কে সেরা। মেসি না রোনালদো? বিশ্বব্যাপী ফুটবল দুনিয়ায় এ নিয়ে অনন্ত বিতর্ক। মাঠের রাজা হচ্ছেন লিওনেল মেসি। আর বলা হয়ে থাকে, নাটকের সম্রাট ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। আসলে দু’জনের মধ্যে মহাকাব্যিক যুদ্ধ। ফুটবল দুনিয়ায় এটাই হচ্ছে এক চিরন্তন লড়াই। এই লড়াই মাঠের সবুজ ঘাসেই সীমাবদ্ধ নেই। এখন তা ছড়িয়ে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়, বিলাসবহুল জীবনযাত্রার মধ্যেও। চলতি বিশ্বকাপে এই দুই মহাতারকা আলোচনার কেন্দ্রে। একে অপরকে তারা যেভাবে টেক্কা দিচ্ছেন তা যে কোনো হলিউড থ্রিলারকেও হার মানায়। ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি। অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। এখন পর্যন্ত তিনি এককভাবে সিংহাসনে। অন্যদিকে ৪১ বছর বয়সী পর্তুগিজ যুবরাজ রোনালদো উজবেকিস্তানের বিরুদ্ধে দুটো গোল করে এক অবিশ্বাস্য নজির স্থাপন করেছেন। বিশেষ করে টানা ছটি বিশ্বকাপে গোলের সুবাদে। মেসির জন্ম ১৯৮৭ সনে। বাবা হোর্হে হোরাসিও ছিলেন তার প্রথম কোচ। বলের প্রতি মেসির ছিল অকৃত্রিম ভালোবাসা। তার দাদি সেলিয়া ছাড়া আর কেউ তাকে সমর্থন করতো না। খেলায়ও নিতে চায়তো না অনেকেই। এর বিরুদ্ধে লড়াই করতেন দাদি।
দুর্ভাগ্য হচ্ছে- মেসির কিংবদন্তি হয়ে ওঠা সেলিয়া দেখে যেতে পারেননি। তিনি মারা যান ১৯৯৮ সনে ৬৭ বছর বয়সে। পাঁচ বছর পর অনেকটা নাটকীয়ভাবে বার্সেলোনায় সুযোগ পান মেসি। ২০০৫ সনে আন্ডার টুয়েন্টিতে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হয়। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় , বার্সেলোনার সঙ্গে তার চুক্তি হয়েছিল একটি ন্যাপকিনে। এ কারণেই সম্ভবত বলা হয়ে থাকে—একটি ন্যাপকিন মেসির জীবনকে বদলে দেয়। অন্যদিকে পর্তুগিজ সুপারস্টার রোনালদোর জন্ম ১৯৮৫ সনে। তিনি ছিলেন সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। রোনালদো শেষ, তিনি বুড়ো হয়ে গেছেন। এমনটাই ফুটবল দুনিয়ায় চাউর ছিল। কিন্তু এবার ফুটবল দুনিয়া আবিস্কার করলো পাঁচটি ব্যালন ডি’অর জয়ী অন্য এক রোনালদোকে। ক্যামেরুনের রোজার মিলাও বিশ্বকাপে গোল করে রেকর্ড করেছিলেন। যাইহোক, মেসি এবং রোনালদোর মাঠের বাইরের জীবনযাপনে বিস্ময়কর তফাৎ রয়েছে। রোনালদোর জীবন যেন এক গ্ল্যামারাস সিনেমার মতো। তিনি বরাবরই বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন। কোটি টাকার সুপার কার কালেকশন তার যেন এক নেশা। নিজস্ব ব্র্যান্ড রয়েছে সিআর-৭ এর। এরসবই মিডিয়ায় তার জীবন নিয়ে একটা হটকেক আলোচনা। ৪১ বছর বয়সেও তার শরীরে মেদ নেই। যেমনটা থাকে একজন তরুণ অ্যাথলেটের মধ্যে। মেসি কিন্তু এসবের ঊর্ধ্বে। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের এক চেনা মুখ। শৈশবের প্রেমিকা আন্তোনেলাকে বিয়ে করে তিন সন্তান নিয়ে ভালোই আছেন। মেসিকে দেখা যায় পরিবারের সঙ্গে সমুদ্র সৈকতে। বাচ্চাদের নিয়ে মাঝেমধ্যে ফুটবলও খেলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজত্ব আসলে কার হাতে। এর উত্তর খুঁজতে গেলে রোনালদোকে এগিয়ে রাখতে হবে। সবক’টা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফরমে তিনি এখন বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি, যার রয়েছে এক বিলিয়নেরও বেশি ফলোয়ার। তিনি অহংকারী, সোজাসাপ্টা কথা বলতে পছন্দ করেন। মেসি এদিক থেকে অনেকটাই সংযত। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বরাবরই মৃদুভাষী। বিতর্ক তাকে স্পর্শ করে না।
ফুটবল পণ্ডিতরা বলছেন, ব্যক্তিগত জীবনের সামগ্রিক মূল্যায়নে দু’জনকে আলাদা করা খুব কঠিন। মেসির মধ্যে রয়েছে পেশাদারিত্ব। এ কারণেই হয়তো তাকে গট(GOAT) বলে আখ্যায়িত করেন অনেকেই। মেসির ঝুলিতে রেকর্ডসংখ্যক ট্রফি ও ব্যালন ডি’অর রয়েছে। সমীকরণ যদি সঠিক হয়ে থাকে তাহলে, চলতি বিশ্বকাপে আগামী ১১ জুলাই কানসাস সিটিতে একটি সম্ভাব্য কোয়ার্টার ফাইনালের মুখোমুখি হয়ে যেতে পারেন এই দুই মহাতারকা। এটা অবশ্য নির্ভর করে আর্জেন্টিনা ও পর্তুগাল নিজ নিজ নকআউট ম্যাচগুলো জিততে পারলে। তাহলেই কেবল বিশ্বমঞ্চে এই দুই তারকার শেষ যুদ্ধ দেখার সুযোগ হতে পারে ফুটবল বিশ্বের। মাঠের পারফরম্যান্সে মেসি সত্যিই একজন জাদুকর। আর জীবনের ড্রামায় রোনালদোই সত্যিকার বিনোদন। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জীবন গ্ল্যামারে ভরা। রোনালদো এর মধ্যেই বলেছেন, আমি ফিরে এসেছি। ইঙ্গিতটা কিন্তু মেসির দিকেই। আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে পাঁচটা গোল করে মেসি ফুটবল ইতিহাস বদলে দেন। এরমধ্যে তো একটা হ্যাটট্রিক আছেই।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো তখন পেছনের সারিতে। অবশ্য বেশি সময় নেননি। উজবেকিস্তানের বিরুদ্ধে দুই গোল করে বিশ্বকে বললেন, আমি আবার ফিরে এসেছি। ছয়টি বিশ্বকাপে খেলার রেকর্ডও তিনি লিখলেন অন্যভাবে। মেসি কখনো রোনালদোকে নিয়ে বাজে কোনো মন্তব্য করেননি। অনেকক্ষেত্রে প্রশংসাও করেন। কিন্তু রোনালদো তার বিপরীত।