ঋণ কর্মসূচির আওতায় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কাঠামোগত সংস্কার করেছে বাংলাদেশ। এর পরও অর্থনীতিতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। কর্মসূচির দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ছাড়ের আগে প্রথম রিভিউ মিশন শেষে আইএমএফের এশীয় ও প্যাসিফিক বিভাগের প্রধান রাহুল আনন্দ গতকাল এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানান।
দ্বিতীয় কিস্তিতে বাংলাদেশের জন্য সব মিলিয়ে ৬৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ছাড় করার কথা রয়েছে আইএমএফের। ছাড়করণের আগে শর্ত বাস্তবায়ন ও সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে আইএমএফের রিভিউ মিশনের কর্মকর্তারা ঢাকায় আসেন ৩ অক্টোবর। এর পরদিন থেকে গতকাল পর্যন্ত এ নিয়ে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন তারা। এ সময় তারা অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার, অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ অর্থ মন্ত্রণালয়, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
মিশন শেষে গতকাল আইএমএফের পক্ষ থেকে দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়, ঋণ কর্মসূচির প্রথম পর্যালোচনা সম্পন্নের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগুলোর বিষয়ে আইএমএফের কর্মকর্তারা ও বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ মতৈক্যে পৌঁছেছে। সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ফলপ্রসূ নীতিপদক্ষেপ গ্রহণে বাংলাদেশের অঙ্গীকারাবদ্ধতাকে স্বাগত জানিয়েছে আইএমএফ।
সংস্থাটির পর্যালোচনায় আরো বলা হয়, বাংলাদেশে স্বল্পমেয়াদে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের জন্য আরো কঠোর মুদ্রানীতি, নিরপেক্ষ আর্থিক নীতি ও বিনিময় হারে আরো বেশি নমনীয়তা প্রয়োজন। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দান, অর্থনৈতিক সংস্কারের গতিবৃদ্ধি ও জলবায়ু এজেন্ডা বাস্তবায়নে বাংলাদেশের উদ্যোগকে আইএমএফের কর্মসূচি অব্যাহতভাবে সহায়তা করবে।
রাহুল আনন্দের নেতৃত্বে আইএমএফ মিশনের অন্যান্য সদস্যের মধ্যে ছিলেন সংস্থাটির বাংলাদেশ ও ভুটানে নিযুক্ত আবাসিক প্রতিনিধি জয়েন্দু দে, ডিভিশন চিফ ক্রিস পাপাইওরগিও, ডেপুটি ডিভিশন চিফ পিয়াপর্ন নিক্কি সোদশ্রিবিবুন, সিনিয়র ইকোনমিস্ট এস্টেল জু লিউ, সিওক হিউন ইউন ও সুফাচল সুফাচালশাই এবং ইকোনমিস্ট রিচার্ড ভার্গিস।
বিবৃতিতে রাহুল আনন্দ বলেন, ‘বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ও আইএমএফের কর্মকর্তারা ২০২৩ সালের আর্টিকেল ৪ কনসালটেশনের বিষয়ে আলোচনা সম্পন্ন করেছেন। একই সঙ্গে বর্ধিত ঋণ সহায়তা বা বর্ধিত তহবিল (ইসিএফ অ্যান্ড ইএফএফ) ও রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটির (আরএসএফ) আওতায় প্রথম পর্যালোচনা শেষ করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নীতিগুলোর বিষয়েও মতৈক্য হয়েছে। এ বিষয়ে আইএমএফের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও পর্ষদের অনুমোদনের প্রয়োজন, যা আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে আশা করা যায়। প্রথম পর্যালোচনা শেষে ইসিএফ বা ইএফএফের আওতায় ৪৬ কোটি ২০ লাখ ডলার (৩৫ কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার এসডিআর) এবং আরএসএফের আওতায় ২১ কোটি ৯০ লাখ ডলার (১৬ কোটি ৬৬ লাখ ৭০ হাজার এসডিআর) ছাড় হতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির আওতায় কাঠামোগত সংস্কারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ উল্লেখযোগ্য সংস্কার করেছে। কিন্তু এখনো চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বিদ্যমান ঝুঁকি এবং বিশ্বব্যাপী আর্থিক খাতে ক্রমাগত সুদহার বৃদ্ধির সম্মিলিত প্রভাবে সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে। এর ফলে চাপে পড়েছে স্থানীয় মুদ্রা টাকার বিনিময় হার ও বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ। এ অবস্থায় স্বল্পমেয়াদি নীতি অগ্রাধিকারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, নাজুক জনগোষ্ঠীর ওপর এসব অর্থনৈতিক দুর্বিপাকের প্রভাবকে সহনীয় করা ও বহিস্থ প্রভাবকের অভিঘাত মোকাবেলায় সহনশীলতা তৈরিতে জোর দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গত ৪ অক্টোবর গৃহীত নীতি সুদহার ৭৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাচ্ছি। পরবর্তী সময়ে ক্রমান্বয়ে কঠোর আর্থিক ও মুদ্রানীতি গ্রহণ এবং বিনিময় হারকে আরো বেশি নমনীয় করা হলে তা সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করবে।’
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সূচকের বিষয়ে রাহুল আনন্দ বলেন, ‘চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ এবং অর্থবছর শেষে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ২৫ শতাংশে থাকবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। স্বল্পমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়বে এবং মধ্যমেয়াদে চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতায় পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যা-ই হোক, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখনো অনেক বেশি অনিশ্চিত এবং ঝুঁকিগুলোও নেতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। সামাজিক খাতে ব্যয় ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাড়তি সুযোগ তৈরির জন্য রাজস্ব বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাতকে টেকসইভাবে বাড়াতে হলে সমন্বিত কর নীতি ও প্রশাসনিক উদ্যোগ প্রয়োজন। ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ, ব্যয় দক্ষতা উন্নত করা এবং আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সামাজিক সুরক্ষা ও প্রবৃদ্ধি সহায়ক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাড়তি অর্থ ব্যয়ের সুযোগ তৈরি করবে।’
বিবৃতিতে বহিস্থ চাপ সহনশীলতা জোরদার করতে মুদ্রানীতি ও বিনিময় হার নীতিকাঠামোর আধুনিকীকরণ ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে এতে সুদহারে করিডোর পদ্ধতি ও সমন্বিত একক বিনিময় হার প্রবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির ভাষ্যমতে, এর ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ ব্যাংককে পুরোপুরি কার্যকর সুদের হার ও ক্রমান্বয়ে নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থার দিকে যেতে হবে। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থায়ন চাহিদা মেটাতে ব্যাংক খাতের দুর্বলতাগুলো মোকাবেলা করা গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমানো, নজরদারি বাড়ানো, সুশাসন সংহত এবং নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর উন্নতির মাধ্যমে আর্থিক খাতের দক্ষতা বাড়বে। এছাড়া পুঁজিবাজারের উন্নয়ন দেশের প্রবৃদ্ধি সহায়ক অর্থায়নকে আরো সহজলভ্য করে তুলবে।
বাংলাদেশকে ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছানোর লক্ষ্য অর্জনে যেসব কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন, সেগুলোর ওপর জোর দেয়ার বিষয়েও বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে জোরদার করতে বাণিজ্য বাড়ানো, আরো বেশি প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ ও পরিবেশ উন্নত করা এবং নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের উচ্চঝুঁকির পরিপ্রেক্ষিতে জলবায়ু-প্রতিক্রিয়াশীল পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট এবং গ্রিন পাবলিক ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট সংস্কারের মাধ্যমে স্থিতিস্থাপক অবকাঠামো বিনিয়োগ বাড়ানোও জরুরি। জলবায়ু-সম্পর্কিত ঝুঁকির উন্নত ব্যবস্থাপনা আর্থিক খাতের স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু অর্থায়নে বেসরকারি অংশগ্রহণকে আরো গতিশীল করতে সাহায্য করবে।
এদিকে আইএমএফের মিশন শেষে এ বিষয়ে গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিফিং করা হয়। এতে বলা হয়েছে, আইএমএফের ঋণের দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ছাড়ের বিষয়ে কর্মকর্তা পর্যায়ের বৈঠকে মতৈক্য হয়েছে। এখন আইএমএফ পর্ষদের অনুমোদন পেলে দ্বিতীয় কিস্তির ৬৮ কোটি ১০ লাখ ডলার পাওয়া যাবে। আগামী ১১ ডিসেম্বর আইএমএফের পর্ষদ সভা রয়েছে। সেদিন অর্থ ছাড়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আশাবাদী।
গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সঙ্গে গতকাল সকালে আইএমএফ প্রতিনিধি দলের সমাপনী বৈঠক হয়। ওই বৈঠক শেষে দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, ‘আইএমএফের পক্ষ থেকে যেসব শর্ত দেয়া হয়েছিল, তার মধ্যে ছয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্পর্কিত। এসব শর্তের মধ্যে কেবল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছাড়া অন্য সবক’টি পরিপালন করা হয়েছে। এরই মধ্যে ব্যাংক ঋণের সুদহার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। রিজার্ভ হিসাবায়নের ক্ষেত্রে বিপিএম৬ অনুসরণ করা হচ্ছে। আইএমএফের পক্ষ থেকে ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টে “স্ট্রেসড অ্যাসেটের” (দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ) পরিসংখ্যান প্রকাশ করতে বলা হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে সেটি প্রকাশ করেছে। ডলারের বিনিময় হারও এক প্রকার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংক মুখপাত্র বলেন, ‘আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী রিজার্ভ সংরক্ষণ করা যায়নি। সরকারের রাজস্ব আদায়ের শর্তও পূরণ হয়নি। আমরা এর ব্যাখ্যা দিয়েছি। অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক যেসব কারণে শর্ত দুটি পূরণ করা যায়নি, সেগুলো আইএমএফের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। শর্ত পূরণে এরই মধ্যে কী কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে সেগুলো জানানো হয়েছে। এতে তারা আশ্বস্ত হয়েছেন। আর্থিক খাত সংস্কারের পদক্ষেপগুলোও আমরা তাদের সামনে তুলে ধরেছি। আমাদের অর্জন ও উদ্যোগগুলোকে আইএমএফ প্রতিনিধি দল স্বাগত জানিয়েছে। আগামীতে সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’
বাংলাদেশের জন্য চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফের নির্বাহী বোর্ডের সভায় ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। সাত কিস্তিতে ৪২ মাসে এ ঋণ পাওয়া যাবে। ঋণের গড় সুদের হার ২ দশমিক ২ শতাংশ। ৪৭০ কোটি ডলারের মধ্যে দুই ধরনের ঋণ রয়েছে। বর্ধিত ঋণ সহায়তা বা বর্ধিত তহবিল (ইসিএফ অ্যান্ড ইএফএফ) থেকে পাওয়া যাবে ৩৩০ কোটি ডলার। রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটির (আরএসএফ) আওতায় মিলবে ১৪০ কোটি ডলার। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে আইএমএফের কাছ থেকে ঋণের প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার বুঝে পেয়েছে বাংলাদেশ। ২০২৬ সাল পর্যন্ত এ ঋণ কর্মসূচি চলাকালীন বাংলাদেশকে বিভিন্ন ধরনের শর্ত পরিপালন ও সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে।