প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট অবৈজ্ঞানিক, অরাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক। নির্বাচনের বছরে এ বাজেট হওয়া উচিত নয়, এমন মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
রবিবার (১৮ জুন) রাজধানীর একটি হোটেলে বাজেট সংলাপে এসব কথা বলেন তিনি। সেমিনারে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সংস্থাটির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন- পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।
সংলাপে অতিথি ছিলেন- পিআরআই এর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম, ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, শ্রমিক নেত্রী ও আলোকচিত্রী তাসলিমা আখতার, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সামি সাত্তারসহ অনেকে।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের সাথে এ বাজেট সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এটার সংস্কার করা দরকার। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলম বলেন, বড় বাজেটের জন্য রাজস্ব আহরণে সরকার বেপরোয়া টার্গেট নিয়েছে। বিদ্যুৎখাতে অযৌক্তিক ব্যয়ের কারণেই এ সংকট তৈরি হয়েছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিআরআই এর নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, গত ৫০ বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকার যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছে, তা গত অর্থবছরের চেয়ে বেশি। তিনি বলেন, বাজেট প্রণয়নে জনগণের কথা চিন্তা করা হয় না। জবাবদিহিতা এবং সুশাসন নিশ্চিত না করায় বাজেট কোনো কাজে আসছে না বলে মন্তব্য করেন আলোচকরা।
আমির খসরু বলেন, গত ৩০ বছর সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছিল। ব্যষ্টিক অর্থনীতিও ভালো অবস্থায় ছিল। ডলার বিনিময় হার কৃত্রিমভাবে ধরে রাখার কারণে স্থিতিশীলতা ধরে রাখা যাবে না। ৭০-৭৫ হাজার কোটি টাকা ছাপানো হয়েছে। যা মূল্যস্ফিতিকে বৃদ্ধি করছে। রিজার্ভ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) টাকা দেওয়া হয়েছে, যা পাচার হয়েছে।
তিনি বলেন, রিজার্ভের অর্থ অপব্যবহার করা হয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তার কাজ করতে পারছে? লোনের টাকা পাচার হচ্ছে, স্টক মার্কেট লুট করছে, তা আর ফেরত আসছে না। ব্যাংকিং সেক্টরের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংক খবরদারী করতে পারছে না। ভোট চুরি করে ক্ষমতা দখল করলে জনগণের জবাবদিহিতার সুযোগ থাকে না। নির্বাচনী বাজেট বলে এখন আর কিছু আছে? বরং একটি প্রকল্প আছে, সেটা হলো -ভোট চুরির প্রকল্প আছে। বাংলাদেশে ভোট চুরির প্রকল্প চলমান রয়েছে।
বিগত দিনে ১০০ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে উল্লেখ কর আমির খসরু আরও বলেন, যারা পাচার করছেন, তাদের প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। আমেরিকা থেকে রেমিট্যান্স বেড়ে গেছে। পাচারকৃত টাকায় কর দেওয়ার পরিবর্তে প্রণোদনা নিচ্ছেন। বর্তমানে মোট করের ৩২ শতাংশ হচ্ছে ভ্যাট। কিন্তু যখন আমরা প্রবর্তন করেছিলাম, তখন আওয়ামী লীগ হরতাল ডেকেছিল। আমাদের সময় প্রাইভেট সেক্টর সাপোর্ট দিয়েছিলাম। বর্তমানে আমরা কঠিন সময়ের মধ্যে পড়ে গেছি।
সেমিনারে সিপিডি বলেছে, প্রস্তাবিত বাজেট সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে অত্যধিক মুদ্রাস্ফীতি। চলমান সংকট মোকাবিলায় বাজেট ব্যবস্থায় প্রতিফলন হয়নি। প্রস্তাবিত বাজেট চলমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সংকট সমাধানে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচনী বছরে কোনো ভাবেই এমন বাজেট হতে পারে না। এটা অবৈজ্ঞানিক ও অবাস্তবায়িত বাজেট। এটা অবশ্যই সংশোধন করা প্রয়োজন।
প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নে ১৩ ধরনের চাপ মোকাবিলা করতে হবে বলে মনে করছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)।
চাপগুলো হচ্ছে- সামষ্টিক অর্থনীতির লক্ষ্য বাস্তবসম্মত না হওয়া, রাজস্ব আদায়ের কঠিন লক্ষ্যপূরণ, ব্যাংকিংখাত থেকে অতি ঋণ করা, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট, মুদ্রা বিনিময় হার, সরকারি ব্যয় কম হওয়া, রফতানি আয়ের কম প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রির্জাভ কমে যাওয়া, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমে যাওয়া, খেলাপি ঋণ, কম রেমিট্যান্স প্রবাহ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সংকট এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘সরকার যে বাজেট প্রস্তাবনা দিয়েছে তাতে লক্ষ্যমাত্রা গুলো উচ্চাভিলাষী। এই লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে রয়েছে সন্দেহ। আগামী অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধিও যে লক্ষ্য ৭.৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে রাখা সম্ভব হবে না। এছাড়া রফতানি প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব আদায় এবং বেসরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব লক্ষ্য বাস্তব সম্মত হয়নি।’
বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংকিং খাত থেকে অধিক ঋণ গ্রহণের লক্ষ্য বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রাপ্তিতে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। সেই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ সংকট কাটানোর কোনো উদ্যোগের কথা বলা নেই বাজেটে। উন্নয়ন ক্ষেত্রে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের অবস্থা বেশি ভালো নয়। বাজেটে বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়নি বলেও জানান ফাহমিদা খাতুন।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘বর্তমান সংকটময় সময়ে চ্যালেঞ্জগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করা না গেলে আগামীতে অর্থনীতিতে সমস্যার সৃষ্টি হবে। বাস্তবতা বিবেচনা করেই সব কিছু চিন্তা করা উচিত। বর্তমানে মূল্যস্ফীতির ব্যাপক চাপ রয়েছে। সেদিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া দরকার। সরকার ব্যাংক থেকে ধার করছে, এতে ব্যক্তি ঋণ কমে যাবে। বিনিয়োগ রক্ষণশীল রেখে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির চাপ সহ্য করা কঠিন হবে।’
ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যপূরণ সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। দেশের আর্থিক খাতে আস্থার সংকট রয়েছে। এটি ব্যাংকিং এবং শেয়ারবাজার উভয় ক্ষেত্রেই রয়েছে। সরকারে অভ্যন্তরীণ ঋণ গত ৫০ বছরের যেভাবে বাড়েনি গত এক বছরে তার চেয়ে বেশি বেড়েছে। আগামী অর্থবছরে টাকা ছাপিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের ঋণ যোগান দেওয়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু সেটি ঠিক হবে না। তবে রিজার্ভ সংকট কাটাতে পাইপলাইনে জমে থাকা ঋণের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার খরচ বাড়ানো যেতে পারে।’
অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘বিদ্যুতের অবস্থা খুবই খারাপ। ঢাকা শহরে কিছুটা অবস্থা ভালো হলেও গ্রামের অবস্থা খুবই খারাপ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বাজেটে এ সমস্যা সমাধানে খুব বেশি জোর দেওয়া হয়নি। বড় বাজেট দিয়ে বেপরোয়া কর আরোপ করা হচ্ছে। এতে সরকার খুশি হলেও আমরা আতংকিত।’