টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হওয়া সাম্প্রতিক বন্যায় প্রায় ৪৭৮ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেকই হচ্ছে সবজি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিবৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষতি-সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৪৩টি জেলায় মোট আট লাখ ১৭ হাজার হেক্টর চাষাবাদ করা জমির মধ্যে ২৪ হাজার ১৩৮ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। উৎপাদনের ক্ষতির পরিমাণ এক লাখ ৩৩ হাজার ৯৭২ টন। আর্থিক হিসাবে যা ৪৭৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।
এ বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে গ্রীষ্মকালীন সবজির, যা মোট ক্ষতির প্রায় অর্ধেক। তথ্য বলছে, দুই লাখ ১৪ হাজার হেক্টর জমির শাকসবজির মধ্যে আট হাজার ৮৩৬ হেক্টর জমির ৮৭ হাজার ৯৬৭ টন শাকসবজি নষ্ট হয়েছে। আর্থিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ ২৩১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।
এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের তালিকায় রয়েছে আউশ ধান, আমন বীজতলা, আদা, মরিচ, হলুদ, পেঁপে, তরমুজ, চীনাবাদাম, পাট, কলা, আখ, খরমুজ, ভুট্টা ও পান। মোট ক্ষতিগ্রস্ত জমির মধ্যে ১২ হাজার ৭৮৩ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছিল আউশ ধান এবং এক হাজার ৭৪৬ হেক্টরে আমন বীজতলা।
দ্রুত সব কৃষককে সহায়তা দেওয়া দরকার। যেন তারা উৎপাদনে নিরুৎসাহিত না হন। কারণ এরই মধ্যে বাজারে অনেক কিছুর দাম বেড়েছে, যেগুলো বন্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত। পর্যাপ্ত সহায়তা না পেলে কৃষক চাষাবাদ কমিয়ে দেবে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে সরবরাহ ব্যবস্থায়।- কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান
এ দুই ধান মিলে নষ্ট হয়েছে ১৮৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকার আবাদ। সেই সঙ্গে চার কোটি ৭৯ কোটি টাকার মরিচ, ২৩ কোটি টাকার আদা ও সাড়ে ৯ কোটি টাকার হলুদ নষ্ট হয়েছে।
অন্যদিকে ফলের মধ্যে বড় ক্ষতি হয়েছে পেঁপের। এসময় প্রায় দুই কোটি সাত লাখ টাকার পেঁপে ও অন্যান্য সব ফল মিলে ৭৩ কোটি ৯ লাখ টাকার ফল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সাত জেলায় ক্ষতির পরিমাণ বেশি
সারাদেশে এবারের বন্যায় দুই লাখ ৪৩ হাজারেরও বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাত জেলা। এগুলো হলো- ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, সার্বিকভাবে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিতে সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। বন্যার পরবর্তী সময়ে সবজিসহ কাঁচাবাজারের বেশকিছু পণ্যের দাম বেড়ে গেছে।
সরবরাহ কমে যাওয়ায় কাঁচা মরিচের কেজি এরই মধ্যে ৩০০ টাকা ছাড়িয়েছে। সবজি প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকার আশপাশে। বেগুন, শসাসহ বিভিন্ন সবজির দাম বন্যার আগের তুলনায় ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে কেজিতে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রেতারা।
বীজ ও সার সহায়তার মাধ্যমে বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার কার্যক্রম চলছে। আউশ ধান ও রোপা আমনের বীজতলা করার জন্য বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর প্রায় ৬৩ হাজার কৃষককে এরই মধ্যে নাবি জাতের আমন বীজ সরবরাহ করা হয়েছে।- কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল
কৃষকদের সহায়তা দেওয়ার আহ্বান
এ নিয়ে কথা হলে কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, দ্রুত সব কৃষককে সহায়তা দেওয়া দরকার। যেন তারা উৎপাদনে নিরুৎসাহিত না হন। কারণ এরই মধ্যে বাজারে অনেক কিছুর দাম বেড়েছে, যেগুলো বন্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত। পর্যাপ্ত সহায়তা না পেলে কৃষক চাষাবাদ কমিয়ে দেবে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে সরবরাহ ব্যবস্থায়।
তার মতে, যেহেতু এখনো আমন ধান রোপণের সময় রয়েছে, সেজন্য ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নতুন করে বীজতলা তৈরির জন্য সহায়তা দেওয়া দরকার। না হলে এ ক্ষতি পরবর্তীতে খাদ্য নিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি করবে। কারণ দেশের খাদ্যের একটি বড় জোগান আসে আমন থেকে।
অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, বীজ ও সার সহায়তার মাধ্যমে বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার কার্যক্রম চলছে। আউশ ধান ও রোপা আমনের বীজতলা করার জন্য বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর প্রায় ৬৩ হাজার কৃষককে এরই মধ্যে নাবি জাতের (দেরিতে রোপণযোগ্য) আমন বীজ সরবরাহ করা হয়েছে।
তিনি জানান, বাকি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের শীতকালীন ফসল রোপণ মৌসুমের আগেই সহায়তা দেওয়া হবে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তাৎক্ষণিক সহায়তা নিশ্চিত করা হয়েছে। তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্তরাও সহায়তা পাবেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদে ক্ষতি ৪০০ কোটি
এর আগে গত সপ্তাহে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিশ্চিত করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। ওই সংস্থার দুটি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মোট ক্ষতি হয়েছে ৩৯৯ কোটি ১২ লাখ টাকার।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব খাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি। জেলাগুলোর ১৫৬টি ইউনিয়নে এক লাখ ৫৭ হাজার ৩০০টি গরু, চার হাজার ১৪৮টি মহিষ, এক লাখ ১২ হাজার ৬৫৫টি ছাগল, ২৪ হাজার ৭৯৫টি ভেড়া, ১১ লাখ ৯১ হাজার ২০টি মুরগি ও ২৪ হাজার ২৮টি হাঁস বন্যাকবলিত হয়েছে।
এছাড়া এসব এলাকায় এরই মধ্যে ৪৫টি গরু, ১২৩টি ছাগল, ৪০টি ভেড়া, এক লাখ এক হাজার ১৯৮টি মুরগি ও এক হাজার ৫২১টি হাঁস মারা গেছে। পাশাপাশি বন্যায় ৬৫টি গবাদিপশুর খামার এবং ৬৩টি হাঁস-মুরগির খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ১১৮ টন গোখাদ্য নষ্ট হয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬০২টি ইউনিয়নে ১২ হাজার ৪৩ মেট্রিক টন সাদা মাছ, ১৪ হাজার মেট্রিক টন চিংড়ি, ১৮ লাখ পোনা এবং ২৫৯ লাখ রেণু বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। এছাড়া নৌযানের ক্ষতি হয়েছে এক কোটি ৬৭ লাখ টাকার, মাছ ধরার জালের ক্ষতি এক কোটি ২৩ লাখ টাকার এবং অবকাঠামো, স্লুইসগেট, পুকুর, ঘেরসহ অন্যান্য খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৩৮২ লাখ টাকা। জাগো নিউজ