বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আওয়ামী লীগ আমলের ১৫ বছরের বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা নীতিকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) জিএস এস এম ফরহাদ। মঙ্গলবার ডাকসু সংগ্রহশালা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সাংবাদিকদের কাছে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ডাকসু সংগ্রহশালায় ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর বাংলা ভাষাবিরোধী বক্তব্যের ছবি ও উদ্ধৃতি প্রদর্শন নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কের সূত্রপাত হয়। এ বিষয়ে প্রশাসনের দেওয়া বিবৃতির কঠোর সমালোচনা করে এস এম ফরহাদ বলেন, গত ৫০ বছরের ইতিহাসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে ‘কঠোরভাবে প্রতিহত করবে’—এ ধরনের ভাষায় বিবৃতি দিয়েছে বলে তিনি দেখেননি। প্রশাসন যেন কোনো একটি দলের দলীয় পোস্ট কপি করে তাদের পেজে দিয়ে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘ডাকসু সংগ্রহশালায় একটি ছবি এবং ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটকে উল্লেখ করতে গিয়ে জিন্নাহর সে সময়ের যে বক্তব্য—উর্দুর পক্ষে এবং বাংলা ভাষার বিপক্ষে, সে বক্তব্যকে আমরা কোট করেছিলাম। কোট করে ছবি দিয়েছিলাম। আজকে ভিসি স্যার বলছেন, আজকে প্রো-ভিসি স্যার বলছেন, সে অপরাধের কারণে নাকি তারা আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন।’
জিন্নাহর বাংলা ভাষাবিরোধী বক্তব্য বিভিন্ন পাঠ্যবইয়ে রয়েছে উল্লেখ করে জিএস ফরহাদ বলেন, জিন্নাহর এ বক্তব্য চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও অষ্টম শ্রেণির বাংলা এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে উল্লেখ রয়েছে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘তাহলে আপনি একটা বিবৃতি দেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে যে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে প্রতিহত করা হবে। অথবা আপনি একটা ব্যবস্থা নেন, যে শিক্ষকরা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইটা লেখার পেছনে শ্রম দিয়েছিলেন, তাদের চাকরিচ্যুত করেন।’
উপাচার্যের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ডাকসু সংগ্রহশালা উদ্বোধনের আগে উপাচার্য দুইবার সেখানে পরিদর্শন করেছেন এবং কাজের অগ্রগতি দেখেছেন। ডাকসুর সভাপতি হিসেবে তিনি চাইলে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে পারতেন, কিন্তু তা না করে একটি দলের কথার প্রেক্ষিতে দলীয় বিবৃতি হুবহু কপি করে পেজে দিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বর্তমান অবস্থানকে অতীতের বিভিন্ন সরকারের আমলের সঙ্গে তুলনা করে এস এম ফরহাদ বলেন, গত ৫০ বছরের ইতিহাসে বা আর্মি ও বিএনপির আমল কিংবা আওয়ামী আমলের ১৫ বছরেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ‘কঠোরভাবে প্রতিহত করবে’—এমন ভাষায় তাৎক্ষণিক বিবৃতি দেয়নি। বর্তমান প্রশাসন সেই নীতিকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়।
এ সময় তিনি ডাকসু সংগ্রহশালায় হামলা ও সম্পদ ভাঙচুরের অভিযোগ তুলে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় ভাঙচুরের ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন ও দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল)। পাশাপাশি সংগ্রহশালার নিরাপত্তা জোরদার, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী-শিক্ষক ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং ‘মব কালচার’ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
মঙ্গলবার বিকেলে ইউটিএল কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চ্যাপ্টারের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হকের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ডাকসুর ক্ষতিগ্রস্ত সংগ্রহশালা পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শনকালে ইউটিএল নেতারা বলেন, ডাকসু দেশের ছাত্র আন্দোলন, গণতান্ত্রিক চর্চা ও জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। এর সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাধিকার, গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও জাতীয় ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে রয়েছে। ফলে ডাকসু সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত ঐতিহাসিক ছবি, দলিল ও স্মারকের ক্ষতিসাধন অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়।
অধ্যাপক ড. যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক বলেন, ডাকসু সংগ্রহশালার আধুনিকায়নের উদ্যোগের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ডাকসুর সভাপতি ও নেতৃবৃন্দকে ধন্যবাদ জানাই। তবে ঐতিহাসিক এই সংগ্রহশালায় কোনো ধরনের ভাঙচুর, ক্ষতিসাধন বা অবমাননা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের মাধ্যমে তারা জানতে পেরেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০১ সালে ভর্তি হওয়া এক শিক্ষার্থী ডাকসু সংগ্রহশালায় প্রবেশ করে সেখানে সংরক্ষিত কিছু ছবি ও স্মারক ভাঙচুর করেছেন। বিষয়টি তারা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছেন।
মতপার্থক্য গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো অবস্থাতেই ভাঙচুর, দখলদারিত্ব, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলতে পারে না। সম্প্রতি ক্যাম্পাসে আইন ও নিয়মের পরিবর্তে এক ধরনের ‘মব কালচার’ দেখা যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চা, যুক্তি, সহনশীলতা ও মুক্ত বিতর্কের জায়গা। সেখানে এ ধরনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলে শিক্ষার পরিবেশের পাশাপাশি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ে।
এ সময় ডাকসু সংগ্রহশালার ভাঙচুরের ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন ও দায়ীদের বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায় ইউটিএল। একই সঙ্গে সংগ্রহশালার নিরাপত্তা জোরদার এবং সেখানে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক ছবি, দলিল, স্মারক ও অন্যান্য নিদর্শনের যথাযথ সংরক্ষণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কর্মরত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ারও দাবি জানায় সংগঠনটি। পাশাপাশি ক্যাম্পাসে সংঘটিত সহিংসতা ও হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দৃশ্যমান ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ চাওয়া হয়। এ সময় শাহবাগ থানার সামনে শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগের বিষয়েও কার্যকর তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও তুলে ধরেন ইউটিএল নেতারা।
অধ্যাপক যুবাইর বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ঐতিহাসিক ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে আইনের শাসন, একাডেমিক স্বাধীনতা, পারস্পরিক সম্মান ও সহনশীলতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। কোনো অভিযোগ বা অপরাধের বিচার ভাঙচুর কিংবা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নয়, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় হতে হবে।
পাশাপাশি ডাকসুর ঐতিহাসিক মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করতে নিয়মিত ও গ্রহণযোগ্য ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকারের কার্যকর উদ্যোগ কামনা করেন ইউটিএল নেতারা।
তারা বলেন, ডাকসু বাংলাদেশের ছাত্রসমাজের দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান। এর ঐতিহ্য ও মর্যাদা রক্ষা শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নয়, এটি জাতীয় দায়িত্বও। নিয়মিত ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব ও গণতান্ত্রিক চর্চা আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
এ সময় ইউটিএল কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি অধ্যাপক ড. মুনিরা আহসান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ দিদারে আলম মুহসিন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. আবু সায়েম, সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন, দপ্তর সম্পাদক মুহাম্মদ ওমর ফারুক এবং অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ জহিরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।