শিগগিরই দূষণমুক্ত হচ্ছে না রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা ও হাতিরঝিল লেক। ওই এলাকায় প্রয়োজনীয় স্যুয়ারেজ লাইন না থাকায় লেকপাড়ের বাড়ির মালিকদের নিজ উদ্যোগে এসটিপি (স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) স্থাপনের তাগিদ দিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। তবে বাড়ির মালিকরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই দায়িত্ব তাদের নয়। এ নিয়ে বাড়ির মালিকদের সঙ্গে রাজউক ও ঢাকা ওয়াসার দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বাধ্য হয়ে এখন ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প নিতে যাচ্ছে ঢাকা ওয়াসা।
১৪ বছর আগে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে হাতিরঝিল প্রকল্প বাস্তবায়ন করে সরকার। তবে ঝিলের লেক কখনোই দূষণমুক্ত করা যায়নি। পাশাপাশি গুলশান-বনানী-বারিধারা লেকও দূষণের কবল থেকে বের হতে পারেনি। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গুলশান এলাকার লেকগুলো দূষণমুক্ত করার নির্দেশনা আসে। লেকপাড়ে বাড়ি হওয়ায় গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরও এ ব্যাপারে তৎপর হয়ে ওঠেন। তিনি লেকপাড়ের ভবনগুলোর স্যুয়ারেজ বিষয়ক তথ্য সংগ্রহ করতে রাজউককে নির্দেশনা দেন।
গত দুই মাসে রাজউক লেকপাড়ের চার হাজার ৪০৯টি ভবন পরিদর্শন করে। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৮৭টি ভবনে সেপটিক ট্যাঙ্ক পায়। বাকি ২ হাজার ৮২২টি ভবনে সেপটিক ট্যাঙ্ক ছিল না। চার হাজার ৬৮টি ভবনে সোকওয়েলই (বাসাবাড়ির পানি মাটিতে মেশার জন্য কুয়া) পাওয়া যায়নি। যেসব ভবনে সেপটিক ট্যাঙ্ক বা সোকওয়েল নেই, সেখানকার স্যুয়ারেজ বর্জ্য সরাসরি পাশের লেকে গিয়ে পড়ছে। এরপরই রাজউক এসব বাড়ির মালিকের নোটিশ দিয়ে নিজস্ব ব্যবস্থায় এসটিপি স্থাপনের নির্দেশ দেয়। এ নিয়ে বাড়ির মালিকদের সঙ্গে কয়েক দফা সভাও করে রাজউক। তবে কোনো বাড়ির মালিকই এ পর্যন্ত এসটিপি স্থাপন করেননি। বাধ্য হয়ে গত ৩ আগস্ট গুলশান সোসাইটি লেকপার্কে একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করে রাজউক। ওই সভায় গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান, রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলামসহ পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বৈঠকে সোসাইটির বাসিন্দারা জানিয়ে দেন, তারা নিজ অর্থায়নে এসটিপি স্থাপন করবেন না। তারা হোল্ডিং ট্যাক্স দেন, স্যুয়ারেজ বিল দেন, ট্যাক্স দেন। কাজেই এটা সরকারের দায়িত্ব। সে সময় রাজউকের তরফে বলা হয়, প্লটপ্রাপ্তদের লিজ দলিলের ৪ নম্বর শর্তে উল্লেখ আছে, ভবন তোলার সময় নিজ দায়িত্বে মালিককে এসটিপি স্থাপন করতে হবে। ওইসব প্লটের নকশা অনুমোদনের সময়ও নকশায় এসটিপি স্থাপনের কথা উল্লেখ ছিল। তবে হাতেগোনা কিছু বাড়ির মালিক ছাড়া বেশির ভাগই সেটা করেননি।
রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, বাড়ির মালিকরা নিয়ম মেনে এসটিপি ও সোকওয়েল তৈরি না করলে রাজউক শক্ত অবস্থানে যেতে বাধ্য হবে। তখন সোসাইটির বাসিন্দারা বলেন, বেশ কয়েক বছর আগে দাসেরকান্দিতে একটি পয়ঃশোধনাগার করে ঢাকা ওয়াসা। কিন্তু শোধানাগারে বর্জ্য যাওয়ার পাইপলাইন তৈরি করেনি। অথচ আরও ১ হাজার কোটি টাকা খরচ করলে পাইপলাইন তখনই করা যেত। সরকার একটি বড় প্রকল্প নিয়ে পাইপলাইন তৈরি করে দিক।
তখন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের প্রস্তাব করেন, একটি ভবনে নিজস্ব এসটিপি তৈরি করতে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা খরচ হয়। প্রতি ফ্ল্যাট মালিক ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা দিলেই একটি ভালো এসটিপি করতে পারেন। তাতেও রাজি হননি সোসাইটির বাসিন্দারা। এ অবস্থায় কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। বৈঠকে উপস্থিত থাকা নিকেতন সোসাইটির অফিস সেক্রেটারি আব্দুর রউফ বলেন, রাজউক সবাইকে একের পর এক চিঠি দিয়ে এসটিপি করতে বলছে। আমরা বলেছি– এটা সম্ভব না। প্রয়োজনে গুলশান এলাকার জন্য একটি কেন্দ্রীয় এসটিপি সরকার বানিয়ে দিক। রাজউক তা মানতে চাইছে না।
গুলশান সোসাইটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ এ হাবিব রানা বলেন, বিশ্বের কোনো শহরে বাড়ির মালিকদের দিয়ে এসটিপি তৈরি করানোর নজির নেই। এসব লেকের সঙ্গে ক্যান্টনমেন্ট ও দুটি ডিওএইচএস এলাকা আছে। কড়াইল বস্তি আছে। কিন্তু সেখান থেকে যে বর্জ্য লেকগুলোতে ঢুকছে, সেটার কথা বলা হচ্ছে না। তিনি জানান, ওই বৈঠকের কয়েক দিন পর আমাদের সোসাইটির কয়েকজন পূর্তমন্ত্রীর বাসায় গিয়ে একটি কারিগরি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়ে এসেছেন।
হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিতে চায় ওয়াসা
গুলশান, বনানীসহ আশপাশ এলাকার পয়ঃবর্জ্যকে ঢাকার বাইরে নিয়ে শোধন করার জন্য ৩ হাজার ৭১২ কোটি টাকা খরচ করে ২০২৩ সালে দাসেরকান্দিতে একটি পয়ঃশোধনাগার স্থাপন করে ঢাকা ওয়াসা। তবে সেখানে বর্জ্য যাওয়ার জন্য কোনো পাইপলাইনের ব্যবস্থা করা হয়নি। পাইপলাইন স্থাপনে এখন ওয়াসা ১ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, গুলশান এলাকার বর্জ্য ওই পাইপলাইনে যুক্ত করার জন্য একটি সংযোগ নেটওয়ার্ক করলে আর সমস্যা থাকবে না। তবে সেটা একনেকে পাস হওয়ার পরও শেষ করতে তিন থেকে চার বছর লাগবে। বাড়ির মালিকরা নিজ উদ্যাগে এসটিপি স্থাপন না করলে সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, বাড়ির মালিকরা এসটিপি না করলেও অন্তত সেপটিক ট্যাঙ্ক ও সোকওয়েল করে নিন। পাঁচ থেকে সাত বছর পর সেই বর্জ্য না হয় সিটি করপোরেশন নিয়ে গেল। চিঠি দেওয়ার পর অনেকে এটা করছেন। পাশাপাশি ওয়াসা প্রকল্প নিচ্ছে। ততদিন বসে থাকলে লেক তো আর লেক থাকবে না। সমকাল