ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন ও ব্যাংক খাতের সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ৬ মাস পূর্ণ হয়েছে। নির্বাচনি ইশতেহারে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং ডিভিশন বিলুপ্ত করা, ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও প্রথম ৬ মাসে এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নেয়। এর আগে ৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত নির্বাচনি ইশতেহারে আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন, ক্ষমতা ও তদারকি জোরদারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। একইসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং ডিভিশন বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকের তদারকির দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে দেওয়ার কথা বলা হয়। এশীয়সংস্কৃতি জানা
এছাড়া ইশতেহারে অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কারের জন্য বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ, গবেষক, অভিজ্ঞ ব্যাংকার, করপোরেট নেতা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি ‘অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল। তবে সরকারের ৬ মাসে এসব উদ্যোগের উল্লেখযোগ্য কোনোটি বাস্তবায়নের পথে এগিয়েছে—এমন দৃশ্যমান কার্যক্রম দেখা যায়নি।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ ব্যাংক রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের শিকার হয়েছিল। তাই সরকার পতনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাবি ছিল পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি দল সংশোধনী আইনের খসড়া তৈরি করে। পরে খসড়াটির ওপর আইনগত মতামত নেওয়া হয়।
পর্যায়ক্রমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে আলোচনা শেষে সংশোধনী প্রস্তাবটি গত বছরের অক্টোবরের মাঝামাঝি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। প্রস্তাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিয়োগ সাংবিধানিক করা, নিজস্ব বাজেট ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ, জনবল ব্যবস্থাপনায় স্বাধীনতা এবং সরকারের হস্তক্ষেপমুক্ত নীতি নির্ধারণের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রস্তাব ছিল। শুরুতে কোনো আমলা না রাখার কথা বলা হলেও পরে একজন সরকারি প্রতিনিধি, ৬ জন স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ, গভর্নর ও একজন ডেপুটি গভর্নরকে নিয়ে পর্ষদ গঠনের প্রস্তাব করা হয়।
তবে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে দীর্ঘদিন কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় বিষয়টি আর এগোয়নি। তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এ বিষয়ে সে সময়কার অর্থ উপদেষ্টাকে চিঠি দেন। ওই সময় অর্থ উপদেষ্টা জবাবে জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অধ্যাদেশ জারি বাস্তবসম্মত হবে না; পরবর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রয়োজন অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা ও সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়াই অধিকতর যুক্তিযুক্ত। যদিও নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ৬ মাস পরও সেই সংস্কার উদ্যোগের বাস্তবায়ন শুরু হয়নি।
অন্যদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং ডিভিশন বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও বিশেষায়িত ব্যাংক পরিচালনার তদারকির ভার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে ছেড়ে দেওয়ার কথাও জানানো হয় ইশতেহারে। যদিও সরকারের ছয় মাসে এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের পাশাপাশি ব্যাংকিং ডিভিশন বিলুপ্ত অত্যন্ত জরুরি। কারণ, বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ভঙ্গুর অবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে এসব ব্যাংক দ্বৈতশাসন নীতিতে চলছিল। এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থাকার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ নিতে পারছে না।
জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালনা পর্ষদ নিয়োগে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রভাব থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এসব প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি দুর্বল হয়ে যায়। একইভাবে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ও মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পর্যায়ের পদোন্নতিতে মন্ত্রণালয়ের প্রভাব ব্যাংকের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা কাঠামোকেও দুর্বল করছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগমুখী করে তোলে। এতে ব্যাংকের কর্মপরিবেশ বিনিষ্ট হয়। পদোন্নতি প্রদান ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ এখতিয়ার হওয়া উচিত বলেও জানান তারা। এশীয়সংস্কৃতি জানা
এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ব্যক্তিদের নিয়োগ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। দেখা যাচ্ছে, একদিকে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ব্যাংকের পর্ষদে বসছেন, অন্যদিকে সেই পর্ষদের কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নীতিগত ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও মন্ত্রণালয়ের আওতায় থাকছে। ফলে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, গত দেড় দশক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তারা পর্ষদে থাকার পরও ব্যাংকগুলোতে লুটপাট হয়েছিল। নামে-বেনামে বিভিন্ন ঋণ নেওয়া হয়েছে। তারা থাকা সত্ত্বেও এসব ঋণের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর দায়ও তারা নেননি।
দেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট, ঋণ আদায়ে দীর্ঘসূত্রতা এবং অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে বড় ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের এসব সমস্যা সমাধানে শুধু দুর্বল ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দেওয়া বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
তাদের মতে, ব্যাংক খাতের স্থায়ী সংস্কারের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকৃত স্বাধীনতা, পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি, ঋণ অনুমোদন ও আদায় ব্যবস্থার সংস্কার এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছিল। অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে ঋণ অনুমোদন, পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে। এসব বন্ধে কার্যকর কাঠামোগত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একইভাবে বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও ছিল। কিন্তু ঋণ আদায় ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে এখনো বড় ধরনের পরিবর্তন দৃশ্যমান নয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের প্রথম ৬ মাস নীতিগত অবস্থান নির্ধারণ ও সংস্কারের ভিত্তি তৈরির সময় হলেও ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকটের গভীরতা বিবেচনায় এখন দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটানো না গেলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই করা কঠিন হবে।
গত ২৪ আগস্ট সরকারের ৬ মাসের কার্যক্রমের ওপর অনুষ্ঠিত মিডিয়া সংলাপে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকার গত ৬ মাসে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পথে এগোয়নি। সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সাহসের অভাব দেখা যাচ্ছে। আমার দেশ