানে পুরো মাসের খেজুর একবারে কিনে রাখি। এবারও ৫ কেজি খেজুর কিনে রাখতে চেয়েছিলাম। তা আর হবে না। বাজারে গিয়ে দেখি খেজুরের দাম অনেক বেড়ে গেছে। দাম এতো বেড়েছে যে ১ কেজি কিনতেই সাহস পাচ্ছি না। ৫ কেজিতো দূরের কথা। মনে হচ্ছে এই রমজানে ফলমূল পাতে তোলা কষ্ট হবে। তিনি বলেন, আগে নিয়মিত ফল খেতাম, এখন আর খাই না। এখন ৩ বেলা খেতে পারলেই বাঁচি।
খুচরা বাজারে সাধারণ খেজুরের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ৮০ টাকা বেড়েছে। ভালো মানের খেজুরের দাম কেজিতে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। প্রকারভেদে কিছু কিছু ব্র্যান্ডের খেজুরে ১০০ থেকে ১৫০ টাকাও বেড়েছে।
ফল আমদানিকারক মো. নাসের আহমেদ বলেন, আগে আমরা এলসি খুললে ব্যাংকে বাকি করতাম। এখন বাকির কোনো সিস্টেম নাই। আগে টাকা দেও, পরে সিরিয়ালে থাকো। ১০ কনটেইনার চাহিদা থাকলে দেয় দুই কনটেইনার। এতে ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে পারি না। কোনো ব্যাংক যদি এলসি না দেয়, তাহলে খেজুর-ফল সব জিনিসেরই বাজারে সংকট থাকবে। এতে দাম এমনিতেই বেড়ে যাবে।
পল্টনের ফল ব্যবসায়ী আব্দুর রব মিয়া বলেন, খেজুরের দাম যে নতুন বেড়েছে তা নয়। তিন চার মাস আগেই বেড়েছে। তবে রমজানের আগে আবার বাড়ানো হয়েছে। এখন জাতভেদে বিভিন্ন খেজুর কেজিতে প্রায় ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেড়েছে। তবে উন্নত জাতের খেজুর ১৫০ থকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। দাম বেশি হওয়ায় খেজুরের ক্রেতাও কমে গেছে। আগে রমজানের এক সপ্তাহ আগেই খেজুরের টান থাকতো, এখন কেউই খেজুর নিতে চায় না। দাম শুনেই, চলে যায়। দাম বাড়ায় ক্রেতাদের নানান প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে। তবে আমাদের কিন্তু কিছু করার নেই।
কাওরান বাজারের খেজুর বিক্রেতা রহমত উল্যাহ বলেন, সবাই কম দামে খেজুর ও ফলমূল কিনতে কাওরান বাজারে আসে। কিন্তু আমরাও এখন কম দামে দিতে পারছি না। তাই অনেকে দাম শুনে ফেরত যাচ্ছে। বেচা-বিক্রিও অর্ধেকে নেমে এসেছে। এভাবে চললে ব্যবসা লাটে উঠবে। আর সব জিনিসের দাম বাড়ছে, খেজুরের দাম তো বাড়বেই। এই দোকানি জানান, তার দোকানে ১০-১২ পদের খেজুর আছে। সব খেজুরেই কেজিতে গড়ে ৫০-১০০ টাকা দাম বেড়েছে।
বায়তুল মোকাররম ও কাওরান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা বাজারে খেজুরের দাম অনেক বেড়েছে। মানভেদে ফলটির দাম বেড়েছে অন্তত ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। জাত ও আকারভেদে দামে কিছুটা তারতম্য রয়েছে। মাবরুর খেজুর প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা, দাবাস প্রতি কেজি ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা, নাগাল খেজুর কেজি প্রতি বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা দরে, জাহিদী খেজুর প্রতি কেজি ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, মরিয়ম খেজুর ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা, মেডজুল খেজুর ৯০০ থেকে ১২০০ টাকা, আম্বার খেজুর ৮০০ টাকা, কালমী খেজুর ৬০০ থেকে ৭৫০ টাকা, আজওয়া কেজি প্রতি ৮০০ থেকে ১০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, দাবাস খেজুর ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা, সাদা খুরমা ৩২০ টাকা, তিউনিশিয়ান ফিট প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, মাশরুখ কেজি ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকা, খালাশ ২২০ টাকা, বরই খেজুর ২৮০ টাকা, ফরিদা প্রতি কেজি ৪০০ টাকা, সুতকারি ৬০০ টাকা, মিনিখি ২৫০ টাকা, নারকেল ৩০০ টাকা।
ঢাকা মহানগর ফল আমদানি-রপ্তানিকারক ও আড়তদার ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম শেখ বলেন, কয়েক মাস ধরেই এলসি খোলা যাচ্ছে না। ছোট ছোট আমদানিকারকরা বড় ইম্পোর্টারদের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে এতে খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে। কারণ বড় ইম্পোর্টারদেরও খেজুর আনতে টাকা দিতে হচ্ছে। আবার ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে বেশি দামে আমদানি করতে হচ্ছে। আমদানিতে যেটুকু খরচ বেড়েছে, খেজুরের দাম সেটুকু সমন্বয় হচ্ছে।
রমজানের আগে খেজুরের বাজারে ভিড় থাকে প্রতিবছর। পাইকারি আড়তে ব্যবসায়ীরা ভিড় করেন খেজুর কিনতে। কিন্তু এবারের চিত্র একটু ভিন্ন। ভিড় কম। বেচাকেনাও আগের বছরের তুলনায় কম। ব্যবসায়ীরা বলছেন বেশ কিছু কারণে এবার বেচাকেনা কম। এর অন্যতম কারণ দাম বৃদ্ধি। বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে এবার আমদানি করা খেজুরের দাম বেড়েছে। এ ছাড়া অন্যসব পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ায় খেজুরের ক্রেতা কমে গেছে। কারণ মানুষ আগে জরুরি প্রয়োজনীয় পণ্য কিনছে। খুচরা বাজারে অতিরিক্ত দাম বাড়ার কারণেও বিক্রি কম হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, পাইকারিতে ১০ কেজির কার্টন প্রতি ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। বাদামতলী বাজারের আল আনসর এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী বিল্লাল হোসেন বলেন, গত বছরের তুলনায় খেজুরের দাম অনেক বেড়েছে। দাম বাড়ার কারণে বিক্রির পরিমাণ অর্ধেকে নেমেছে। আগে যারা ১০ কার্টন খেজুর কিনতেন, তারা এখন ৫ কার্টন কিনছেন। কারণ হিসেবে তিনি খেজুরের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার কথা জানান। বলেন, গত বছর দশ হাজার টাকা দিয়ে ১০ কার্টন খেজুর কেনা গেলেও সেই টাকা দিয়ে এবার ৬ কার্টনের বেশি কেনা সম্ভব না। এই বাজারে ক্রেতার সংখ্যাও অনেক কমেছে বলে জানান পাইকারি এই বিক্রেতা। তিনি বলেন, সাধারণত রোজার কয়েকদিন আগে বাদামতলী বাজারে ক্রেতাদের জায়গা দেয়া যায় না। কম দামে খেজুর কিনতে এখানে অনেক ক্রেতা আসে। কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সারা দিনে মাত্র কয়েকজন ক্রেতা আসে। তিনি বলেন, এটা মূলত সব জিনিসের দাম বাড়ার প্রভাবে হচ্ছে। কারণ, মানুষকে আগে ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে হবে, শখ করে কিছু খাওয়া তো পরের বিষয়।
একই কথা জানিয়ে এই বাজারের মেসার্স আর জেড এন্টারপ্রাইজের শামিম হোসেন বলেন, সব ধরনের খেজুরের দাম বেড়েছে। কার্টনপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। গত বছরের চেয়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ দাম বেড়েছে। এতে বিক্রির পরিমাণও অনেক কমেছে। আগে যারা ৫ কার্টন খেজুর নিতেন, তারা এখন ২ কার্টনের বেশি খেজুর নিচ্ছেন না। অর্ধেক বিক্রি কমে গেছে। রমজানের সময়ই মূলত খেজুরের ব্যবসা ভালো হয়। অন্যান্য সময় তেমন বিক্রি হয় না। বিক্রি কমলে আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হই।
সোনার বাংলা এন্টারপ্রাইজের আবিদ লিও বলেন, খেজুরের দাম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। কম দামের জিহাদী খেজুর গত বছর বিক্রি হয়েছিল ৯০০ টাকায়, এই খেজুরের দাম বেড়ে এবার ১৩৫০ থেকে ১৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে প্রতি কার্টন। দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া বড়ই খেজুরের দাম গত বছর ছিল ১৮০০ টাকা, কিছুদিন আগে ছিল ২৩০০ টাকা আর এখন ২৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কয়েকদিনের ব্যবধানে এতো দাম বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, আমদানিকারকদের কাছে খেজুর চাইলে পর্যাপ্ত পরিমাণে দিচ্ছে। খেজুরের কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু দাম নিচ্ছে বেশি। নগদ টাকা ছাড়া তাদের থেকে কোনো খেজুর পাওয়া যাচ্ছে না।
বাদামতলী বাজারের বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে ৫ কেজির এক কার্টন মাবরুম খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায়। গত বছর এই খেজুরের দাম ছিল সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৩০০ টাকা। এক কার্টন নাগাল খেজুর বিক্রি হচ্ছে ২৫০০ টাকায়। গত বছর যা ছিল ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকা। আবার ১০ কেজির দাবাস কার্টন বিক্রি হচ্ছে ২৫০০ টাকায়। গত বছর দাবাস খেজুরের দাম ছিল ২৪০০ টাকা। দশ কেজির এক কার্টন লুলু খেজুর বিক্রি হচ্ছে ২৫০০ টাকায়, আগের বছর এই খেজুরের দাম ছিল সর্বোচ্চ ১৭০০ টাকা। এ ছাড়া ৫ কেজির মরিয়ম বিক্রি হচ্ছে ৪০০০ টাকা, কালনী ২৯০০ থেকে ৩০০০ টাকা, আজুয়া ৩৫০০ টাকা, রাবেয়া ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকা, ৫ কেজির মাসরুর ২২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এসব খেজুরের দাম কার্টনপ্রতি ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
কম দামে খেজুর কিনতে বাদামতলী বাজারে আসা ফরিদ আহমেদ বলেন, ২ দিন পর রোজা শুরু হচ্ছে। রোজার মাসে খেজুর ছাড়া আসলে হয় না। এজন্য এখানে খেজুর কিনতে এসেছি। কিন্তু এসে দেখলাম গত বছরের চেয়ে এবার খেজুরের দাম অনেক বেশি। যে পরিমাণ খেজুর কিনবো ভাবছিলাম সেটি আর কেনা হলো না। আরেক ক্রেতা রাশেদুল ইসলাম বলেন, খেজুর ছাড়া ইফতারি জমে না। প্রতি বছরই এখান থেকে কিছুটা কম দামে খেজুর কিনতে আসি। অন্য বাজারের চেয়ে এখানে কিছুটা হলেও কম পাওয়া যায়। কিন্তু এবার এখানেও খেজুরের দাম অনেক বেশি। এক কার্টন খেজুর কিনতে ৩ হাজার টাকা লাগছে। এই খেজুরই গত বছর ২ হাজার টাকায় কিনেছিলাম।
কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, অতি মুনাফালাভের মানসিকতা থেকে ব্যবসায়ীরা খেজুরের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে দিয়েছে। তাছাড়া খেজুরের দাম এতটা বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত খেজুরের মজুত রয়েছে। তিনি বলেন, অন্যান্য পণ্য বিশেষ করে চাল, ডাল ও তেলের বাজার যেভাবে মনিটরিং করার উদ্যোগ নেয়া হয়, খেজুরের ক্ষেত্রে সেটি দেখা যায় না। এটা ট্যারিফ কমিশনের আওতায় বিশ্লেষণ করা হচ্ছে না, সেই সুযোগটা নিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। তিনি আরও বলেন, পার্শ্ববর্তী ভারতে কোনো পণ্যের দাম বাড়লে মানুষ সেই পণ্য কেনা কমিয়ে দেয়। ফলে তার দাম কমে যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশে কোনো জিনিসের দাম বাড়লে মানুষ সেই জিনিস আরও বেশি করে কেনে। এতে জিনিসের দাম আরও বাড়তে থাকে। এই অভ্যাসটা পরিবর্তন করা দরকার। এটা করা গেলে মুনাফালোভীরা সুবিধা করতে পারবে না।