চাঁদাবাজি, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও বাজারে কারসাজির কারণে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করতে হবে। সেটি করা হলে আসন্ন রমজানে ভোগ্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।
মঙ্গলবার রাজধানীর মতিঝিলে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) আয়োজিত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুত, সরবরাহ, আমদানি ও মূল্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের নিয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় ব্যবসায়ীরা এসব কথা বলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হক।
কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ বলেন, পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য রয়েছে। পাশাপাশি সড়কে চাঁদাবাজিও হয়। ফলে ৩০ টাকার সবজি ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
শ্যামবাজার কৃষিপণ্য আড়ৎ মালিক সমিতির সভাপতি ফরিদ উদ্দিন বলেন, মুনাফাখোর কিছু ব্যবসায়ীর কারণে সব ব্যবসায়ীকে অপবাদ শুনতে হয়। করপোরেট ব্যবসায়ীরা ৫০ টাকার মিনিকেট চাল প্যাকেটজাত করে ৭০ টাকায় বিক্রি করছেন। অথচ ‘মিনিকেট’ নামে কোনো ধানের জাত নেই। তিনি আরও বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীরা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছে। বাজারে চাঁদাবাজিও রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কেউ কেউ এ কাজে জড়িত। শ্যামবাজারে পুলিশ চাঁদা তোলে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
খিলগাঁও (তালতলা) সিটি করপোরেশন সুপার মার্কেট ওনার্স এসোসিয়েশনের মহাসচিব কাজী আনিসুজ্জামান বলেন, আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে নজর দেয়া হলে ব্যবসায়ীরা স্বস্তিতে ব্যবসা করতে পারতেন।
ফকিরেরপুল বাজার সাধারণ ব্যবসায়ী সমিতির শওকত হোসেন বলেন, প্রতিটি বাজারেই ‘কন্ট্রোলার’ রয়েছে। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, সেই সরকারের লোকজন বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।
বাংলাদেশ সুপার মার্কেট ওনার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, মনিটরিংয়ের অভাবে বাজার অস্থিতিশীল থাকে। তা না হলে এক রাতের ব্যবধানে ৫০ টাকার পণ্য কীভাবে ৭০ টাকা হয়ে যায়? এই সিন্ডিকেটকে দেখা বা ছোঁয়া যায় না, কিন্তু এর প্রভাব ভোক্তার গায়ে লাগে।
পালস অ্যান্ড ল্যান্টিল ক্রাশিং মিল মালিক সমিতির বিকাশ চন্দ্র সাহা বলেন, গত ১০ দিনের ব্যবধানে ডাবলি ও ছোলার দাম কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে। কেন বেড়েছে, তার কোনো সদুত্তর নেই। সিটি গ্রুপ সরবরাহ কমিয়ে দেয়ায় কেউ কেউ বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।
রুটি-বিস্কুট প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন বলেন, অর্থমন্ত্রী যেদিন বাজারে পণ্যের দাম বাড়তে পারে বলে মন্তব্য করেছেন, তার পরদিনই দাম বেড়ে গেছে। বেকারিতে ময়দা, তেল ও চিনির দাম এতটাই বেড়েছে যে গত তিন মাসে ২০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে প্রায় এক হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। তিনি বলেন, ময়দা, তেল ও চিনির দাম বাড়ার কারণে আগামী চার-পাঁচদিনের মধ্যে রুটি-বিস্কুটের দাম ২০ শতাংশ বাড়তে পারে।
নারায়ণগঞ্জ চেম্বারের পরিচালক সোহেল আক্তার বলেন, সিটি করপোরেশনকে সম্পৃক্ত করা ছাড়া কার্যকর বাজার মনিটরিং সম্ভব নয়। নারায়ণগঞ্জের একটি বাজারে প্রতিদিন একটি চৌকি (খাট) ভাড়া বাবদ ৩ হাজার টাকা দিতে হয়। এই অর্থ ব্যবসায়ীরা ভোক্তার কাছ থেকেই তুলে নেন।
মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মওলা বলেন, একসময় অনেক প্রতিষ্ঠান ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা করত। ব্যাংকিং, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং আইন-কানুনের বেড়াজালে পড়ে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এখন হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে বাজার রয়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো চালু করা না গেলে ভোজ্য তেল ও চিনির সংকট অনিবার্য হয়ে উঠবে।
মেঘনা গ্রুপের জ্যেষ্ঠ উপ-মহাব্যবস্থাপনা পরিচালক তসলিম শাহরিয়ার বলেন, ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চিনি রপ্তানিকারক দেশ হয়েও শুল্কমুক্ত সুবিধায় চিনি আমদানি শুরু করেছে। এর প্রভাবে ব্রাজিলে চিনির দাম বাড়তে শুরু করেছে। তবে বাংলাদেশে মিলগেটে চিনির দাম স্থিতিশীল রয়েছে।
কাওরান বাজার কাঁচামাল আড়ত ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান সুজন ফুটপাতের হকার ও অনিবন্ধিত ব্যবসায়ীদেরও তদারকির আওতায় আনার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে বাংলাদেশ সুপার মার্কেট ওনার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন বলেন, নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরবরাহ ব্যবস্থায় পণ্যের হাতবদলের সংখ্যা কমিয়ে আনা প্রয়োজন। তার মতে, উৎপাদক থেকে ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানোর পথে যত বেশি স্তর থাকবে, তত বেশি খরচ যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
অনুষ্ঠানে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, সরকার বেতন স্কেল ঘোষণা করেছে। বাজারে জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এমনিতে সাধারণ মানুষ কষ্টে আছে। এই পরিস্থিতিতে কিছু মানুষের বেতন বেড়ে গেল, আর সেই সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরাও চাল, ডাল ও তেলের দাম দুই টাকা থেকে পাঁচ টাকা করে বাড়িয়ে দিলেন-এটা যেন না হয়। ফজলুল হক আরও বলেন, ব্যবসায়ীদের সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব আছে। ব্যবসায়ীরা বেতন বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে বাড়তি মুনাফা, মূল্যবৃদ্ধি, সিন্ডিকেট করবেন না; সভা থেকে আমরা এই বার্তা দিতে চাই।’
অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী বড় শিল্পগোষ্ঠী হাতে গোনা কয়েকটি। এসব কোম্পানি উৎপাদনের পাশাপাশি কাঁচামাল আমদানি করে বাজারে সরবরাহ ঠিক রাখে। সাম্প্রতিক গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহে বিঘ্ন হচ্ছে। এ অবস্থায় যেকোনো মূল্যে কারখানাগুলো সচল রাখার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীরা জানান, চিনি, ভোজ্য তেল, ডাল, আটা, ময়দাসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ থাকবে না। এ জন্য উৎপাদনমুখী শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
সভায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন বণিক সমিতির নেতারা সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে হয়রানি বন্ধের দাবি জানান। প্রয়োজন হলে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা নেওয়ারও আহ্বান জানান তারা।