এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনাল এখন পুরোদমে গ্যাস সরবরাহে প্রস্তুত; কিন্তু ২৩ আগস্ট পর্যন্ত কোনো এলএনজিবাহী কার্গোই নেই। ফলে আরও অন্তত এক সপ্তাহ সারা দেশে ভয়াবহ গ্যাস সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে রাজনৈতিক তদবিরে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) ৬টি কার্গো আমদানির ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আজ এর একটি আসার কথা থাকলেও তা আসছে না। এ অবস্থায় বাধ্য হয়ে সংকট কাটাতে তড়িঘড়ি করে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে ৫টি এলএনজি কার্গো কেনার জরুরি দরপত্র আহ্বান করেছে সরকার। এ নিয়ে আজ সন্ধ্যায় জরুরি ভিত্তিতে ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির জুম মিটিং ডাকা হয়েছে।
এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, সামনে সংকট আছে। তবে সেই সংকট কাটাতে সরকার সব চেষ্টা করছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তদবিরের ওই কার্গোগুলো সময়মতো আসবে না জেনে স্পট মার্কেট থেকে ১৭ ও ২৪ আগস্টের জন্য ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম সিঙ্গাপুর থেকে কার্গো কেনা হয়েছিল। সেগুলো নিয়ে ৬ আগস্ট ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার কমিটিতে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেই কমিটি এই প্রস্তাব অনুমোদন না করে সরাসরি ক্রয়নীতিতে কেনা ৬ কার্গো আগে আমদানির নির্দেশ দেন।
২১ জুলাই থেকে (২৬ দিন ধরে) সারা দেশে ভয়াবহ গ্যাস সংকট চলছে। জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, মহল বিশেষ তদবিরকারীরা দেশের এই মুহূর্তের গ্যাস সংকটের জন্য দায়ী। তাদের কারণে বাইরে কোথাও জ্বালানি বিভাগের পরিচয় দেওয়া যায় না। কারণ জনগণ ক্ষুব্ধ। অথচ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশকে এগিয়ে নিতে রাত-দিন কাজ করছেন। এখন গ্যাস সংকটের সঙ্গে জড়িতদের কঠোর বিচার না করলে বিএনপি সরকারের ভাবমূর্তি দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে এলএনজি খালাস করতে গত কয়েকদিন কোনো কার্গোর ব্যবস্থা করতে পারেনি সরকার। আজ ডিপিএম পদ্ধতিতে জিংহু শিপিং নামের কোম্পানি একটি কার্গো সরবরাহ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটিও আসছে না। ২৩ আগস্টও একটি কার্গো আসার কথা। সেটিও আসবে না বলে জানা গেছে। রোববার সন্ধ্যা ৬টায় সারা দেশে পেট্রোবাংলা গ্যাস সরবরাহ দিয়েছে ২২৮ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট। অথচ শনিবার দেওয়া হয়েছিল ২৪০ কোটি ঘনফুটের বেশি। জানা গেছে, এক্সিলারেটের টার্মিনালে গ্যাসের মজুত ফুরিয়ে যাওয়ায় সরবরাহ কমছে।
চলতি মাসের শুরুতে ব্লেক কিউব, মেক্স অয়েল ও জিং হু শিপিং নামে তিনটি কোম্পানির কাছ থেকে ২টি করে মোট ৬ কার্গো এলএনজি কিনতে (প্রতি কার্গো ৮০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকা) ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির কাছে প্রস্তাব পাঠায় জ্বালানি বিভাগ। এর মধ্যে ব্লেক কিউব প্রতি ইউনিট ১৩ ডলার, মেক্স অয়েল ২১ ডলারের একটু বেশি এবং জিং হু শিপিং ১৬ ডলার প্রতি ইউনিটের দর দেয়। যদিও স্পট মার্কেটে এখন দাম ২২ ডলারের বেশি। জ্বালানি বিভাগ দরপত্রবিহীন এই প্রস্তাবে পিপিএ-২০০৬-এর ধারা ৬৮(১) ও পিপির ২৫-এর বিধি ৯৭,৯৮ এবং ৯৯ অনুযায়ী এই কার্গোগুলো ক্রয়ের প্রস্তাব দেয়। এই ৬ কার্গো ৬ আগস্ট অনুমোদন দেওয়া হয়। এর প্রথমটি আজ আসার কথা ছিল। কিন্তু আসবে না।
জানা গেছে, এই ৬ কার্গো এলএনজি ক্রয় করতে সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নেতা সুপারিশ করেন। কিন্তু এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারককে বারবার সাবধান করা হলেও কোনো কাজ হয়নি। রোববার বিকালে ওই ৬ কার্গোর পরিবর্তে স্পট থেকে ৫ কার্গো কেনার দরপত্র আহ্বান করে আরপিজিসিএল। সেই দরপত্রে বলা হয়েছে, ২৩, ২৬, ২৯ আগস্ট এবং ১ ও ৪ সেপ্টেম্বর এসব কার্গো সরবরাহ করতে হবে। আজ বিকাল ৪টার মধ্যে স্পটের এই ক্রয়ে দরপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, আজ সন্ধ্যায় জরুরি ভিত্তিতে ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির জুম মিটিং ডাকা হয়েছে। যাতে এই কার্গোগুলোর অনুমোদন দেওয়া যায়।
এদিকে, গতকালও সরকার বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের সর্বোচ্চ বরাদ্দ বহাল রেখেছে। ২২৮ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট গ্যাসের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে দেওয়া হচ্ছে ৯৬ কোটির মতো। এছাড়া শিল্প খাতে ৯০১ কোটি, সার খাতে ২০ কোটি এবং অন্যান্য খাতে বাকি গ্যাস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে সারা দেশে বিচ্ছিন্নভাবে বৃষ্টির কারণে লোডশেডিং কিছুটা কমেছে। রোববার বিকাল ৫টায় সারা দেশে লোডশেডিং হয়েছে মাত্র ৩৬৫ মেগাওয়াট। এই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৩১৫ মেগাওয়াট। আর সরবরাহ দেওয়া হয়েছে ১৩ হাজার ৯৫০ মেগাওয়াট।
(যুগান্তর)