শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ০৩:০৮ অপরাহ্ন




শোকাবহ পবিত্র আশুরা আজ

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬ ১:০২ pm
আশুরা রোজা রমজান রোজা sobe borat Shab e Barat namaz রজনী নিসফে শাবান‎ লাইলাতুল বরাত শা'বান মাস ইবাদত বন্দেগি শবে বরাত প্রার্থনা মুসলিম উম্মা মহিমান্বিত রাত শবে বরাত নফল ইবাদত কোরআন তেলাওয়াত জিকির-আসকার জিকির আসকার মোনাজাত ফজিলত ধর্মপ্রাণ মুসলমান Sehri Iftar শবে মেরাজ শবেমেরাজ ইসলাম islam eid e miladunnanabi Eid Milad un Nabi Rabi al awwal রবিউল আউয়াল ঈদে মিলাদুন্নবী Rabi al-Awwal eid মুহাম্মদ সা রবিউল আউয়াল ঈদeid e miladunnanabi Eid Milad un Nabi Rabi al awwal রবিউল আউয়াল ঈদে মিলাদুন্নবী
file pic

আজ ১০ মহররম, পবিত্র আশুরা। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে দিনটি শোকের। ৬১ হিজরির এই দিনে ফোরাত নদীতীরবর্তী কারবালার ময়দানে শহীদ হন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসেন (রা.)। তিনি হজরত আলি (রা.) ও হজরত ফাতেমার (রা.) পুত্র। হজরত আলির মৃত্যুর পর খলিফা হন হজরত মুয়াবিয়া (রা.)। জীবদ্দশাতেই তিনি পুত্র ইয়াজিদকে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন।

তবে ইয়াজিদের কাছে বায়াত নিতে অস্বীকৃতি জানান ইমাম হোসেন (রা.)। প্রতিবাদে মদিনা ছেড়ে কুফায় হিজরতের জন্য যাত্রা করেন তিনি। পরে কারবালা ময়দানে সঙ্গীদের নিয়ে যাত্রাবিরতি করেন। ইমাম হোসেন (রা.) ও তাঁর অনুসারীদের আটক করে মদিনায় ফিরিয়ে নিতে ইয়াজিদের নির্দেশে উমর ইবনে সাদ বিন আবি ওক্কাসের নেতৃত্বে চার হাজার সৈন্য কারবালায় প্রবেশ করে।

আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে ইমাম হোসেনের শিবিরে পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয় তারা। পানির অভাবে কাফেলার নারী-শিশুরা তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়লেও ইমাম হোসেন আত্মসমর্পণে অস্বীকৃতি জানান। ১০ মহররম অবরোধের বিরুদ্ধে অসম এক যুদ্ধে ইমাম হোসেন ও তাঁর ৭২ সঙ্গী শহীদ হন। সিমার ইবনে জিলজুশান কণ্ঠদেশে ছুরি চালিয়ে ইমাম হোসেনকে হত্যা করে।

ইসলাম ধর্মমতে, ১০ মহররম আশুরার দিনেই কেয়ামত হবে। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদিসে এসেছে, মহানবী (সা.) এই দিনে রোজা রাখতেন। কারবালার শোকাবহ স্মরণ ছাড়াও মুসলমানদের কাছে ১০ মহররম গুরুত্বপূর্ণ দিন। শিয়া মতাবলম্বীরা ইমাম হোসেনের শোকে এই দিনে মাতম করেন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হয় তাজিয়া মিছিল।

এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আলাদা বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী তাদের বাণীতে পবিত্র আশুরার মহান শিক্ষা ধারণ করে একটি শান্তিপূর্ণ, মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এ উপলক্ষে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বেসরকারি গণমাধ্যমগুলো দিনটির তাৎপর্য তুলে ধরে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করবে।

দিবসটি উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বায়তুল মোকররমের দক্ষিণ বারান্দায় ‘আশুরার গুরুত্ব ও তাৎপর্য’ শীর্ষক আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

আশুরার তাৎপর্য ও ইবাদত

মহররম ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম। এ মাসের দশম দিন—অর্থাৎ আশুরা, ইসলামের ইতিহাসে এক বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন ও বরকতময় দিন হিসেবে পরিগণিত। যুগে যুগে এ দিনটি বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছে। তবে দুঃখজনকভাবে আশুরাকে কেন্দ্র করে সমাজে বহু বানোয়াট কাহিনি, দুর্বল বর্ণনা এবং ভিত্তিহীন বিশ্বাসও প্রচলিত রয়েছে। তাই এ দিনের প্রকৃত গুরুত্ব ও ফজিলত সহিহ হাদিসের আলোকে জানা জরুরি।

আশুরার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য

সহিহ হাদিস থেকে আশুরা সম্পর্কে যে বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, সেগুলো হলো—

১. এটি একটি বরকতময় ও সম্মানিত দিন

আশুরা ইসলামের দৃষ্টিতে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ একটি দিন। এ দিনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আল্লাহতায়ালার অসংখ্য অনুগ্রহ ও রহমতের স্মৃতি।

২. এ দিনে মুসা (আ.) ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি লাভ করেন

আল্লাহতায়ালা এ দিনে বনী ইসরাইলকে তাদের চিরশত্রু ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দান করেন এবং ফেরাউনকে তার বাহিনীসহ সাগরে ডুবিয়ে ধ্বংস করেন।

৩. মুসা (আ.) শুকরিয়াস্বরূপ রোজা পালন করতেন

এই মহান নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য মুসা (আ.) আশুরার দিনে রোজা পালন করতেন। (বুখারি : ২০০৪; মুসলিম : ২৬২৫)

৪. রাসুলুল্লাহ (সা.) রোজা রাখতেন এবং অন্যদেরও উৎসাহিত করতেন

প্রিয়নবী (সা.) আশুরার রোজা পালন করতেন এবং সাহাবায়ে কেরামকেও এ রোজার প্রতি উৎসাহিত করতেন। (মুসলিম : ২৬২৫)

৫. এ দিনে কাবা শরিফে গিলাফ পরানো হতো

জাহিলি যুগে এবং ইসলামের প্রারম্ভিক সময়ে আশুরার দিনে কাবা শরিফে নতুন গিলাফ পরানোর প্রচলন ছিল। (বুখারি : ১৫৯২) বর্তমানে এই ঐতিহ্য সৌদি সরকার ১ মহররমে সাড়ম্বরে পালন করে আসছে। এ বছরও মহররমের প্রথম দিন কাবার গিলাফ পরিবর্তন করা হয়েছে।

৬. খায়বারের ইহুদিরা এ দিনকে উৎসবের দিন হিসেবে পালন করতেন

খায়বারের অধিবাসীরা আশুরার দিনে রোজা রাখতেন এবং এটিকে আনন্দ-উৎসবের দিন হিসেবে গণ্য করতেন। (মুসলিম : ২৬২১)

৭. কুরাইশরাও জাহিলি যুগে আশুরার রোজা পালন করতেন

মক্কার কুরাইশ গোত্র ইসলাম-পূর্ব যুগেও এ দিনে রোজা রাখতেন। (মুসলিম : ২৬৩৭)

আশুরার রোজার ফজিলত

১. বিগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা

আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—‘আমি আল্লাহতায়ালার কাছে আশা রাখি যে, আশুরার দিনের রোজা বিগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা হয়ে যাবে।’ (মুসলিম : ১১৬২)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আশুরার রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন—‘এটি বিগত এক বছরের গুনাহ মুছে দেয়।’ (মুসলিম : ২৮০৪)

২. রমজানের পর সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ নফল রোজা

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আশুরার দিনের মতো অন্য কোনো দিনের রোজাকে এত গুরুত্ব দিতে দেখিনি। অনুরূপভাবে রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাসের রোজাকেও তিনি এত গুরুত্ব দেননি। (মুসলিম : ১১৩২)

বিভিন্ন সময়ে আশুরার রোজার বিধান

হাদিসগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আশুরার রোজার বিধান ধাপে ধাপে বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করেছে।

প্রথম পর্যায় : মক্কা জীবন

রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কায় অবস্থানকালে নিজে আশুরার রোজা পালন করতেন; তবে সাধারণ মুসলমানদের জন্য বিশেষভাবে এর নির্দেশ দিতেন না। আয়েশা (রা.) বলেন, জাহিলি যুগে কুরাইশরা আশুরার রোজা পালন করত এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও এ রোজা রাখতেন। (বুখারি : ২০০২; মুসলিম : ১১২৫)

দ্বিতীয় পর্যায় : মদিনায় আগমনের পর

মদিনায় হিজরতের পর নবী (সা.) লক্ষ্য করলেন, ইহুদিরা এ দিনে রোজা পালন করছে। কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা জানায়, এ দিনে আল্লাহতায়ালা মুসা (আ.) ও তার সম্প্রদায়কে মুক্তি দিয়েছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন—‘মুসা (আ.)-এর সঙ্গে সম্পর্কের দিক থেকে আমরা তোমাদের চেয়ে অধিক হকদার।’ অতঃপর তিনি নিজে রোজা রাখলেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। (বুখারি : ২০০৪; মুসলিম : ২৫২৬)

এ পর্যায়ে আশুরার রোজার প্রতি এত গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল যে, সাহাবায়ে কেরাম তাদের শিশুসন্তানদেরও রোজা রাখতে উৎসাহিত করতেন। (বুখারি : ১৯৬০; মুসলিম : ১১৩৬)

তৃতীয় পর্যায় : রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর

যখন রমজানের রোজা ফরজ করা হলো, তখন আশুরার রোজা আর বাধ্যতামূলক রইল না। বরং এটি নফল আমলে পরিণত হলো। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেনÑ‘যে ইচ্ছা করবে আশুরার রোজা রাখবে আর যে ইচ্ছা করবে রোজা রাখবে না।’ (বুখারি : ২০০১)

চতুর্থ পর্যায় : জীবনের শেষ দিকে

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্য পরিহারের জন্য ভবিষ্যতে নবম মহররমও রোজা রাখার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, সাহাবায়ে কেরাম যখন জানালেন যে ইহুদি ও খ্রিষ্টানরাও এ দিনের সম্মান করে, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন—‘ইনশাআল্লাহ, আগামী বছর আমরা নবম তারিখেও রোজা রাখব।’ কিন্তু পরবর্তী বছর আসার আগেই তিনি ইন্তেকাল করেন। (মুসলিম : ১১৩৪)

আশুরার রোজা পালনের উত্তম পদ্ধতি

ফুকাহায়ে কেরামের মতে, আশুরার রোজার সঙ্গে আরেকটি রোজা মিলিয়ে রাখা মুস্তাহাব। অর্থাৎ—৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম, দুই দিন রোজা রাখা উত্তম। এর মাধ্যমে ইহুদি-খ্রিষ্টানদের অনুকরণ থেকে বিরত থাকা যায়। (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃ. ৩৭৫; বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ২, পৃ. ৭৯)

শুধু ১০ মহররমে রোজা রাখা কি গুনাহ

অনেকের ধারণা, শুধু আশুরার দিন রোজা রাখা গুনাহ বা নিষিদ্ধ। বাস্তবে এ ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। কারণ ৯ বা ১১ তারিখের রোজা মিলিয়ে রাখা ওয়াজিব নয়; বরং মুস্তাহাব ও অধিক ফজিলতপূর্ণ আমল। আশুরার দিনের যে ফজিলত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, তা শুধু ১০ মহররমের রোজা রাখার মাধ্যমেই অর্জিত হয়। অবশ্য ইহুদিদের সঙ্গে বাহ্যিক সাদৃশ্য পরিহারের জন্য আরেকটি রোজা সংযুক্ত করা অধিক উত্তম।

আশুরার রোজার তিন স্তর

আল্লামা ইউসুফ বানুরি (রহ.) আশুরার রোজাকে তিন স্তরে ভাগ করেছেন—প্রথম স্তর : ৯, ১০ ও ১১—তিন দিনই রোজা রাখা। দ্বিতীয় স্তর : ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১—দুদিন রোজা রাখা। তৃতীয় স্তর : শুধু ১০ মহররমে রোজা রাখা। তার মতে প্রথম স্তর সর্বোত্তম, দ্বিতীয় স্তর তার চেয়ে নিম্ন এবং তৃতীয় স্তর সর্বনিম্ন মর্যাদাসম্পন্ন। মোটকথা, আশুরা ইসলামের ইতিহাসে স্মরণীয়, মর্যাদাপূর্ণ ও বরকতময় একটি দিন। এ দিনের রোজা এক বছরের গুনাহের কাফফারা হওয়ার সুসংবাদ বহন করে। তাই একজন মুমিনের উচিত আশুরার গুরুত্ব উপলব্ধি করা এবং সুন্নাহর আলোকে এ দিনের আমলগুলো যথাযথভাবে পালন করা।

আশুরায় বর্জনীয় বিষয়

হিজরি নববর্ষের সূচনাকারী মাস মহররম মুসলিম উম্মাহর কাছে এটি আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের এক মহামূল্যবান সুযোগ। ইসলামের ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা এবং ইবাদতের সঙ্গে মহররম মাসের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক স্থানে এই মাসকে ঘিরে এমন কিছু প্রথা ও আনুষ্ঠানিকতা চালু হয়েছে, যা কোরআন ও সুন্নাহর শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই একজন সচেতন মুসলমানের জন্য মহররমের প্রকৃত তাৎপর্য জানা এবং সুন্নাহভিত্তিক আমল করা অপরিহার্য।

এ হাদিসে মহররমকে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ বলে অভিহিত করা হয়েছে, যা এ মাসের বিশেষ মর্যাদার প্রমাণ। তাই এ মাসের অন্যতম প্রস্তুতি হওয়া উচিত নিজের আমলের হিসাব নেওয়া, গুনাহ থেকে তওবা করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নতুনভাবে জীবন গড়ার অঙ্গীকার করা।মহররম মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো আশুরার রোজা। ইসলামের ইতিহাসে এ দিনটি বহু তাৎপর্যমণ্ডিত ঘটনার সাক্ষী। সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহতায়ালা এ দিনে নবী মুসা (আ.) ও তার অনুসারীদের ফিরআউনের জুলুম থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। এ উপলক্ষে মুসা (আ.) রোজা পালন করেন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও এ রোজা পালনের নির্দেশ দেন।

দুঃখের বিষয়, মহররম মাসকে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজের কিছু অংশে নানা ধরনের বিদআত ও কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। কারবালার বেদনাবিধুর ঘটনাকে স্মরণ করতে গিয়ে কেউ কেউ বুক চাপড়ানো, মাতম করা, শরীরে আঘাত করা কিংবা রক্ত ঝরানোর মতো কাজ করে থাকেন। অথচ ইসলামে এসবের কোনো অনুমোদন নেই।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি গালে আঘাত করে, কাপড় ছিঁড়ে এবং জাহেলি যুগের মতো বিলাপ করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। (বুখারি : ১২৯৪)

তেমনি তাজিয়া মিছিল, আশুরাকে কেন্দ্র করে বিশেষ শোকানুষ্ঠান, নির্দিষ্ট খাবারকে ধর্মীয় আমল মনে করা কিংবা বিশেষ নামাজ ও দোয়ার অনুষ্ঠান উদ্ভাবন করাও সুন্নাহসম্মত নয়। ইসলামে ইবাদতের ভিত্তি হলো কোরআন ও সহিহ সুন্নাহ। নবী করিম (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত। (বুখারি : ২৬৯৭; মুসলিম : ১৭১৮)

কারবালার ঘটনা মুসলিম ইতিহাসের এক হৃদয়বিদারক অধ্যায়। কিন্তু এর শিক্ষা শোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের সত্যের জন্য ত্যাগ স্বীকার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সর্বোচ্চ কোরবানি দেওয়ার শিক্ষা দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্রের শাহাদত ইসলামের ইতিহাসে ন্যায় ও সত্যের পক্ষে অবিচল থাকার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

মহররম তাই শোকের নয়, শিক্ষাগ্রহণের মাস; বিদআতের নয়, সুন্নাহ অনুসরণের মাস; আনুষ্ঠানিকতার নয়, আত্মশুদ্ধির মাস। আসুন, আমরা এ মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখি, তওবা করি, কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করি এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার অঙ্গীকার করি। তাহলেই মহররম আমাদের জীবনে কল্যাণ, বরকত ও আল্লাহর নৈকট্যের বার্তা বয়ে আনবে।

যা ঘটেছিল কারবালায়

ইতিহাসের পাতায় কিছু ঘটনা থাকে, যা শুধু একটি নির্দিষ্ট জাতি বা ধর্মের সীমা ছাড়িয়ে সমগ্র মানবজাতির বিবেককে নাড়া দেয়। কারবালার শাহাদত সেই বিরল ঘটনাগুলোর একটি। ৬১ হিজরির মহররমের দশম দিন, যে দিনটিকে আশুরা বলা হয়, ফোরাত নদীর তীরে যা ঘটেছিল তা কোনো সাধারণ যুদ্ধের বিবরণ নয়। এটি ছিল মানবতার ইতিহাসে সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার এক অসম লড়াইয়ের দলিল, যেখানে সংখ্যার দিক থেকে ক্ষুদ্র একটি দল অসীম সাহস ও বিশ্বাসের শক্তিতে দাঁড়িয়ে পড়েছিল অন্যায়ের বিশাল শক্তির বিরুদ্ধে। সেই দলের নেতৃত্বে ছিলেন সাইয়িদুনা হোসাইন ইবনে আলি (রা.), যিনি ছিলেন আমাদের প্রিয়নবী (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র।

ঘটনার পটভূমি বুঝতে হলে একটু পেছনে যেতে হবে। মুয়াবিয়া (রা.)-এর মৃত্যুর পর তার ছেলে ইয়াজিদ খেলাফতের মসনদে বসেন। ইয়াজিদের চরিত্র ও শাসনপদ্ধতি নিয়ে সমকালীন মুসলিম পণ্ডিত এবং সাহাবাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ছিল। তিনি চাইলেন হোসাইন (রা.) তার কাছে আনুগত্যের শপথ নেন। কিন্তু হোসাইন (রা.) জানতেন এই আনুগত্য মানে শুধু একজন শাসকের প্রতি ব্যক্তিগত বশ্যতা নয়। এটি হবে অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া, সত্যকে বিসর্জন দেওয়া।

এই পরিস্থিতিতে কুফার মানুষ হোসাইন (রা.)-কে অসংখ্য চিঠি পাঠাল। তারা তাকে আমন্ত্রণ জানাল, সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিল। হোসাইন (রা.) প্রথমে তার চাচাতো ভাই মুসলিম ইবনে আকিলকে কুফায় পাঠালেন পরিস্থিতি যাচাই করতে। মুসলিম ইবনে আকিলের প্রতিবেদন ছিল উৎসাহজনক, হাজার হাজার কুফাবাসী তার হাতে আনুগত্যের শপথ করেছিল। কিন্তু তারপর যা হলো তা ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিশ্বাসঘাতকতার একটি। ইয়াজিদের পক্ষ থেকে নতুন গভর্নর উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ কুফায় এসে রাজনৈতিক চাপ ও ভয় দেখিয়ে কুফাবাসীর মনোভাব পরিবর্তন করে দিলেন। মুসলিম ইবনে আকিল একাকী হয়ে পড়লেন এবং শেষ পর্যন্ত শহীদ হলেন।

হোসাইন (রা.) তখন মক্কা থেকে কুফার দিকে যাত্রা শুরু করেছেন। পথে যখন তিনি মুসলিম ইবনে আকিলের শাহাদতের খবর পেলেন, তখন তিনি তার সঙ্গীদের বললেন, যারা ফিরে যেতে চান তারা ফিরে যেতে পারেন। কারণ এটি আর নিরাপদ যাত্রা নয়। অনেকেই ফিরে গেলেন। কিন্তু হোসাইন (রা.) থামলেন না। শুধু তার পরিবার ও কিছু বিশ্বস্ত সঙ্গী নিয়ে তিনি এগিয়ে চললেন। এই এগিয়ে চলাটাই ছিল সেই মহান সিদ্ধান্ত, যা পৃথিবীর ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

কারবালার প্রান্তরে পৌঁছে হোসাইন (রা.)-এর ছোট দলটি ঘেরাও হলো ইয়াজিদের বিশাল সৈন্যবাহিনী দ্বারা। ফোরাত নদীর পানি থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করা হলো। শিশু, নারী, বৃদ্ধ সবাই পানির কষ্টে ভুগতে লাগলেন। ইয়াজিদের পক্ষ থেকে একটাই শর্ত ছিল, হোসাইন (রা.) আনুগত্য স্বীকার করুন। কিন্তু সেই মানুষটি যিনি নবী করিম (সা.)-এর কোলে বড় হয়েছেন, যিনি শুনেছেন সত্যের পথে কতটা অবিচল থাকতে হয়, তিনি কি পারেন অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে? তিনি পারেননি।

১০ মহররম সকালে যুদ্ধ শুরু হলো। একে কি যুদ্ধ বলা যায়? একপাশে ৭২ জন মানুষ, অন্য পাশে হাজার হাজার সৈন্য। একে একে শহীদ হতে লাগলেন হোসাইন (রা.)-এর সঙ্গীরা। শহীদ হলেন তার ভাই আব্বাস (রা.), যিনি পানি আনতে গিয়ে উভয় হাত হারিয়েছিলেন কিন্তু শিশুদের জন্য পানির মশক ধরে রেখেছিলেন দাঁতে কামড়ে। শহীদ হলেন হোসাইন (রা.)-এর ছেলে আলি আকবর, মাত্র আঠারো বছরের তরুণ, যার চেহারা ছিল নাকি নবী করিম (সা.)-এর মতো। শেষ পর্যন্ত একাকী দাঁড়িয়ে রইলেন হোসাইন (রা.) নিজে, তার শরীরে তখন অসংখ্য ক্ষত।

সেই বিকালে কারবালার মাটি রঞ্জিত হলো। হোসাইন (রা.) শহীদ হলেন। তার শির মোবারক পৃথক করা হলো। সেই অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুরতার কথা লিখতে গেলে কলম থেমে যায়। কিন্তু এখানেই ইতিহাসের সেই বিস্ময়কর বিরোধাভাস নিহিত। যে ইয়াজিদ শারীরিকভাবে জিতেছিল, সে ইতিহাসের আদালতে চিরকালের জন্য নিন্দিত হয়ে গেল। আর যে হোসাইন (রা.) শারীরিকভাবে পরাজিত হলেন, তিনি হয়ে উঠলেন মানবজাতির চিরন্তন প্রেরণার উৎস।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনা করা দরকার। কারবালার ঘটনায় বিশ্বাসঘাতকতার বিষয়টিও একটি বড় শিক্ষা। কুফাবাসী যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে হোসাইন (রা.)-কে ডেকেছিল এবং তারপর যেভাবে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, এটি কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, মানুষ সুবিধার সময় ন্যায়ের পক্ষে থাকে, কিন্তু ঝুঁকি এলে সরে যায়। এই বাস্তবতা জেনেও হোসাইন (রা.) সত্যের পথ ছাড়েননি। এটাই তাকে শুধু ইসলামের ইতিহাসে নয়, পুরো মানবজাতির ইতিহাসে এক অসাধারণ উচ্চতায় স্থাপন করেছে।

আমাদের এ সময়ে, যখন পৃথিবীর নানা প্রান্তে ক্ষমতার অপব্যবহার, সত্যের অপলাপ ও দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার প্রতিদিনের খবর, তখন মহররম এবং কারবালার শিক্ষা আরো প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জুলুম কখনো চিরস্থায়ী হয় না। ইয়াজিদ যে সিংহাসন রক্ষা করতে এতটা নিষ্ঠুর হয়েছিল, সেই সিংহাসন আজ ধুলোয় মিশে গেছে। কিন্তু হোসাইন (রা.)-এর আদর্শ আজও লাখ লাখ মানুষের হৃদয়ে জীবিত।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD