দেশের ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য ও সক্ষমতা মূল্যায়ন পদ্ধতি ক্যামেলস রেটিং ব্যবস্থা বন্ধ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। এখন থেকে ব্যাংকগুলোর সার্বিক ঝুঁকি ও ব্যবস্থাপনা মূল্যায়ন করতে কম্পোজিট রিস্ক রেটিং (সিআরআর) ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। নতুন এই ব্যবস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিস্ক বেসড সুপারভিশন (আরবিএস) বা ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি কাঠামোর অংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এতদিন ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা, সম্পদের গুণগত মান, ব্যবস্থাপনা, আয়, তারল্য এবং বাজার ঝুঁকির সংবেদনশীলতা—এ ছয়টি সূচকে একটি ব্যাংকের অতীত ও বর্তমান আর্থিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে ক্যামেলস রেটিং করা হতো। ব্যাংকের সামগ্রিক আর্থিক স্বাস্থ্য মূল্যায়নের অন্যতম মানদণ্ড ছিল এই পদ্ধতি।
ক্যামেলস রেটিংয়ে ব্যাংকগুলোকে এক থেকে পাঁচ পর্যন্ত স্কোর দেওয়া হতো। এর মধ্যে এক মানে সবচেয়ে ভালো এবং পাঁচ মানে সবচেয়ে দুর্বল বা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংক। এই রেটিং পুরোপুরি গোপন রাখা হতো। কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর কাছেই তা জানানো হতো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ক্যামেলস পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল—এটি মূলত ব্যাকওয়ার্ড লুকিং বা অতীতভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা। অর্থাৎ, কোনো ব্যাংক গত তিন বা ছয় মাসে কী ধরনের ব্যবসা করেছে কিংবা তাদের আর্থিক প্রতিবেদনের অবস্থা কেমন ছিল, তার ভিত্তিতেই রেটিং নির্ধারণ করা হতো। ফলে ভবিষ্যতে কোনো ব্যাংক সংকটে পড়ার ঝুঁকি থাকলেও তা এই রেটিংয়ে আগেভাগে ধরা পড়ত না।
এর পরিবর্তে চালু হওয়া কম্পোজিট রিস্ক রেটিং (সিআরআর) হবে ফরওয়ার্ড লুকিং বা ভবিষ্যৎমুখী মূল্যায়ন পদ্ধতি। এটি শুধু ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক অবস্থাই মূল্যায়ন করবে না, বরং ভবিষ্যতে কী ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে এবং সেই ঝুঁকি মোকাবিলার মতো আর্থিক সক্ষমতা ব্যাংকটির আছে কি না, তাও আগাম মূল্যায়ন করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নথিতে বলা হয়েছে, ক্যামেলস ও অন্যান্য সমান্তরাল রেটিং ব্যবস্থা চালু থাকলে কাজের পুনরাবৃত্তি হয়, তদারকি কর্মকর্তাদের সময় নষ্ট হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে দুই পদ্ধতির ফলাফলে অমিল দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই পুরো তদারকি প্রক্রিয়াকে আরো সমন্বিত ও কার্যকর করতে ক্যামেলস রেটিং বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, নতুন তদারকি ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরেও বড় ধরনের প্রশাসনিক পুনর্গঠন করা হয়েছে। তদারকি ও অভিযোগ-সংক্রান্ত কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস করে ১৭টি নতুন ব্যাংক সুপারভিশন বিভাগ গঠন করা হয়েছে এবং আগের কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ নথিতে আরো বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যেমন—ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক, পাকিস্তানের স্টেট ব্যাংক এবং ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে ক্যামেলস পদ্ধতির পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী ঝুঁকিভিত্তিক রেটিং ব্যবস্থা চালু করেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নতুন সিআরআর ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো ব্যাংকে বড় ধরনের সংকট তৈরির আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য আগাম সতর্কবার্তা বা আর্লি ওয়ার্নিং সিগন্যাল হিসেবে কাজ করবে। ফলে ব্যাংকিং খাতের তদারকি আরো কার্যকর হবে এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
নতুন এই কাঠামোকে দূরদর্শী বলে মনে হলেও ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, এর সাফল্য কাঠামোর ডিজাইনের চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করার সদিচ্ছার ওপর বেশি নির্ভর করবে।
ক্যামেলস রেটিং মূলত তার নির্ভরযোগ্যতা হারিয়েছিল। কারণ অনেক ব্যাংক খেলাপি ঋণ লুকিয়ে, খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) না রেখে এবং মূলধন ঘাটতি বজায় রেখেও তদারকি সূচকগুলোয় কৃত্রিমভাবে ভালো ফলাফল দেখাত। আর বাংলাদেশ ব্যাংক ক্যামেলস রেটিং মূল্যায়ন করত এবং তারা এসব কারসাজির বিষয় জেনেও চুপ ছিল। পাশাপাশি এসব কারসাজির বিষয়ে কোনো অর্থপূর্ণ শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই বারবার ব্যাংকগুলোকে প্রভিশন ও মূলধন সংরক্ষণের শর্ত শিথিল করে দিয়েছে। নামমাত্র ডাউন পেমেন্টে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ দিয়ে এবং পরিদর্শনে গুরুতর অনিয়ম চিহ্নিত হওয়ার পরও বড় কোনো জরিমানা না করে নীতিগত ছাড় দিয়ে আসছিল। এসব ছাড়ের কারণে আর্থিকভাবে সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোও তাদের প্রকৃত অবস্থার চেয়ে নিজেদের অনেক বেশি ভালো হিসেবে জাহির করার সুযোগ পেত, যা তদারকি রেটিংয়ের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন তুলত।
২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই দুর্বলতাগুলো আরো স্পষ্টভাবে সামনে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তথ্যেই দেখা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণের ৬০ শতাংশের সমান।