বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ০৯:৪৩ অপরাহ্ন




কোরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা ঘিরে সংসদে মুখোমুখি এমপিরা

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬ ৭:৩৪ pm
JS Bangladesh National Parliament Jatiya Sangsad Bhaban House জাতীয় সংসদ ভবন পার্লামেন্ট বাজেট পাস
file pic

কোরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা ঘিরে সংসদে উত্তপ্ত বিতর্ক হয়েছে। এতে মুখোমুখি অবস্থান নেন সরকারি ও বিরোধীদলের এমপিরা। প্রথমে কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ বলেন, বিরোধীদলের লোকেরা আমাদের কাছে, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কাছে বাজেটে বরাদ্দ চাইবেন আবার রাজপথে বিক্ষোভও করবেন সেই কারণে আমি আল কোরআনের একটি আয়াত বলতে চাই। তিনি কোরআনের সুরা ইবরাহিমের ৭ নং আয়াত তেলাওয়াত করে অর্থ বলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের (নেয়ামত) বাড়িয়ে দেবো, আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয়ই আমার আজাব বড় কঠিন।’

অর্থ বলে তিনি বলেন, শোকর করতে হবে বাজেটের। শোকর করতে হবে বরাদ্দের। শোকর করতে হবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। বিরোধীদলের লোকেরা শোকর করে না।

এর জবাবে পাবনা-১ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান বলেন, তাদের (সরকারি দলের) প্রশংসা করলে তারা আরো বাড়িয়ে দেবেন আর প্রশংসা না করলে তারা কি আমাদের পেটাবেন? এটা আসলে কোরআনের আয়াতের খুব ভুল ব্যাখ্যা।

এ বিষয়ে কথা বলেছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ ও জামায়াতের সিনিয়র নায়েবে আমির অধ্যাপক মজিবুর রহমান।

জাতীয় সংসদের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ বিরোধীদের আচরণ ও কৌশলের কঠোর সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি আরবি’তে পবিত্র কোরআনের আয়াত স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, আল্লাহ নিজেই সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলী এবং যারা আল্লাহর বান্দাদের বিরুদ্ধে কিংবা অন্যায্য কৌশল খাটায় তাদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়, যারা সরকারের উন্নয়ন ও জনমুখী কর্মকাণ্ডকে স্বীকার না করে রাস্তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে, তাদের কঠিন আজাবের সম্মুখীন হতে হবে।

সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ’র বক্তব্য শেষে সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে জামায়াত সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন অভিযোগ করেন, বাজেট বক্তৃতায় সরকারি দলের সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ কোরআনের আয়াত কোট করে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা আসলে ঠাট্টা-বিদ্রুপের শামিল এবং এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।

তিনি বলেন, উনাদের প্রশংসা করলে উনারা আরও বাড়িয়ে দেবেন আর না করলে পিটাবেন কি না, এমন বোঝানোর মাধ্যমে পবিত্র কুরআনের ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বিগত শাহবাগ আন্দোলনের সময়কার একটি ঘটনার কথা স্মরণ করেন। মোমেন বলেন, সে সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছে কোরআনের অবমাননা নিয়ে একটি চিঠি নিয়ে যাওয়া হলে তিনি সূরা তাওবার একটি আয়াত যোগ করার পরামর্শ দিয়ে সতর্ক করেছিলেন যে, আল্লাহর আয়াত নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করার পরিণাম হবে জাহান্নাম। কোরআনের ভুল ব্যাখ্যা বা অবমাননা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না জানিয়ে এ বিষয়ে তিনি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

জবাবে স্পিকার ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ একজন পুরনো সংসদ সদস্য এবং তিনি কুরআন-হাদিস নিয়ে কোনো ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করতে পারেন বলে মনে হয় না। তবে বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখা হবে এবং যদি কোনো ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে, তবে তা সংসদীয় কার্যবিবরণী থেকে এক্সপঞ্জ বা বাদ দেওয়া হবে। স্পিকার স্মরণ করিয়ে দেন যে, বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ এবং এখানে কুরআন-হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না।

এরপর বিতর্কে অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, তিনি কোনো দীর্ঘ বিতর্কে যেতে চান না, তবে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে কোরআনের ভুল ব্যাখ্যার যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাতে দেশের মানুষের কাছে একটি ভুল বার্তা যাবে।

তিনি স্পষ্ট করে জানান, আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ একজন মাওলানা এবং মাদ্রাসার ছাত্র। তিনি সম্পূর্ণ সৎ উদ্দেশ্যেই বলেছেন যে, আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করলে তিনি তা বাড়িয়ে দেন, আর শুকরিয়া আদায় না করলে আজাব আসতে পারে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এটিকে রাজনৈতিকভাবে ভুল ব্যাখ্যা করা বা এটা নিয়ে পয়েন্ট অব অর্ডার তোলা মোটেও ঠিক হয়নি। ৯২ ভাগ মুসলমানের এই দেশে কোনো সংসদ সদস্য যদি ভুলক্রমেও ইসলামের অবমাননা করেন, তবে সরকার তার নিন্দা করবে। কিন্তু বিষয়টিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সমীচীন নয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর স্পিকার আবারও পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে বলেন, সংসদে অধিকাংশ সদস্যই মুসলমান এবং দেশের ৯২ ভাগ মানুষও এই ধর্মের অনুসারী। তাই সংসদকে বিরূপ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু না বানিয়ে প্রবীণ নেতাদের উপস্থিতিতে জুনিয়র সদস্যদের শান্ত থাকার অনুরোধ জানান তিনি।

তবে স্পিকারের এই অনুরোধের মধ্যেই বিরোধী দলের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই আয়াতের নাজিল হওয়ার প্রেক্ষাপটকে আড়াল করে বিষয়টিকে সম্পূর্ণ দলীয় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। মুজিবুর রহমান ব্যাখ্যা দেন যে, আল্লাহ তাআলা এই দুনিয়ায় অগণিত নেয়ামত রেখেছেন যা গণনা করে শেষ করা যাবে না এবং মানুষের উচিত এই শক্তি দিয়ে আল্লাহর বিধিনিষেধের পক্ষে কথা বলা। তিনি অভিযোগ করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতা খুব ভালো হয়েছে দাবি করে বোঝাতে চেয়েছেন যে, বিরোধী দল যদি এই বাজেটের প্রশংসা না করে তবে তাদের ওপর আল্লাহর আজাব আসবে। এই ধরনের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা মোটেও সঠিক নয় দাবি করে মুজিবুর রহমান প্রয়োজনে কোনো আলেম বা বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে বিষয়টি পরীক্ষা করার জন্য স্পিকারের কাছে জোরালো দাবি জানান।

পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করলে স্পিকার অন্য সদস্যদের শান্ত হতে বলেন এবং জানান যে ট্রেজারি বেঞ্চেও অনেক মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত আলেম রয়েছেন। নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি না করার শর্তে তিনি সরকারি দলের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতনকে কথা বলার সুযোগ দেন। কামরুজ্জামান রতন স্পিকারের কাছে ওয়াদা করে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম বলে তার বক্তব্য শুরু করেন। তিনি বলেন, পবিত্র কোরআনের আয়াতের মধ্যেই রয়েছে যে আমরা শুনলাম এবং তা পালন করলাম। তিনি আলেম-ওলামাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আহ্বান জানান, যা সহিহ বা সঠিক, আমরা যেন সবাই সেটির ওপর আমল করি এবং এই আমলের মধ্য দিয়েই যেন সবার পরিশুদ্ধতা আসে।

সবশেষে চলমান এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে সংসদে বক্তব্য রাখেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি । তিনি স্পিকারের মাধ্যমে সকল সংসদ সদস্যের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, যখন সংসদের সিনিয়র লিডাররা কথা বলবেন, তখন অন্য সদস্যদের স্বাভাবিকভাবেই আসন গ্রহণ করা উচিত।

তিনি বলেন, আমরা সবাই যেহেতু আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি গভীরভাবে বিশ্বাসী এবং অভিযুক্ত সদস্য মাহফুজুল্লাহ সাহেব নিজে একজন আলেম, তাই তিনি কোনো ব্যঙ্গাত্মক বা পরিহাসের উদ্দেশ্যে এই কথা বলেননি। বরং সকলের আমলকে আরও সহিহ এবং শক্তিশালী করার জন্য অত্যন্ত হৃদয় খুলে তিনি কথাটি বলেছেন।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD