বর্তমান জ্বালানি সংকট থেকে দেশকে বের করে আনতে সরকার ৫টি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার সংসদ অধিবেশনে সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার (টেবিলে উপস্থাপিত) এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান ও আমদানি নির্ভরতার কারণে সৃষ্ট বর্তমান জ্বালানি সংকট থেকে দেশকে বের করে আনতে সরকার নিম্নবর্ণিত সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে-
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি: দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ১৫০টি কূপ খনন/ওয়ার্কওভার কর্মসূচির আওতায় ৩০টি কূপ খনন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং এর মাধ্যমে ১৪০ এমএমসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত হয়েছে। বর্তমানে চলমান ৭টি কূপ খনন শেষ হলে আরো ৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস যুক্ত হবে। অবশিষ্ট কূপসমূহ খননের জন্য পর্যায়ক্রমে প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে।
সাইসমিক জরিপ: দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সাইসমিক সার্ভে এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গ কিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
বাপেক্স শক্তিশালীকরণ: বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন এন্ড প্রোডাকশন কোম্পানী লিঃ (বাপেক্স)-কে শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে আরও ২টি নতুন রিগ ক্রয়ের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
পিএসসি (প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্যাক্ট) ও বিডিং: অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬ অনুমোদনের পর বিড রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। এছাড়া, অনশোর মডেল পিএসসি অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অফশোর এবং অনশোর গ্যাস অনুসন্ধানের মাধ্যমে গ্যাস পাওয়া গেলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ: কক্সবাজার জেলার মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে কুতুবজোমে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের লক্ষ্যে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নেগোসিয়েশন চলমান রয়েছে। ডিসেম্বর ২০২৮ সালে উক্ত টার্মিনাল হতে রিগ্যাসিফাইড এলএনজি (গ্যাস) সরবরাহ করা সম্ভব হবে মর্মে আশা করছি। ফলে আগামী ২ বছরের মধ্যে এলএনজি আমদানি আরও ৬০০ এমএমসিএফডি বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা অথবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলে জরুরি ভিত্তিতে নতুন ২/১টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন হলে সামগ্রিকভাবে দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে।
সাংসদ নিলোফার চৌধুরী মনির টেবিলে উপস্থাপিত এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানীর ব্যবহার বাড়াতে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ বাড়াতে বর্তমান সরকার নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ কর্তৃক ৮ জুন সৌর বিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য অপরিহার্য পণ্যসমূহ যেমন: সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ইত্যাদির ওপর আরোপণীয় সমুদয় কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, আগাম কর এবং ২% (দুই শতাংশ) অতিরিক্ত অগ্রীম আয়কর হতে শর্তসাপেক্ষে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আগামী ৬ মাসের মধ্যে যারা রুফটপ সোলার স্থাপন করবেন তাদের গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ১০.১৫ টাকা করে ক্রয় করবে। অর্থাৎ বাল্ক রেট এর অতিরিক্ত টাকা সরকার প্রণোদনা হিসেবে প্রদান করবে। ফলে গড়ে উৎপাদন মূল্য ৬-৭ টাকা প্রতি ইউনিট হিসেবে ৪৫ শতাংশ (৪০% মুনাফা ও ৫% প্রিমিয়াম) পর্যন্ত মুনাফার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই সুবিধা পরবর্তী তিন বছরের জন্য প্রযোজ্য হবে।
সংসদ নেতা বলেন, দেশের সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ ভবনের ছাদে রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপনের জন্য জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। উক্ত কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য একটি গাইডলাইন প্রস্তুত করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ/সংস্থাসমূহকে ইতোমধ্যে বিশেষ বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। দেশের সকল জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ইতোমধ্যে রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। সোলার ছাড়াও পানি বিদ্যুৎ, বায়ু বিদ্যুৎ ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করছি উক্ত কার্যক্রমসমূহ বাস্তবায়িত হলে জ্বালানি সংকট মোকাবেলা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হবে।
সাংসদ মো. মনিরুল হক চৌধুরীর (টেবিলে উপস্থাপিত) এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সকল কওমী মাদরাসার সমন্বয়, উন্নয়ন ও পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণের জন্য ২০০৬ সালে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে “কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বাংলাদেশ” নামে একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গঠন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে
“আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ” এর অধীন ‘কওমি মাদরাসাসমূহের দাওরায়ে হাদিস (তাকমীল)-এর সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রি (ইসলামিক স্টাডিস ও আরবি)-এর সমমান প্রদান আইন, ২০১৮ প্রণয়ন করে নিম্নবর্ণিত ৬টি কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড গঠন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সেগুলো হল- বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ; বেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া গওহরডাঙ্গা বাংলাদেশ, আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিস বাংলাদেশ; আযাদ দ্বীনি এদারায়ে তালীম বাংলাদেশ; তানযীমুল মাদারিসিদ দ্বীনিয়া বাংলাদেশএবং জাতীয় দ্বীনি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বাংলাদেশ।
তারেক রহমান বলেন, গত ২৩ জুন “বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদ্রাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা, ২০২৬” সংশোধনপূর্বক সহকারী মৌলভী (ক্বারী) এবং ইবতেদায়ী ক্বারী পদে নিয়োগের কাম্য যোগ্যতায় ৬টি কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের সনদকে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে এবং উক্ত ২টি পদে কওমী মাদরাসায় দাওরায়ে হাদিস (তাকমীল) ডিগ্রিসহ ইলমে কিরাআত/হিফজুল কোরআন সনদ প্রাপ্তদের নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।