আগামী সপ্তাহে গ্যাস সংকট পরিস্থিতির উন্নতি হবে। পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও এক সপ্তাহ সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
সোমবার (২৭ জুলাই) সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী এ কথা জানান।
সরকারের পক্ষ থেকে গ্যাস সংকট পরিস্থিতি উত্তরণে সব প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে দাবি করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা জানি বাসা-বাড়িতে মা-বোনেরা, গৃহিণীরা সংসারের রান্নার কাজে প্রতিদিন চ্যালেঞ্জ অনুভব করছেন। ইন্ডাস্ট্রিগুলোর প্রোডাকশন কম্প্রোমাইজড হয়েছে। এই কারণে আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি জনগণের কাছে।
তিনি বলেন, বলতে কোনো দ্বিধা নেই এটা সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের ত্রুটি নয়। একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু, স্টিল তারা দেশের এই সাপ্লাইটা এনসিওর করে। আমরা তাদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছি। আমরা এই মুহূর্তে তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে পারছি না, এটা আমাদের সীমাবদ্ধতা। আমরা এজন্য বারবার দুঃখপ্রকাশ করছি। কিন্তু, একেবারে ২৪/৭ আমাদের টিম তাদের সঙ্গে একান্তভাবে কাজ করছে। আমরা যেটা বললাম, আশা করছি আগামী সপ্তাহ থেকে পরিস্থিতির উন্নয়ন হবে ইনশাআল্লাহ।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, টোটাল সাপ্লাইটা (ত্রুটি দেখা দেওয়া ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ থেকে) ৫০০-৫৫০ এর মতো, আমরা আশা করছি আগামী সপ্তাহ থেকে ২৮০-৩০০ তারা ন্যাশনাল গ্রিডে, অর্থাৎ ২৮০-৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট পার ডে তারা ন্যাশনাল গ্রিডে সাপ্লাই দিতে সমর্থ হবে। এটা তাদের স্টেটমেন্ট অনুযায়ী বলছি। এটা আমাদের নয়, তাদের তথ্যের ভিত্তিতে।
অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, আগামী সপ্তাহে ৫০ শতাংশ সরবরাহ চালু করতে পারলে পরের সপ্তাহে ১০০ শতাংশ করতে পারবে। এটাই এখন পর্যন্ত প্ল্যানিং আছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানিকৃত এলএনজি মিলিয়ে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে দেশীয় উৎপাদন ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানিকৃত এলএনজি থেকে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়।
তিনি বলেন, আমদানিকৃত এলএনজি দুটি ভাসমান টার্মিনাল (এফএসআরইউ) দিয়ে রি-গ্যাসিফাই করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। গত সপ্তাহে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত একটি এফএসআরইউতে বড় ধরনের কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আমদানিকৃত এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সমস্যার সমাধান হবে। পরে ৪৮ ঘণ্টা পার হলেও সমাধান না হওয়ায় আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বিশেষজ্ঞ আনা হয়েছে। পেট্রোবাংলা, আরপিজিসিএল ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং এক্সিলারেট এনার্জির বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন।
বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় স্পেয়ার পার্টস আনা হচ্ছে। এগুলো এয়ার ফ্রেইটে আনা হলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাস্টম ছাড়পত্র দিয়ে মেরামত কাজে ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে বলেও জানান অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে এফএসআরইউতে একটি বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কিছু যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। তিনি বলেন, ওই সময় কাছাকাছি একটি এলএনজি কার্গো থাকলেও দ্রুত সেটি সরিয়ে নেওয়ায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
তিনি আরও জানান, এলএনজি দীর্ঘ সময় মজুত করে রাখা হয় না। জাহাজে করে এলএনজি আসে এবং এফএসআরইউতে তা গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। একটি টার্মিনাল অচল থাকায় কার্গোর সময়সূচিতে কিছু পরিবর্তন আনতে হয়েছে। তবে সামিট পরিচালিত অন্য এফএসআরইউ স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে।
স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানান, শুধু বর্তমান সংকট মোকাবিলা নয়, ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও সরকার একাধিক বিকল্প নিয়ে কাজ করছে। স্বল্পমেয়াদে ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস ব্যবহার এবং মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। মধ্যমেয়াদে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আর দীর্ঘমেয়াদে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে রি-গ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় প্রয়োজন থাকলেও অতিরিক্ত এলএনজি আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। নতুন টার্মিনাল স্থাপন করা গেলে সরবরাহ বাড়ানো যাবে।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, ভোলার স্থানীয় চাহিদা, শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজন মেটানোর পর যদি উদ্বৃত্ত গ্যাস থাকে, তাহলে তা মূল ভূখণ্ডে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জনগণের সঙ্গে আলোচনা শেষে সবকিছু অনুকূলে থাকলে প্রায় এক বছরের মধ্যে সেই গ্যাস শিল্পকারখানা বা বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে অফশোর বিডিং রাউন্ড চালু করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো এতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আগামী নভেম্বরে বিড জমা দেওয়ার শেষ সময়।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।