মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৩ অপরাহ্ন




আর্জেন্টিনার মেসি-মায়া কাটানোর রাত

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:৪৯ am
মেসি Cristiano Ronaldo dos Santos Aveiro Portuguese footballer Portugal national team পর্তুগিজ পর্তুগাল ফুটবলার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ronaldo Argentina Argentine Footballer Lionel Andrés Messi আর্জেন্টিনা তারকা লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনা মেসি রোনাল্ডো মেসি-রোনাল্ডো মেসি-রোনাল্ডো মেসি মেসি
file pic

বছর একুশ আগে প্রভাতের যে সূর্য একদিন উদিত হয়েছিল বিশ্বফুটবলের আঙিনায়, আজ গোধূলির আলোয় সে যেন তার সব হিরণ্ময় দ্যুতি বিলিয়ে দেওয়ার অপেক্ষায়। আকাশি-সাদার সেই চিরচেনা আপন জার্সি, আত্মীয়ের মতো আগলে রাখা প্রিয় গ্যালারি আর বুয়েন্স আয়ার্সের হৃৎস্পন্দন– এস্তাদিও মনুমেন্তাল। সব ছেড়ে নিজের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচটি খেলতে নামছেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। আফ্রিকার দেশ বেনিন এখানে নেহাতই প্রতিপক্ষের এক লৌকিক উপলক্ষ মাত্র; এদিনের (বাংলাদেশ সময় আগামীকাল বুধবার ভোর ৫টা) সব কোলাহল, সব আয়োজন আসলে শুধুই একজনের প্রতি আমৃত্যু কৃতজ্ঞচিত্তে বিদায়ী অর্ঘ্য সঁপে দেওয়ার। ফুটবল মাঠ? ভুল কথা।

মাঠ শব্দটা আজ বড় ম্লান শোনায়। বিদায়ের এই পুণ্যমঞ্চ হয়ে উঠতে যাচ্ছে কোটি আর্জেন্টাইনের এক রোদনভরা উপাসনালয়। ৮৫ হাজার মানুষ আজ মাঠে আসছেন স্রেফ ৯০ মিনিটের খেলা দেখতে নয়। তারা আসছেন তীর্থযাত্রীর মতো, তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ মানুষটিকে শেষবারের মতো ওই রাজকীয় জার্সিতে দু-চোখ ভরে দেখতে। ‘মেসি ফুটবল সভ্যতা’র এক অমোঘ সমাপ্তির সাক্ষী হতে।

আর্জেন্টিনার এই আবেগময় ম্যাচ ঘিরে চারপাশটা যখন দারুণভাবে আন্দোলিত, তখন লকাররুমের আরশিতে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো ওই নীল-সাদা ১০ নম্বর উত্তরীয়টি গায়ে জড়ানোর সময় লিওনেল মেসির নিজের মনের ভেতর কি মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন চলবে না? যে মানুষটা অলৌকিক ফুটবল পায়ে একটা আস্ত প্রজন্মকে মায়াজালে বুঁদ করে রেখেছিলেন, যিনি ফুটবলকে দু-হাত ভরে সব দিয়ে, প্রাপ্তির ঝুলি কানায় কানায় পূর্ণ করে আজ শেষ মঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছেন, তাঁর এই অন্তিম লগ্ন দেখে খোদ ফুটবল বিধাতাও কি অন্তরালে বসে অশ্রুপাত করছেন না? আর মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা। রেফারি বাঁশিতে ফুঁ দেবেন, আর শুরু হবে মহাকাব্যের সেই পরম বিষাদময় ‘শেষের কবিতা’। তাই ঘড়ির অ্যালার্মটা এখনই দিয়ে রাখতে পারেন– বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোর ৫টা। শেষবারের মতো মেসির আর্জেন্টিনাকে দেখার, শেষবারের মতো চোখ ভেজানোর।

স্মৃতির সরণি বেয়ে যদি দু-দশক পিছিয়ে যাওয়া যায়, তবে মনুমেন্তালের ঘাসে মাখানো এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া গ্রাস করবে। সালটা ছিল ২০০৫, ৯ অক্টোবর। ঠিক এই প্রিয়াঙ্গনেই, এই চেনা ঘরের মাঠের দর্শকদের সামনে আলবিসেলেস্তে জার্সিতে নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচটি খেলতে নেমেছিলেন ১৮ বছরের এক লাজুক কিশোর– লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। হাঙ্গেরির বিপক্ষে সেই অভিশপ্ত অভিষেকের (যেখানে মাঠে নামার মাত্র ১ মিনিটের মাথায় লাল কার্ড দেখতে হয়েছিল) ক্ষত বুকে নিয়ে তরুণ মেসি সেদিন ঘরের মাঠে পেরুর বিপক্ষে নেমেছিলেন সম্পূর্ণ ম্যাচ খেলার এক অদম্য তৃষ্ণা নিয়ে। সেদিন আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে জিতেছিল।

মনুমেন্তালের গ্যালারি সেদিন প্রথম টের পেয়েছিল, এক অপার্থিব জাদুকরের আবাহন শুরু হয়ে গেছে। এই মাঠ তাঁকে কখনও খালি হাতে ফেরাইনি। রেকর্ড বলছে ঘরের এই উঠানে এ পর্যন্ত মেসি যে ২৮ ম্যাচ খেলেছে, তার কোনোটিতেই হারেনি তাঁর দল। ১৯টি গোলের সঙ্গে ১১টি অ্যাসিস্ট তাঁর এই প্রিয় মাঠে। একক কোনো নির্দিষ্ট ভেন্যুতে মেসির করা এটিই সর্বোচ্চ গোলসংখ্যা। প্রতিটি গোল যেন ছিল এই প্রিয়াঙ্গনের দর্শকদের জন্য তাঁর হৃদয়ের অর্ঘ্য। আজ যখন সেই একই আঙিনায় দাঁড়িয়ে বৃত্তটা সম্পূর্ণ হচ্ছে, তখন স্মৃতির সেই প্রথম স্পন্দন আজ এক হিরণ্ময় বিদায়ের করুণ সুরে রূপান্তরিত।

নিউজার্সির সেই হৃদয়ভাঙা ফাইনাল হারের পর, যখন চারদিকের আলো নিভে আসছিল, হোটেল রুমের নিভৃত অন্ধকারে এক টুকরো সাধারণ প্যাডে অবসরের যে নোটটি তিনি লিখেছিলেন– তাতেই তো লুকিয়ে ছিল না বলা সব যন্ত্রণার আরশিনগর। আসলে চল্লিশ ছুঁইছুঁই বয়সে এসে এই যে রাজকীয় প্রস্থান, এর পেছনে লুকিয়ে আছে তার জীবনের দুটো অধ্যায়ের নির্মম অবসান। যার প্রথমটি আর কেউ নন, তাঁর জীবনের পরম ধ্রুবতারা, পরম আশ্রয়– বাবা হোর্হে মেসির মহাপ্রয়াণ। যিনি স্রেফ একজন এজেন্ট বা মেন্টর ছিলেন না, ছিলেন সেই জাদুকরের পিঠে বিশ্বাসের হাত রাখা পরম এক প্রেরণা। বাবার ইচ্ছাতেই তিনি শেষ বিশ্বকাপটি খেলেছিলেন। আর দ্বিতীয় অধ্যায়?

নীল-সাদা ওই মহিমান্বিত আর্জেন্টিনার জার্সির জন্য কিছু একটা বয়ে আনা, দেশকে বিশ্বজয়ের মুকুট পরানো। এই দুটি স্বপ্ন বুকে নিয়েই তো জীবনের চড়াই-উতরাই পার করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে মানুষটা দীর্ঘ দুই দশক ধরে একটা আস্ত দেশকে সূর্যের মতো উত্তাপ দিলেন, মায়াবী আলোয় ভরিয়ে রাখলেন, তাঁকে কি স্রেফ একটা নোটপ্যাডের কয়েকটা কালির আঁচড়ে বিদায় বলে দেওয়া যায়? কক্ষনো না। আর ঠিক সেই কারণেই আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন কোমর বেঁধে নেমেছিল ঘরের মাঠে, চেনা প্রাঙ্গণে শেষ উৎসবের আয়োজন করতে। মেসিও আর না করেননি, তাঁর পরিবারও চেয়েছে সব ক্ষোভ-অভিমান ভুলে চেনা গ্যালারির ওই চেনা মানুষগুলোর ভালোবাসার সাগরে ভাসতে ভাসতে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসুক। প্রিয়াঙ্গন আজ অধীর অপেক্ষায়– তার প্রিয় সন্তানকে সব অর্জনের জন্য দু-হাত ভরে ধন্যবাদ জানিয়ে, আগামীর নতুন জীবনের প্রতি এক বুক ভালোবাসা আর শুভেচ্ছা জানাতে; ‘গ্রাসিয়াস মেসি’। samakal




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD