সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬-এ কোরআন-সুন্নাহর মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিষয় রয়েছে দাবি করে আইনটি চলতি অধিবেশনে পাস না করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি প্রস্তাবিত আইনটি শরিয়াহ আইনের বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সুপারিশ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
রোববার জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত আইন নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ দাবি জানান।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষের জন্য যে চিরস্থায়ী বিধান দিয়েছেন, যারা এতে বিশ্বাস রাখেন, তাদের কাছে আইনটির প্রয়োগ কীভাবে গ্রহণযোগ্য হবে—এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এ ক্ষেত্রে পবিত্র কোরআনের সূরা নিসার ১১, ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর আয়াত প্রযোজ্য। প্রথম দুটি আয়াতে উত্তরাধিকার বণ্টনের মূলনীতি এবং পরের দুটি আয়াতে এর পরিণতি সম্পর্কে বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, উইল বা হেবার ক্ষেত্রে যার নামে সম্পত্তি দেওয়া হবে, তাকে মালিকানা ভোগের সুযোগ দিতে হবে। মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়ার বিষয়টি হেবা নয়, বরং ওসিয়তের আওতাভুক্ত। ওসিয়তের ক্ষেত্রেও কাকে করা যাবে এবং সর্বোচ্চ কত অংশ করা যাবে—কোরআন-হাদিসে তার নির্দেশনা রয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত আইনে এ ধরনের বিষয়গুলো সম্পৃক্ত না থাকায় শরিয়াহর মূলনীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমি কোনো ফকিহ নই, মুফতিও নই; আপনাদের মতোই কোরআনের একজন অতি সাধারণ ছাত্র। কোরআন ও হাদিস থেকে আমি যা বুঝেছি, সেটাই এখানে উপস্থাপন করেছি।’
প্রস্তাবিত আইনটি মানুষের ঈমান-আকিদার সঙ্গে সম্পর্কিত উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, এটি এভাবে উপস্থাপন করা হলে সমাজে ব্যাপক বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে হকদারের অধিকার বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তবে মানবিক দিক বিবেচনায় পিতা-মাতার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আইনটি চলতি অধিবেশনেই পাস না করে শরিয়াহ আইনের কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তারা বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সুপারিশ দিলে তা জাতির জন্য কল্যাণকর হবে।
এ ক্ষেত্রে ইসলামী ফাউন্ডেশনকেও যুক্ত করার প্রস্তাব দেন তিনি। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ইসলামী ফাউন্ডেশন চাইলে বিশিষ্ট আলেম ও স্কলারদের নিয়ে বিষয়টি পর্যালোচনা করে সংসদের সামনে উপস্থাপন করতে পারে। স্থায়ী কমিটি এই সুযোগ গ্রহণ করলে সম্ভাব্য বিপর্যয় এবং ‘আল্লাহর আইনের খেলাফ’ থেকে দেশ রক্ষা করা সম্ভব হবে।
সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল ২০২৬ কোরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট পরিপন্থী উল্লেখ করে এটি জাতীয় সংসদে পাস না করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন। রোববার রাতে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি সরকারের পূর্বের প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এই আপত্তি জানান। Government
নজিবুর রহমান বলেন, এর আগে ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর বর্তমান রাষ্ট্রপতি স্পষ্ট অঙ্গীকার করেছিলেন, দেশের ৯৫ শতাংশ মুসলমানের দেশে কোরআন-সুন্নাহর বাইরে কোনো আইন পাস করা হবে না। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এই বিল পাস করতে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আইনটির বিরোধিতায় এই সংসদ সদস্য বলেন, দেশের প্রখ্যাত ওলামায়ে কেরাম, যাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রীর জাকাত বিষয়ক উপদেষ্টাও ছিলেন, তারা বলেছেন, এই আইনের মাধ্যমে আজীবন ভোগদখলের বিধান রেখে দান করার যে সুযোগ রাখা হয়েছে, তা ইসলামী আইনের পরিপন্থী। এর ফলে আল্লাহর দেওয়া মিরাসি বা উত্তরাধিকারের বিধানকে বাইপাস করার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্রিটিশ আমলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৩৭ সালের মুসলিম পার্সোনাল ল (শরিয়ত) অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্টেও মুসলমানদের উত্তরাধিকার, হেবা (দান), বিবাহ ও পারিবারিক বিষয়গুলো শরিয়ত অনুযায়ী পরিচালনার বিষয়টি স্বীকৃত হয়েছিল।
সন্তানদের নামে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর মা-বাবাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার মতো দুঃখজনক সামাজিক বাস্তবতার কথা স্বীকার করে নজিবুর রহমান বলেন, সামাজিক সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে ইসলামিক পারিবারিক আইনকে পাশ কাটানোর কোনো যুক্তি নেই। বাবা-মায়ের অধিকার সুরক্ষার জন্য ২০১৩ সালে একটি আইন পাস করা হয়েছে, যার মাধ্যমেই মা-বাবার অধিকার সুরক্ষা করা সম্ভব।
বক্তব্যের শেষে তিনি সতর্ক করে বলেন, আল্লাহর নির্ধারিত উত্তরাধিকার ও হেবার বিধান বাইপাস করার সুযোগ সৃষ্টিকারী এই আইনের পক্ষে যারা ভোট দেবেন, তাদের প্রত্যেককে এর দায়ভার গ্রহণ করতে হবে।