রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ০১:২১ অপরাহ্ন




সিলেট সীমান্তে সমঝোতায় চোরাচালান

দিনে কোটি টাকা রক্ষকের পকেটে

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬ ১১:১৪ am
India flag ভারত পতাকা Border Guards Bangladesh BGB Military force security বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষক বাহিনী বিজিবি Border Security Force BSF সীমান্ত প্রহরী সংস্থা পাহারা বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ Border Guards Bangladesh BGB Military force security বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষক বাহিনী বিজিবি বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত
file pic

সিলেটের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অবাধে চলছে চোরাচালান। ভারতীয় গরু ও মহিষের পাশাপাশি দেশে ঢুকছে বিভিন্ন ধরনের মসলা, শাড়ি, থ্রিপিস, মোটরসাইকেল ও স্মার্টফোন থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের পণ্য। এসবের আড়ালে ঢুকছে মাদক দ্রব্য এবং আগ্নেয়াস্ত্রও। থেমে নেই মানব পাচারও। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, হুমকিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে সিলেট এলাকার চোরাচালানের আদ্যোপান্ত।

চোরকারবারিরা প্রক্রিয়াটি নির্বিঘ্ন করতে টাকার ভাগ দিচ্ছেন রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের। এদের মধ্যে একটি অলিখিত সমঝোতা গড়ে উঠেছে। গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট এবং জৈন্তাপুরের চোরাচালান থেকেই দিনে কোটি টাকার বেশি অর্থ অসাধুদের পকেটে ঢুকছে। ‘সমঝোতা’ ছাড়া যেসব পণ্য ভারত থেকে দেশে ঢুকছে তার একটি অংশ ধরা পড়ছে। এ বছর ২০৬ কোটি টাকার বেশি মাদক ও পণ্যসামগ্রী এবং এক হাজার ২৮১টি গরু বিজিবি আটক করছে। জানা গেছে, যে পরিমাণ পণ্য চোরাচালান হচ্ছে ধরা পড়ছে তার ক্ষুদ্র একটি অংশ।

সিলেটের চোরাচালান নিয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও ক্ষুব্ধ। সম্প্রতি তিনি এক অনুষ্ঠানে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘রক্ষকই যদি ভক্ষক হয়, তবে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?’ প্রশাসনের ভেতরে যারা এই ধরনের চোরাই চক্রকে দেখেও না দেখার ভান করে, তাদেরও ছাড় দেওয়া হবে না। সবাইকে এক মাস সময় দিয়েছি। জুলাইয়েই নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে যাবে। এরপরও যারা ঠিক না হবে, আগস্ট থেকে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। লাইসেন্স বা কাগজপত্রের আড়ালে যারা অবৈধ সুযোগ-সুবিধা নেয় তাদের লাইসেন্স চিরতরে বাতিল করা হবে। মন্ত্রণালয়ের ভেতরে যারা চোরাচালানের দালালি করেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানা যায়, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কানাইঘাট থানা এলাকার ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ডাউকি অঞ্চল অবস্থিত। ডাউকি সীমান্ত দিয়েই মূলত অবৈধভাবে গরু ও মহিষের বড় বড় চালান বাংলাদেশে ঢোকে। গোয়াইনঘাটের হাজিগঞ্জ এবং কানাইঘাট এলাকার সুরইঘাট দিয়ে চোরাচালান বেশি হচ্ছে। এছাড়া বিছানাকান্দি ও গোয়াইনঘাট সীমান্তের হাদারপাড় বাজার এবং হরিপুরের দরবস্ত বাজার চোরাচালানের জন্য ব্যাপকভাবে পরিচিত। রাত ২টা থেকে ভোররাত ৪টা-এই সময়টিকে বেছে নেয় চক্রটি। দিনে বিছানাকান্দি সীমান্ত দিয়ে গড়ে ৫০০ এবং জৈন্তাপুর-দরবস্ত দিয়ে ৩০০ গবাদিপশু অবৈধভাবে ঢোকে। গবাদিপশু বা পণ্য ঢোকানোর জন্য নির্দিষ্ট হারে গুনে গুনে ‘লাইন ফি’ পরিশোধ করতে হয়। প্রতি জোড়া গরুর জন্য একটি বাহিনীর অসাধু কর্মকর্তাদের দিতে হয় ৩ হাজার টাকা।

প্রতি জোড়া মহিষের জন্য দিতে হয় ৪ হাজার টাকা। অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে টাকা দিতে হয় ট্রাকপ্রতি। থানা ও ডিবি পুলিশকেও পৃথকভাবে টাকা দিতে হয়। প্রতিটি গরুর জন্য থানা পুলিশকে এক হাজার ও মহিষের জন্য দেড় হাজার টাকা দিতে হয়। ডিবি পুলিশকে গরুর জন্য ১০০ টাকা ও মহিষের জন্য ২০০ টাকা দিতে হয়। সীমান্ত দিয়ে মানব পাচারের ঘটনাও ঘটছে প্রতিনিয়ত।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে-রাজবাড়ী, জৈন্তাপুরের মোকামবাড়ী, আলুবাগান, শ্রীপুর, মিনাটিলা, কাঁঠালবাড়ী, কেন্দ্রী মন্দির, রাবার বাগান, ডিবিরহাওড় বিউপি, রিভারপিলার, কলিঞ্জিবাড়ী, জালিয়াখলা, নয়াগ্রাম, নুরুলের টিলা, অভিনাশ, আফিফানগর, বাঘছড়া, তুমইর, জঙ্গিবিল, বালিদাঁড়া, ইয়াংরাজা ও লম্বাটিলা এলাকা দিয়ে প্রতিনিয়ত মানব পাচার, ভারতীয় নাছির বিড়ি, মাদকদ্রব্য, জিরা, চিনি থেকে শুরু করে সব ধরনের পণ্য ঢুকছে। প্রতিটি জায়গায় একটি বাহিনীর নিয়োগকরা লাইনম্যানের কাজ করছে রুবেল আহমদ, তাজ উদ্দিন গং, জাকির মিয়া, মাঘাই পাত্র, আব্দুল, রিপন মিয়া ওরফে পিচ্চি রিপন, শাহজাহান ও বুরহান, লিটন মিয়া প্রমুখ। জৈন্তাপুরের বিভিন্ন সীমান্তে ডিবির প্রধান ‘লাইন্সম্যানের’ কাজ করছেন আলামিন। গবাদিপশুর গাড়িগুলো যখন সীমান্ত পার হয়ে দেশের ভেতরে প্রবেশ করে, তখন চোরাকারবারিদের আশ্বস্ত করে বার্তা পাঠান আলামিন, একটি বার্তায়

তিনি লিখেছেন-‘আমি ডিবি পুলিশকে মেসেজ দিয়ে দিয়েছি, রাস্তা ক্লিয়ার আছে, কোনো সমস্যা হবে না, গাড়ি নিয়ে যাও।’ এছাড়া আলামিন ও তার সহযোগীরা সড়কের মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। প্রতি রাতে কতটি পশুর গাড়ি পার হলো তার হিসাব রাখেন। সে অনুযায়ী টাকা ডিবিকে বুঝিয়ে দেন। ফারহান নামের এক ব্যক্তি চোরাকারবারি ও পুলিশের মধ্যে মধ্যস্থতার দায়িত্ব পালন করেন।

হাটে তুললেই ‘বৈধ’ : অবৈধভাবে আনা ভারতীয় গরু ও মহিষ সরাসরি স্থানীয় হাটে নিয়ে যাওয়া হয়। হাটে তোলার পর স্থানীয় ইজারাদারদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট ফির বিনিময়ে ‘রসিদ’ কাটা হয়। ওই রসিদ হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অবৈধভাবে আসা পশু আইনি ‘বৈধতা’ পায়। ফলে দেশের যে কোনো প্রান্তে এই পশু পরিবহণে কোনো আইনি বাধা থাকে না।

রাধানগর বাজার : সিলেটের জাফলং ও গোয়াইনঘাট সীমান্তের রাধানগর বাজারটি চোরাচালানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পয়েন্ট। এটি গোয়াইনঘাট উপজেলার পূর্ব জাফলং ইউনিয়নে অবস্থিত। এখান থেকে সীমান্তের মূল চোরাচালান পয়েন্ট এবং বিভিন্ন খাসিয়া পুঞ্জিগুলো খুবই কাছে। সীমান্ত দিয়ে আসা অবৈধ ভারতীয় চিনি, কসমেটিকস ও শাড়ির অন্যতম প্রধান ট্রানজিট রুট এই রাধানগর বাজারসংলগ্ন এলাকা। সাধারণত প্রতি রোব ও বুধবার এই বাজারে একটি বড় গরুর হাট বসে। ভারতীয় গরু ও মহিষ বাংলাদেশি হিসাবে বৈধ করার একটি বড় চক্র এখানে সক্রিয়। জাফলং ও পিয়াইন নদী থেকে অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের চাঁদাবাজি এবং সিন্ডিকেটের বড় একটি অংশ এই বাজারকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়।

পণ্যভেদে আলাদা লাইনম্যান ও চুক্তি : সুপারি, কসমেটিক্স, চকলেট এবং কম্বলসহ অন্যান্য চোরাচালানের জন্য আলাদা লাইনম্যান রয়েছে। লাইনম্যানরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে চুক্তি করে লাইন সচল রাখে। জৈন্তাপুর থানার সামনে দিয়ে চোরাই মাল যাওয়ার কারণে ওই রাস্তার জন্য ফারহান এবং শারুককে লাইনম্যান নিয়োগ করা হয়েছে। লাইন বাণিজ্যের মাধ্যমে শারুক এখন কোটি টাকার মালিক। এক গাড়ি জিরার জন্য পুলিশের জন্য শারুক আদায় করেন ৫ হাজার টাকা। একই ভাবে প্রতি গাড়ি কসমেটিক্স ও অন্যান্য পণ্যের জন্য ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা করে তোলেন। চোরাকারবারিরা শারুককে গাড়ির বিবরণ জানিয়ে দিলে পুলিশ সেই গাড়ি আর আটক করে না। এছাড়া প্রতিদিন জৈন্তাপুরের সীমান্ত দিয়ে ৮ থেকে ১০টি দামি ভারতীয় মোটরসাইকেল অবৈধভাবে দেশে ঢুকছে। প্রতি মোটরসাইকেলের লাইন খরচ ১০ হাজার টাকা। যোগাযোগ করেও ফারহান এবং শারুকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিজিবি সিলেট সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ সালেহ উদ্দিন বলেন, সিলেট ব্যাটালিয়ন (৪৮ বিজিবি) সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার দীর্ঘ ৮১ কিলোমিটার সীমান্তে নিষ্ঠা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত এক বছরে চোরাচালানে জড়িত ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০৬ কোটি ৪৭ লাখ ৫১ হাজার ২৮৭ টাকা মূল্যের চোরাচালান পণ্য ও মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে। চলতি বছরই এক হাজার ২৮১টি গরু-মহিষ আটক করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সম্প্রতি চোরাচালান ও অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে বিজিবি কঠোর অবস্থানে গেলে কুচক্রী মহল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজিবি সম্পর্কে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও তথ্য প্রচার করছে।

সিলেটের পুলিশ সুপার (এসপি) ড. চৌধুরী জাবের সাদেক বলেন, চোরাচালান যে চলছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। আমাদের দুর্বলতা অস্বীকার করতে পারি না। আমার কাছেও কিছু অভিযোগ আছে। আমরা ব্যবস্থা নিই। আমি সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করছি। তবে চোরাচালান শতভাগ বন্ধ করা আমাদের একার পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি বলেন, সীমান্ত দিয়ে একটা জিনিস ঢোকার পরে এটা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। তাই এটা পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। অভিযোগ উঠার পর সম্প্রতি জৈন্তাপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) উসমান গণি এবং এসআই ওবায়দুলকে থানা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, লোম বাছতে কম্বল শেষ হয়ে যাওয়ার অবস্থা।

জৈন্তাপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাহবুবুর রহমান মোল্লা বলেন, আপনি যে ধরনের তথ্য পাচ্ছেন সে ধরনের তথ্য আমার কাছেও আসছে। আমাদের টহল জোরদার করা হয়েছে। সীমান্তে প্রাথমিক ফোর্স হিসাবে দায়িত্ব পালন করে বিজিবি। তারা কী করছে সেটা আমরা বলতে পারব না। তবে পুলিশ বিভাগের কেউ কোনো অনৈতিক সুবিধা বা টাকা-পয়সা লেনদেনের সঙ্গে জড়িত নয়। পুলিশের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এসেছে সেগুলোর সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই।

(যুগান্তর)




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD