কর জাল বাড়ানো ও আয়কর রিটার্নের পরিধি বাড়ানো এবং কর ফাঁকি রোধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে সম্ভাব্য করদাতা শনাক্তের পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এজন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), ব্যাংক হিসাব, ভূমি ও ফ্ল্যাট, সড়ক পরিবহন, সঞ্চয়পত্র এবং বিদেশ ভ্রমণের তথ্য এনবিআরের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ডাটাবেজের সঙ্গে করদাতাদের আয়কর নথি মিলিয়ে দেখার বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বিলাসবহুল ও দামি গাড়ির মালিকরা নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দিচ্ছেন কি না এবং তাদের প্রদর্শিত আয় ও সম্পদের সঙ্গে গাড়ির ক্রয়মূল্য সঙ্গতিপূর্ণ কি না, তা যাচাই করা হবে।
গত রোববার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংশ্লিষ্ট সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয়েছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বৈঠক সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন সরকারি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য সমন্বয় করে এআইয়ের মাধ্যমে সম্ভাব্য করদাতা শনাক্ত করা হবে। একই সঙ্গে একজন ব্যক্তির আয়কর রিটার্নে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে তার ব্যাংক হিসাব, জমি-ফ্ল্যাট, গাড়ি, সঞ্চয়পত্র ও বিদেশ ভ্রমণের তথ্য মিলিয়ে দেখা সম্ভব হবে। এতে আয় গোপন করা কিংবা প্রকৃত সম্পদের চেয়ে কম সম্পদ দেখানোর প্রবণতা শনাক্ত করা সহজ হবে।
তিনি আরও জানান, বিলাসবহুল গাড়ির মালিকদের বিষয়ে এনবিআরের উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিআরটিএর ডাটাবেজের সঙ্গে করদাতাদের আয়কর নথি সমন্বয় করে যাচাই করা হবে। কোনো ব্যক্তির নামে দামি গাড়ি থাকলেও তিনি আয়কর রিটার্ন দাখিল করছেন না, অথবা রিটার্নে প্রদর্শিত আয় ও সম্পদের সঙ্গে গাড়ির মূল্য অসঙ্গতিপূর্ণ হলে বিষয়টি কর কর্মকর্তাদের নজরে আসবে।
বৈঠকে রাজস্ব আহরণ, কর-জিডিপি অনুপাত, করের আওতা সম্প্রসারণ, এনবিআরের সাংগঠনিক সক্ষমতা, শুল্ক ও ভ্যাট ব্যবস্থাপনা এবং কর ফাঁকি রোধে তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা হয়।
গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটির রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। ২৫ বছরে এই রাজস্ব আদায় প্রায় ২০ দশমিক ৬ গুণ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরের জন্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা মোট বাজেট ব্যয়ের ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং সরকারের মোট রাজস্বের ৮৬ দশমিক ৯ শতাংশের সমান।
বর্তমানে দেশে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী ব্যক্তি থাকলেও তাদের মধ্যে মাত্র ৪৭ লাখ আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন। ফলে টিআইএনধারী বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে নিয়মিত রিটার্ন দাখিলের আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে করদাতাদের ২ শতাংশেরও কম ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষার আওতায় আসেন। ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে যন্ত্রনির্ভর পদ্ধতিতে ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষার জন্য করদাতা নির্বাচন করা হচ্ছে। এতে কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের সুযোগ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির জাগো নিউজকে বলেন, রাজস্ব আহরণে নেওয়া উদ্যোগের ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। কর ফাঁকি রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তা যেন হয়রানির হাতিয়ার না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে করের ভিত্তি সম্প্রসারণ এবং অটোমেশনের ব্যবহার বাড়াতে হবে।