আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিতে লিওনেল মেসির দীর্ঘ ও গৌরবময় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। তার এই সিদ্ধান্তে আবেগাপ্লুত সতীর্থরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক হৃদয়স্পর্শী বার্তায় বিদায় জানিয়েছেন কিংবদন্তি অধিনায়ককে। প্রতিবেদন টিওয়াইসি স্পোর্টসের।
২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে মেসি আর্জেন্টিনাকে এনে দিয়েছেন কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা ও বিশ্বকাপের মতো ঐতিহাসিক সাফল্য। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পেয়েছিল তার দীর্ঘ অপেক্ষা। সতীর্থদের কাছে মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন; তিনি একজন নেতা, অনুপ্রেরণা এবং প্রিয় বন্ধু।
রদ্রিগো দে পল
মেসির সবচেয়ে কাছের সতীর্থদের একজন রদ্রিগো দে পল আবেগঘন দীর্ঘ বার্তায় লিখেছেন, জাতীয় দলের জন্য মেসির নিঃশর্ত ভালোবাসা, কঠিন সময়েও হাল না ছাড়ার মানসিকতা এবং প্রতিটি সতীর্থ ও স্টাফকে আপন করে নেওয়ার কথা।
দে পলের ভাষায়, ‘মেসি কখনো ক্যামেরার সামনে নিজের কথা বলতে পছন্দ করতেন না। তার বুটই ছিল তার কথা বলার মাধ্যম। মাঠের বাইরের মেসিকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন দে পল; চাপ, ভয়, সংশয়, সমালোচনা কিংবা পরাজয়ের পরও পরদিন উঠে দাঁড়িয়ে আবার লড়াই করার মেসিকে।
তিনি লিখেছেন, ‘মেসির জন্য জাতীয় দলের হয়ে অর্জন করা গোল ও শিরোপার চেয়েও বড় ছিল দেশের প্রতি তার ভালোবাসা। তুমি আমাদের এবং আর্জেন্টিনার জন্য যা করেছ, তার জন্য ধন্যবাদ। তোমার কাছ থেকে আমি সেই লিওকে চিনেছি, যাকে সবাইকে চেনাতে চেয়েছিলাম। ১০ নম্বর জার্সি, অধিনায়কের আর্মব্যান্ড কিংবা বিশাল কোনো মাঠ ছাড়াও যে মানুষটি একজন দৈত্য। আমি তোমাকে ভালোবাসি, ভাই।’
দে পল আরও লিখেছেন, ‘মেসির পাশে থেকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার অভিজ্ঞতা তার জীবনের অন্যতম বড় সৌভাগ্য।’
লিয়ান্দ্রো পারেদেস
লিয়ান্দ্রো পারেদেস লিখেছেন, ‘আমি ভেবেছিলাম এই খবরের জন্য প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু স্পষ্টতই ছিলাম না।’
মেসির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একজন আর্জেন্টাইন, জাতীয় দলের সমর্থক, সতীর্থ এবং বন্ধু হিসেবে মেসি তার জীবনে যে প্রভাব ফেলেছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।’
মেসির উদ্দেশে লিখেন, ‘তোমার উত্তরাধিকার ও মহানুভবতার কথা বলার মতো শব্দ আমার কাছে নেই। একজন খেলোয়াড় হিসেবে নয়, সর্বোপরি একজন মানুষ হিসেবে তুমি অসাধারণ। তোমার সঙ্গে জাতীয় দলের এই অসাধারণ সময়টা কাটাতে পেরে আমি অত্যন্ত ভাগ্যবান।’
ক্রিস্তিয়ান রোমেরো
আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের অন্যতম স্তম্ভ ক্রিস্তিয়ান রোমেরো সংক্ষিপ্ত কিন্তু আবেগঘন বার্তায় লিখেছেন, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি, তোমাকে শ্রদ্ধা করি এবং তুমি আমার জন্য ও আমাদের দেশের জন্য যা করেছ, তার জন্য চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকব। সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ, অধিনায়ক।’
আনহেল দি মারিয়া
মেসির দীর্ঘদিনের বন্ধু ও জাতীয় দলের সতীর্থ আনহেল দি মারিয়ার বার্তাতেও ছিল গভীর আবেগ। তিনি লিখেছেন, ‘তুমি অবসর নিচ্ছ; এটা পড়া কতটা কঠিন, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আর আকাশি-সাদা জার্সিতে তোমাকে আর দেখতে পাব না; এই ভাবনাটাও কঠিন।’
দি মারিয়া মনে করেন, তিনি যেন সঠিক সময়েই জন্মেছিলেন; মেসিকে দেখার, উপভোগ করার এবং তার সঙ্গে জাতীয় দলে বছরের পর বছর খেলার সুযোগ পাওয়ার জন্য।
মেসিকে উদ্দেশ্য করে দি মারিয়ার ভাষ্য, ‘তোমার সব স্বপ্ন পূরণ হতে দেখেছি, বিশেষ করে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন; বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া। আজ তুমি এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছ, যেটা তুমি কিংবা কোনো আর্জেন্টাইনই চাইত না। কিন্তু সেটাই বাস্তবতা। সবকিছুর জন্য তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। তুমি চিরন্তন এবং ইতিহাসের সর্বকালের সেরা।’
এনজো ফের্নান্দেজ
মেসির সঙ্গে খেলার স্বপ্ন দেখা ছোট্ট এনজো ফের্নান্দেজের গল্পটি সবচেয়ে আবেগঘন। এনজো লিখেছেন, মেসি যখন একবার জাতীয় দল ছাড়ার কথা জানিয়েছিলেন, তখন তিনি খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। তখন তিনি ছিলেন কেবল একজন কিশোর। নিজের বয়সের সঙ্গে মেসির বয়স মিলিয়ে হিসাব করতেন; তিনি আদৌ কখনো মেসির সঙ্গে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলতে পারবেন কি না।
ফের্নান্দেজের ভাষ্য, ‘সেটা হয়তো বোকামির মতো শোনায়, কিন্তু আমি সত্যিই হিসাব করতাম। ভাবতাম, তোমার আর কত বছর বাকি, আমার প্রথম বিভাগে উঠতে কত বছর লাগবে; আর স্বপ্ন দেখতাম, অন্তত একবার হলেও তোমার সঙ্গে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলব।’
শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্নের চেয়েও বেশি কিছু পেয়েছেন এনজো। মেসির সঙ্গে শুধু মাঠেই খেলেননি; ভাগ করেছেন অনুশীলন, ড্রেসিংরুম, কথোপকথন, আলিঙ্গন, কঠিন সময় এবং বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ।
ফের্নান্দেজ আরও বলেন, ‘আমি আমার আইডলের সঙ্গে মাঠ ভাগ করার স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু তার বদলে এমন একজন মানুষকে পেয়েছি, যিনি প্রথম দিন থেকেই আমাকে দলের একজন মনে করিয়েছেন।’
আগামী দিনে জাতীয় দলের অনুশীলনে মেসিকে ছাড়া মাঠে নামার কথা ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে এনজোর।
লাউতারো মার্তিনেজ
মেসির কাছ থেকে মাঠের বাইরের শিক্ষার কথাই বেশি স্মরণ করেছেন লাওতারো। কখনো হাল না ছাড়া, প্রতিটি ব্যর্থতার পর আবার চেষ্টা করা, নীরবে কঠোর পরিশ্রম করা এবং নিজের ওপর বিশ্বাস রাখার শিক্ষা পেয়েছেন তিনি।
মেসিকে নিয়ে বার্তায় তিনি বলেন, ‘তোমার নেতৃত্ব শুধু গোল, অ্যাসিস্ট কিংবা শিরোপায় সীমাবদ্ধ ছিল না। এত বছর জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে তুমি যে উদাহরণ তৈরি করেছ, সেটাই ছিল তোমার আসল নেতৃত্ব।’
প্রতিটি পরামর্শ, কথোপকথন, অনুশীলন ও আলিঙ্গনের জন্য মেসিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন লাউতারো, ‘তুমি আমাদের সঙ্গে ইতিহাস তৈরি করেছ এবং তোমার গল্পের অংশ হওয়ার সুযোগ দিয়েছ। আমরা তোমাকে খুব মিস করব, অধিনায়ক।’
লিসান্দ্রো মার্তিনেজ
লিসান্দ্রো মার্তিনেজ লিখেছেন, এই দিনটি আসবে, এটা সবাই জানতেন। কিন্তু কেউই গভীরে গিয়ে সেটি মেনে নিতে চাননি। মেসির সঙ্গে বছরের পর বছর কাটানো সময়, জয়, কঠিন মুহূর্ত, জাতীয় দলের ক্যাম্পের হাসি-আনন্দ এবং স্মৃতিগুলো তুলে ধরে তিনি লিখেছেন, ‘তোমার মহানুভবতা শুধু মাঠে ছিল না। ছিল তোমার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি, প্রতিটি কথা এবং প্রতিটি উদাহরণে।’
মেসির কাছ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা, বিশ্বাস রাখা এবং কখনো হাল না ছাড়ার শিক্ষা পেয়েছেন বলেও জানান লিসান্দ্রো, ‘তুমি জাতীয় দল ছাড়ছ, কিন্তু তোমার উত্তরাধিকার চিরন্তন। সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ, অধিনায়ক।’
নিকোলাস তালিয়াফিকো
নিকোলাস তালিয়াফিকো মেসির সঙ্গে জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘ সময় কাটানোর স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, ‘তোমার পাশে এত বছর কাটানো এবং এত অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেয়া—এটা যে কত বড় সম্মানের ছিল! তোমার সঙ্গে এই জার্সি ডিফেন্ড করতে পারা এবং জাতীয় দলের হয়ে তোমার খেলা, তা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাওয়া ছিল অসাধারণ।’
মাঠে অর্জন এবং মাঠের বাইরের মানুষ হিসেবে মেসিকে সতীর্থদের জন্য উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তালিয়াফিকো। শেষে মজার ছলে তিনি লিখেছেন, ‘আর হ্যাঁ… একই দিনে ৩৪ বছরে পা রাখার সঙ্গে এমন খবরও আসবে; এটা আমার পরিকল্পনায় ছিল না।’
এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্তিনেজ
আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজও অধিনায়কের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘তুমি আমাদের এবং পুরো আর্জেন্টাইন জনগণের জন্য যা করেছ, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। শুধু তোমাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, তুমি আমাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ দিয়েছ এবং এমন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছ, যা আমি কখনো কল্পনাও করিনি।’
শেষে মেসির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দিবুর সংক্ষিপ্ত বার্তা, তোমার প্রতি আমার শ্রদ্ধা চিরকাল। ধন্যবাদ।’