শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ০৩:৩৩ অপরাহ্ন




দোষীদের বিরুদ্ধে মামলা হবে কি?

সরকারের দেয়া ২০ কোটি টাকা হাপিস!

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৩ জুন, ২০২৫ ১১:১৭ am
Kazi Salahuddin Bangladesh Football Federation BFF বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন বিএফএফ বাফুফে কাজী সালাউদ্দিন
file pic

সরকারের দেওয়া ২০ কোটি টাকা হাপিস করে দিয়েছেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন। লংকা-বাংলা ফাইন্যান্সে স্থায়ী আমানত হিসাবে রাখা হলেও বছর না ঘুরতে সেই অর্থ তুলে নিয়েছিলেন সালাউদ্দিন গংরা।

দেশের ফুটবল উন্নয়নে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটে বাফুফেকে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সহকারী সচিব সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এই বরাদ্দের কথা বলা হয়। ওই চিঠিতে (স্মারক নং-০৭.১২৩.০২০.০৩.৩৬.০১৬.২০২৩.৮১) বলা হয়েছিল, ‘ফুটবল খেলার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে তহবিল গঠনের জন্য বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের অনুকূলে ২০১৯-২০ অর্থবছরে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিবালয়ের ক্রীড়া সংস্থার মঞ্জুরির আওতায় অন্যান্য অনুদান খাতে এককালীন সরকারি অনুদান হিসাবে ২০ কোটি টাকা দেওয়া হলো। কেবল ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাফুফে কর্তৃক কোনো সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নয়, বরং এই তহবিলের অর্থ বিনিয়োগ করা হলে তা থেকে অর্জিত মুনাফা ফুটবলের নানাবিধ উন্নয়নের জন্য ব্যয় করতে হবে।’

অথচ অর্থ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ দেওয়া ২০ কোটি টাকার পুরোটাই হাপিস করে ফেলেছিল বাফুফে। এই অর্থের কোনো তথ্য ছিল না বাফুফের অডিট রিপোর্টেও। ২০২০ সালে সরকারের দেওয়া বাজেট বরাদ্দের প্রথম কিস্তির ১০ কোটি টাকা খরচ না করেই যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে হিসাব বিবরণী জমা দিয়েছিল বাফুফে। প্রথম কিস্তিতে ১০ কোটি টাকা যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় হয়ে বাফুফের তহবিলে জমা হয়েছিল। ১০ কোটি টাকার মধ্যে ৬৪ জেলার বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ জেলা ফুটবল লিগ আয়োজনের জন্য পাঁচ কোটি ৭৬ লাখ, প্রিমিয়ার লিগের ১৩টি ক্লাবের জন্য ৬৫ লাখ, বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগের জন্য ৫৫ লাখ, প্রথম বিভাগ ফুটবলে ৩৯ লাখ, দ্বিতীয় বিভাগে ২৬ লাখ এবং তৃতীয় বিভাগের জন্য সাড়ে ২৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছিল। এছাড়া বাফুফে ফুটবল একাডেমির জন্য ৩০ লাখ, জাতীয় দলের জন্য ৫৫ লাখ, মহিলা ফুটবল দলের জন্য ১০ লাখ এবং শেরেবাংলা জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য এক কোটি ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। এ বিবরণীতে স্বাক্ষর করেছিলেন বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন, সিনিয়র সহসভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে নিষিদ্ধ সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু নাইম সোহাগ। বাফুফে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ের যে হিসাব বিবরণী জমা দিয়েছে তার পুরোটাই শুভংকরের ফাঁকি। জেলা ফুটবল লিগের ব্যয় তিন কোটি ৫৫ লাখ, প্রিমিয়ার ফুটবল লিগে ৬৮ লাখ, চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে ৪৫ লাখ, প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগে ৪২ লাখ, দ্বিতীয় বিভাগে ২৬ লাখ, তৃতীয় বিভাগে ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে বলে বিবরণীতে বলা হয়েছিল। এছাড়া বঙ্গবন্ধু জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য ৬৪ লাখ, জাতীয় ফুটবল দলের পেছনে দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা, একাডেমির জন্য ২০ লাখ এবং মহিলা ফুটবলের পেছনে ৭৬ লাখ টাকা খরচ দেখিয়েছিল বাফুফে।

সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য হলো, সরকারের রাজস্ব বিভাগে আয়কর বাবদ ৫০ লাখ টাকা জমা দেওয়ার তথ্য হিসাব বিবরণীতে রয়েছে। অথচ ট্যাক্স বাবদ একটি টাকাও জমা দেয়নি বাফুফে। ১০ কোটি টাকা খরচ না করেই ভুয়া হিসাব বিবরণী ক্রীড়া পরিষদে জমা দিয়েছিল বাফুফে। সেই সঙ্গে বাজেটে বরাদ্দ বাকি ১০ কোটি টাকা চেয়ে চিঠি দিয়েছিল ফুটবল সংস্থাটি। বাফুফের চিঠি পেয়ে নড়েচড়ে বসেছিল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। সরকারের বাজেটের অর্থ এক খাত থেকে অন্য খাতে খরচের সুযোগ নেই। শুধু তাই নয়, খরচের বিল ভাউচারের পাকা রসিদ জমা না দেওয়া পর্যন্ত বাকি অর্থ ছাড় করা যাবে না। ক্রীড়া পরিষদ এ সিদ্ধান্তের কথা বাফুফেকে সাফ জানিয়ে দিয়েছিল। তারপরও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে অর্থ মন্ত্রণালয় দ্বিতীয় কিস্তির ১০ কোটি টাকাও ছাড় করেছিল। তখন বাফুফে ক্রীড়া পরিষদের কাছে মুচলেকা দিয়েছিল যে, দ্বিতীয় কিস্তির ১০ কোটি টাকা স্থায়ী আমানত হিসাবে রাখা হবে। ওই স্থায়ী আমানত থেকে পাওয়া লভ্যাংশ ফুটবলের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। কিন্তু ঘটেছিল ঠিক উলটো ঘটনা। ২০২০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর লংকা-বাংলা ফাইন্যান্সে ১০ কোটি টাকার মধ্যে এক বছর মেয়াদি ৯ কোটি টাকা স্থায়ী আমানত রাখা হয়েছিল। বাকি এক কোটি টাকা খরচ দেখায় বাফুফে। বছর ঘুরতেই (৭ সেপ্টেম্বর ২০২১) স্থায়ী আমানত ভেঙে ফেলেছিল বাফুফে। শুধু তাই নয়, নয় কোটি টাকার আমানতের বিপরীতে কয়েক দফা ঋণ নিয়েছিল বাফুফে। ফলে মেয়াদ শেষে লভ্যাংশ দূরে থাক, মূল টাকা পাওয়াই দায় হয়ে পড়েছিল বাফুফের। প্রায় চার বছর আগে সরকারি বরাদ্দের ওই টাকা হাপিস করে ফেললেও বিষয়টি কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে থেকে যায়। অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর এই অনিয়ম উঠে এসেছিল। বিষয়টি শুনেই আঁতকে ওঠেন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের বর্তমান সচিব আমিনুল ইসলাম। তার কথা, ‘অর্থ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ করা ২০ কোটি টাকা যে শর্তে দেওয়া হয়েছিল, তার ব্যত্যয় কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমরা বাফুফের কাছে কৈফিয়ত চাইব। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বাফুফের এ ধরনের কর্মকাণ্ড এটাই প্রথম নয়। ফুটবল একাডেমি করার জন্য সিলেটে বিকেএসপি পেয়েছিল বাফুফে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ প্রায় দুই কোটি টাকা খরচ করে একাডেমির জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছু কিনে দিয়েছিল। ফিফাও অনুদান দিয়েছিল সাত লাখ ডলার। কিন্তু সেই সাত লাখ ডলার হাপিস করে দিয়েছিল বাফুফে। বাফুফের কোনো অডিট রিপোর্টেই একাডেমি পরিচালনার জন্য ফিফার দেওয়া সাত লাখ ডলারের কথা উল্লেখ নেই। কয়েক মাস নামকাওয়াস্তে চালিয়ে একাডেমিটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এদিকে এ ব্যাপারে বাফুফের বর্তমান কমিটির কর্মকর্তারা কোন মন্তব্য করতে চাননি। সবাই যেন মুখে কুলুপ এটে রেখেছেন।
(যুগান্তর)




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD