রাষ্ট্রায়ত্ত সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক ব্যাংক সোনালী ব্যাংক পিএলসি-তে ২০১৯ ব্যাচের সিনিয়র অফিসারদের প্রিন্সিপাল অফিসার (পিও) পদে পদোন্নতি ঘিরে ৮৬ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন, প্রবিধানমালা লঙ্ঘন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুসারে, পদোন্নতি আদায় করতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যরাতের ‘মব’ সৃষ্টি ও একটি বিশেষ ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে কোটি টাকার উৎকোচ লেনদেনের মাধ্যমে ৯০৪ জন কর্মকর্তাকে সুবিধা দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দাখিল করা অভিযোগপত্র এবং যুক্ত করা নথিপত্রে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ওদিকে ২০১১-১২ ব্যাচকে আবার বঞ্চিত করার চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগে জানা যায়, ২০১৯ সালের সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত সিনিয়র অফিসার ব্যাচের কিছু কর্মকর্তা একটি শক্তিশালী সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। পদোন্নতি পেতে প্রভাবিত করার লক্ষ্যে ২০২৩ সালের ২২শে জুন সোনালী ব্যাংকের রমনা করপোরেট শাখায় ‘সোনালী ব্যাংক পিএলসি, সিনিয়র অফিসার, ব্যাচ-২০১৯’ (হিসাব নং-৪৪২৬ ৩০১০ ২৮১৪৩) নামে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়।
অ্যাকাউন্ট বিবরণী পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালের জুলাইয়ের প্রথম দিকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিকাশ, ই-ওয়ালেট ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্টভাবে ১ হাজার টাকা করে জমা হয়। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের মে ও জুন মাসের মধ্যে এই অ্যাকাউন্টের লেনদেন বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং জমার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮৬ লাখ টাকায়। অভিযোগ অনুযায়ী, এই বড় অঙ্কের ফান্ডই পদোন্নতি নিশ্চিতে উৎকোচ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
ব্যাংকিং ডিপ্লোমার পয়েন্ট গণনা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার জাজ কর্তৃক স্থগিতাদেশ (স্টে অর্ডার) থাকা সত্ত্বেও সার্টিফাইড কপি বের হওয়ার আগেই গত ১৭ই জুন ২০২৬ মধ্যরাতে নির্বাহী ফ্লোরে ‘মব’ সৃষ্টি করে প্রমোশন রেজাল্ট আদায় করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পরে ২১শে জুন ২০২৬ তারিখের গভীর রাতে তড়িঘড়ি করে প্রমোশন অ্যাডভাইস জারি করা হয়। স্বাভাবিক অফিস সময়ের বাইরে মধ্যরাতে প্রমোশন দেয়া ও অ্যাডভাইস ইস্যু করার বিষয়টি অনৈতিক লেনদেন ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার নির্দেশক বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যাংকের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, সোনালী ব্যাংক প্রশাসন একটি বিশেষ ব্যাচকে সুবিধা দিতে ২০২২ এবং ২০২৫ সালের চাকরির প্রবিধানমালার আংশিক ব্যবহার করে চরম বৈষম্য তৈরি করেছে।
জ্যেষ্ঠতার প্রবিধানমালা: ২০১৯ ব্যাচকে জ্যেষ্ঠতা পাইয়ে দিতে ২০২২ সালের চাকরি প্রবিধানমালা ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও ২০২৫-এর নীতিমালায় বলা আছে-একই পঞ্জিকা বছরে পদোন্নতিপ্রাপ্তরা সরাসরি যোগদানকৃতদের চেয়ে জ্যেষ্ঠ হবেন।
ডিপ্লোমার পয়েন্টে নীতিমালা: ২০১৯ ব্যাচের সবার ব্যাংকিং ডিপ্লোমা না থাকায় জ্যেষ্ঠতা বজায় রাখতে ২০২৫ সালের প্রবিধানমালা অনুসরন করে প্রত্যেককে ব্যাংকিং ডিপ্লোমার ১০ নম্বর স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রদান করা হয়।
অর্থমন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট নির্দেশনাবলী উপেক্ষা করে প্রবিধানমালার এমন দ্বৈত ব্যবহারের মাধ্যমে জ্যেষ্ঠতা প্রদানকে বড় ধরনের দুর্নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য বলে অভিহিত করেছেন বঞ্চিত কর্মকর্তারা।
এদিকে, উল্লেখিত ব্যাংক হিসাব পরিচালনার অন্যতম সমন্বয়ক কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান ফারাবী পদোন্নতি ঘোষণার পর গত ২২ জুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে লেখেন, “যারা অন্যের বাঁড়া ভাতে ছাই দিয়েছিল, তাদের চূড়ান্তভাবে শক্ত জবাব দেয়া হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ।”
অভিযোগকারীরা বলছেন, ঘটনাপ্রবাহ, ব্যাংক লেনদেন এবং উক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য পর্যালোচনা করলে এটি স্পষ্ট যে, পরিকল্পিত আর্থিক লেনদেন ও প্রবিধানমালা লঙ্ঘনের মাধ্যমে এই পদোন্নতি নিশ্চিত করা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শীর্ষ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানে প্রমোশন বাণিজ্য, মানিলন্ডারিং এবং স্বজনপ্রীতির মতো গুরুতর অপরাধ ঠেকাতে দ্রুত নিরপেক্ষ অনুসন্ধান চালানো এবং জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জিত পদোন্নতি বাতিলের আকুল আবেদন জানিয়েছেন সংক্ষুব্ধ পদ বঞ্চিতরা।
এদিকে আবারো ৩১.১২.২০২৫ ভিত্তিক পদোন্নতির সব পদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হলেও সিনিয়র অফিসার সমমান হতে প্রিন্সিপাল অফিসার সমন্বিত জ্যেষ্ঠতার তালিকা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। যদিও সোনালী ব্যাংক পিএলসি ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫, নং-এইচআরডিডি/৪০১/২৯০৬ এর ক্রমিক নম্বর-৬ এ বিভাগীয় মতামত/ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, “ইত:পূর্বে ব্যাংক কর্মচারীদের বিভিন্ন পদে নির্ধারিত জ্যেষ্ঠতা অপরিবর্তিত থাকবে”। কিন্তু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এ ধারা না মেনে ২০১১-১২ ব্যাচকে আবার বঞ্চিত করতে চাচ্ছে।
সোনালী ব্যাংক পিএলসি-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. শওকত আলী খানকে একাধিক বার ফোন ও মেসেজ দেয়া হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। সূত্র: মানবজমিন