শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৪ অপরাহ্ন




ভিসা-টিকিট ঠিক তবুও শাহজালালে পদে পদে হয়রানি

বিমানের কাউন্টারে টাকার খেলা

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৯:৫৫ am
টার্মিনাল এয়ারপোর্ট HSIA CAAB hazrat shahjalal international airport dhaka biman হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বিমানঘাঁটি Hazrat Shahjalal International Airport বিমানবন্দর বিমান বন্দর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বিমানঘাঁটি Hazrat Shahjalal International Airport বিমানবন্দর বিমান বন্দর
file pic

হাতে বৈধ কাগজপত্র। ভিসা-টিকিটও ঠিকঠাক। তবুও বোর্ডিং পাশের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাত্রীদের আটকে রাখা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ‘সমস্যা সমাধান’-এর নামে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। অতিরিক্ত ব্যাগেজের অর্থ আত্মসাৎ থেকে শুরু করে ইকোনমি ক্লাসের টিকিট বিজনেস ক্লাসে আপগ্রেড-সবখানেই চলছে টাকার খেলা। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্যাসেঞ্জার ও গ্রাউন্ড সার্ভিস বিভাগের কর্মীদের একটি অসাধু চক্র এভাবেই গড়ে তুলেছে যাত্রী হয়রানি ও অর্থ লোপাটের বিশাল সিন্ডিকেট। অনুসন্ধানে এমন গুরুতর অনিয়মের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মীদের এমন কার্যকলাপে যাত্রীরা যেমন চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তেমনই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, বিমানবন্দরে যাত্রীসেবা কোনোভাবেই অর্থ আদায়ের হাতিয়ার হতে পারে না। বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও কোনো যাত্রীকে অযথা আটকে রেখে হয়রানি করা হলে তা অত্যন্ত গুরুতর অনিয়ম। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সিস্টেম লগ, ব্যাগেজ ট্যাগ, পেমেন্ট রেকর্ড ও সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করতে হবে। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বিমানবন্দরের সেবা ব্যবস্থায় কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

বিমানের গ্রাহকসেবা বিভাগের পরিচালক বদরুল হাসান লিটন বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে এয়ারপোর্ট সার্ভিস বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারা খোঁজ নিয়ে দেখছে। প্রয়োজনে এ বিষয়ে তদন্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে-যাত্রী হয়রানি রোধে জিরো টলারেন্স।

সূত্রমতে, বিমানবন্দরের প্যাসেঞ্জার সার্ভিস বিভাগের একজন কাউন্টার সুপারভাইজার ও অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের নেতৃত্বে একটি চক্র গড়ে উঠেছে। তারা চেকইন ব্যাগেজের ওজনের হিসাবে কারচুপি করে অতিরিক্ত চার্জ আদায় এবং সেই অর্থ আত্মসাৎ করে আসছে। বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও যাত্রীদের নানা ত্রুটি দেখিয়ে দীর্ঘ সময় আটকে রেখে এক কাউন্টার থেকে অন্য কাউন্টারে ঘোরানোর অভিযোগও রয়েছে। এছাড়া হজ এজেন্সিগুলোর সঙ্গে যোগসাজশে উৎকোচ নিয়ে বিজনেস ক্লাসে আসন বরাদ্দ এবং ‘লো-প্রোফাইল’ যাত্রীদের কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে বোর্ডিং পাশ দেওয়ার মতো অভিযোগ রয়েছে এই চক্রটির বিরুদ্ধে। চক্রটির অন্য সদস্য হিসাবে গ্রাউন্ড সার্ভিস সুপারভাইজার (জিএসএস) মো. জসিম উদ্দিন (জি-৫২১৯৫), গ্রাউন্ড সার্ভিস অ্যাসিস্ট্যান্ট (জিএসএ) মোহাম্মাদ বুরহান উদ্দিন (জি-৫৩০৪৭) এবং জিএসএ মিজানুর রহমান ফিরোজের (জি-৫৩০৩০) নাম উঠে এসেছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ১৮ আগস্ট বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩০৫ ফ্লাইটের যাত্রী মাহমুদ সারওয়ার চেকইনের জন্য জিএসএ মিজানুর রহমান ফিরোজের কাউন্টারে যান। তার সঙ্গে চারটি লাগেজ ছিল। এ সময় ব্যাগেজ এলাকায় কর্মরত হেলপার ইব্রাহিম ওই যাত্রীর সঙ্গে ৫২ হাজার টাকার বিনিময়ে অতিরিক্ত দুটি ব্যাগ চেকইনের চুক্তি করেন। পরে ইব্রাহিম জিএসএ মো. বুরহানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বুরহান ওই যাত্রীকে ফিরোজের লাইনে যাওয়ার পরামর্শ দেন। রাত ১২টা ৫১ মিনিটে ফিরোজ মাহমুদের নামে ২৩ ও ২২ কেজি ওজনের দুটি ব্যাগ চেকইন করেন। তবে অতিরিক্ত দুটি ব্যাগ যাত্রীর নিজের নামে ট্যাগ না করে অন্য একটি গ্রুপের চারজন যাত্রীর সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয়। ওই চার যাত্রীর টিকিট নম্বর ছিল ৯৯৭২১০২২১৫৮৬১/২/৩/৪ এবং সিকোয়েন্স নম্বর ১৩৬ থেকে ১৩৯। তাদের চেকইন রাত ১১টা ১৮ মিনিটে সম্পন্ন করেন জিএসএ বুরহান। চার যাত্রীর জন্য মোট আটটি ব্যাগের সুবিধা থাকলেও তারা পাঁচটি ব্যাগ জমা দেন। অভিযোগ অনুযায়ী, বুরহানের পরামর্শে ফিরোজ ওই গ্রুপের সঙ্গে আরও দুটি ব্যাগ যুক্ত করেন। সিকোয়েন্স ১৩৭-এর যাত্রী রুমেনা/হুসনা জান্নাতের নামে দুটি ব্যাগের ট্যাগ ইস্যু করা হয়।

নিজের ক্লেইম ট্যাগে অন্য যাত্রীর নাম দেখতে পেয়ে মাহমুদ সারওয়ার চিৎকার শুরু করেন। এ সময় বিমানের সিকিউরিটি সুপারভাইজার মো. নিয়াজ মোরশেদ ভূঁইয়া ঘটনাস্থলে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেন। অতিরিক্ত দুটি ব্যাগের জন্য ৫২ হাজার টাকা নেওয়া হলেও তাকে কোনো রসিদ দেওয়া হয়নি। বরং অন্য যাত্রীর নামে ব্যাগ বুকিং করা হয়েছে বলে জানান। এ সময় তিনি পেমেন্ট স্লিপ ও নিজের নামে ক্লেইম ট্যাগ দাবি করেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে হেলপার ইব্রাহিম তার পকেট থেকে ৫২ হাজার টাকা বের করে নানা টালবাহানা শুরু করেন। পরে নিরাপত্তা সুপারভাইজার তার পাশ জব্দ করেন।

এরপর যাত্রীর প্রোফাইলে আরও দুটি ব্যাগ যুক্ত করা হয় এবং নতুন ট্যাগ ইস্যু করে সেগুলো বেল্টে ছেড়ে দেওয়া হয়। ব্যাগগুলো বে-১-এ পৌঁছালে লোডিং সুপারভাইজার আগের ট্যাগ খুলে নতুন ট্যাগ লাগিয়ে দেন। নথি অনুযায়ী, নতুন ট্যাগ ইস্যুর প্রায় ১১ মিনিট পর রাত ১টা ৫৮ মিনিটে মিজানুর রহমান ফিরোজ আগের দুটি ট্যাগ সিস্টেম থেকে ডিলিট করেন। পরে হেলপার ইব্রাহিমের কাছ থেকে ৫২ হাজার টাকা এবং যাত্রীর কাছ থেকে আরও আনুমানিক ১০ হাজার টাকা নেওয়ার পর পেমেন্ট স্লিপ ইস্যু করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, এ ঘটনায় দীর্ঘ দেনদরবারের পর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ক্ষমা চাইলেও ওই কাউন্টার সুপারভাইজারের হস্তক্ষেপে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ছাড়াই তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

বৈধ ৯ যাত্রী, জনপ্রতি ১৫ হাজার টাকা : শুধু অতিরিক্ত ব্যাগেজ নয়, বোর্ডিং পাশ আটকেও অর্থ আদায় করে চক্রটি। ২১ জুলাই বিজি-৩২৭ ফ্লাইটে আবুধাবি হয়ে পর্তুগালগামী ৯ যাত্রীর কাগজপত্র পাসপোর্ট চেকিং ইউনিট (পিসিইউ) শাখার কর্মীরা যাচাই করে চেকইনের অনুমতি দেন। কিন্তু কাউন্টার সুপারভাইজার তাদের চেকইন না করে জনপ্রতি ১৫ হাজার টাকা দাবি করেন। প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর সংশ্লিষ্ট এজেন্সি টাকা দিতে রাজি হলে তাদের বোর্ডিং পাশ দেওয়া হয়।

সিঙ্গাপুর ফ্লাইটে ব্যাগেজ বাণিজ্য : আরেক ঘটনায় সিঙ্গাপুরগামী ফ্লাইটের এক যাত্রীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ব্যাগেজ ফি হিসাবে ৫ হাজার টাকা নিয়ে আত্মসাৎ করেন জিএসএ বুরহান। পরে যাত্রী বোর্ডিং গেটে অভিযোগ করলে ঘটনা ধামাচাপা দিতে ওই কাউন্টার সুপারভাইজার সিস্টেম এডিট করে ওই টাকা অ্যাকাউন্টে জমা দেখান। এছাড়া এই চক্র টরন্টোগামী ফ্লাইটে অর্থের বিনিময়ে ইকোনমি ক্লাস থেকে বিজনেস ক্লাসে আপগ্রেড করার ব্যবসাও করে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।

টিকিট আপগ্রেড বাণিজ্য : এই চক্র টরন্টোগামী ফ্লাইটে অর্থের বিনিময়ে বিজনেস ক্লাসে আপগ্রেডের ব্যবস্থাও করে থাকে। এছাড়া গ্রাউন্ড সার্ভিসের ওই কর্মকর্তা কয়েক বছর ধরে হজ ক্যাম্পে নিয়মিত দায়িত্ব নিয়ে হজ এজেন্সিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে বিজনেস ক্লাসের আসন বরাদ্দ দেন বলেও কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে।

(যুগান্তর)




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD