ইসলাম যে মানুষের জন্য কতটা সহজ, উদার ও নমনীয়, তা নিচের ঘটনাটি পড়লেই আপনারা খুব সহজে বুঝতে পারবেন। আল্লাহর রাসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কাছে একবার এক সাহাবি এসে অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি তো ধ্বংস হয়ে গেছি, আমি শেষ! রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কী হয়েছে? তিনি বললেন, আমি রমজান মাসের দিনের বেলায় রোজা থাকা অবস্থায় আমার স্ত্রীর সঙ্গে যৌনমিলন করে ফেলেছি।
ইসলামের বিধান অনুযায়ী, কেউ যদি রমজান মাসে ইচ্ছা করে এভাবে রোজা ভাঙে, তবে তার শাস্তি বা বিধান হচ্ছে তাকে ওই রোজার কাজাও করতে হবে এবং এর কাফফারাও আদায় করতে হবে। কাজা মানে হচ্ছে, যে একটি রোজা ভেঙেছে তার বদলে পরে অন্য যেকোনো দিন একটি রোজা রেখে দেওয়া। আর কাফফারা আদায়ের নিয়ম হচ্ছে—হয় তাকে একজন দাস মুক্ত করতে হবে, অথবা রমজান মাস চলে যাওয়ার পর টানা ৬০ দিন রোজা রাখতে হবে, আর তা-ও যদি সম্ভব না হয় তবে ৬০ জন মিসকিনকে পেট পুরে খাওয়াতে হবে।
সেই সাহাবি যখন রাসুলকে (সা.) বললেন আমাকে বাঁচান, আমি কী করব, তখন আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে বললেন, এই ভুল কাজটার কারণে তোমার ওপর জরিমানা ওয়াজিব হয়েছে। তিনি তাকে কাফফারার প্রথম বিধানটি দিয়ে বললেন, তুমি একজন দাস মুক্ত করে দাও।
সাহাবি উত্তর দিলেন, হে আল্লাহর রাসুল! দাস মুক্ত করার মতো আর্থিক সক্ষমতা বা সামর্থ্য আমার নেই, আমি দাস পাব কোথায়?
আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তখন বললেন, তুমি যদি এটা না পারো, তবে এর বিকল্প হিসেবে কাফফারা আদায়ের জন্য টানা ৬০ দিন রোজা রাখো। অর্থাৎ মাঝখানে কোনো বিরতি না দিয়ে একটানা ৬০ দিন তোমাকে রোজা রাখতে হবে।
সেই সাহাবি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমার পক্ষে এটাও সম্ভব নয়, আমি টানা এতগুলো রোজা রাখতে পারব না।
আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আচ্ছা, তুমি যদি এটাও না পারো, তাহলে তুমি ৬০ জন মিসকিনকে খাবার খাইয়ে দাও।
এবার সেই সাহাবি আরও নিরুপায় হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমার তো কাউকে খাবার খাওয়ানোর মতো সামর্থ্যও নেই, আমার ঘরে সেই আর্থিক অবস্থাই নেই।
এ এক অদ্ভুত বিপত্তি! দাস মুক্ত করা, টানা ৬০ দিন রোজা রাখা কিংবা ৬০ জন মিসকিনকে খাবার খাওয়ানো—এর কোনোটিই করার সামর্থ্য সেই সাহাবির ছিল না।
আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি এখানে একপাশে বসো।
সাহাবি একপাশে গিয়ে বসলেন। আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলেন।
কিছুক্ষণ পর একজন ব্যক্তি এক ঝুড়ি খেজুর নিয়ে রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দরবারে এলেন। ওগুলো ছিল সাদাকা বা চ্যারিটির খেজুর। আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সেই লোকটিকে ডেকে বললেন, নাও, তুমি তো দাস মুক্ত করতে পারলে না, ৬০টা রোজাও রাখতে পারলে না, আবার ৬০ জন মিসকিনকে খাবার দেওয়ার সামর্থ্যও তোমার নেই। এখন আমার দরবারে চ্যারিটির এই এক ঝুড়ি খেজুর এসেছে, তুমি এই খেজুরগুলো নিয়ে যাও এবং মদিনার গরিব মানুষের মাঝে বিতরণ করে দাও। এতেই তোমার কাফফারা আদায় হয়ে যাবে।
রাসুলের (সা.) কথা শুনে সেই সাহাবি অত্যন্ত সরলতার সঙ্গে বললেন, আল্লাহর রাসুল! মদিনায় আমার চেয়েও বেশি গরিব কি আর কেউ আছে যাকে আমার এই খেজুর দিতে হবে? তিনি পরিষ্কার করে বললেন, পুরো মদিনা শহরের আমার চেয়ে বেশি অভাবী ও গরিব পরিবার আর একটিও নেই।
তার কথা শুনে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হেসে ফেললেন, তাঁর পবিত্র দাঁত মোবারক দৃশ্যমান হয়ে উঠল। তিনি বললেন, কী আর করা! তাহলে এই এক ঝুড়ি খেজুর তুমি তোমার নিজের বাসায় নিয়ে যাও। তুমি ও তোমার পরিবারের সবাই মিলে আনন্দের সঙ্গে খাও।
আপনারা একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন, সাহাবি রাসুলের (সা.) কাছে এসেছিলেন নিজের অপরাধের জন্য জরিমানা দিতে, কিন্তু আল্লাহর রাসুলের দরবার থেকে তিনি উল্টো নিজের পরিবারের জন্য এক ঝুড়ি খেজুর নিয়ে বাড়ি ফিরলেন।
ইসলামের এই অপরূপ সৌন্দর্য ও ফ্লেক্সিবিলিটিটা একটু লক্ষ্য করুন। ইসলাম কতটা সহজ এবং মানুষের বাস্তব সুবিধা-অসুবিধাকে কতটা গুরুত্ব দেয়, তা এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। আমরা যখন মানুষের কাছে ইসলামকে ব্যাখ্যা করি বা বোঝাতে যাই, তখন দুর্ভাগ্যবশত ইসলামের এই সহজতা মাথায় রাখি না।
ইসলামের এই অনন্য সুন্দর নমনীয়তা ও উদারতা যখন কোনো অমুসলিম দেখবে বা এই হাদিসটি মনোযোগ দিয়ে পড়বে, আপনারা নিজেরাই বলুন, সে কি আর অন্য কোনো ধর্মে থাকতে পারবে? সে তো অবাক হয়ে ভাববে, একটি ধর্ম মানুষের প্রতি এতটা দয়ালু এবং এতটা ফ্লেক্সিবিল কীভাবে হতে পারে!
আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এভাবেই অত্যন্ত সহজ করে মানুষের সামনে ইসলামকে উপস্থাপন করেছেন।
সূত্র: মিজানুর রহমান আজহারীর অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত তার বক্তব্যের ভিডিও থেকে লেখাটি তৈরি করা হয়েছে।