মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:১১ পূর্বাহ্ন




১৭ বছরের অনিয়ম নিয়ে নিরীক্ষা প্রতিবেদন

বিনামূল্যের বইয়ে বড় দুর্নীতি

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৪১ am
বাংলাদেশ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এনসিটিবি NCTB Boi Mela Dhaka Book Fair Amor Ekushe Grantha Mela Ekushey Book Fair অমর একুশে গ্রন্থমেলা বইমেলা বই মেলা ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি চত্বর book fair নতুন বই উৎসব পাঠ্যবই
file pic

বিগত ১৭ বছরে শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও সরবরাহের নামে অন্তত ২ হাজার ৭১১ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। টেন্ডার কারসাজির মাধ্যমে নিম্নমানের বই ছাপানো, চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত বই মুদ্রণ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অযৌক্তিক সম্মানি ভাতা প্রদান এবং প্রশাসনিক অনিয়মের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বড় ধরনের এই আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এ অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে এনসিটিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং ৫০টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান জড়িত। শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ অনিয়মের তথ্য উঠে আসে।

এদিকে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) বিভিন্ন খাতে এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা এবং ৫০টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এনসিটিবির চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে অভিযোগসংশ্লিষ্ট মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের গত ১০ বছরে পাওয়া কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র, বইয়ের গুণগত মান পরীক্ষার প্রতিবেদন, বিল পরিশোধ, ত্রিপাক্ষিক চুক্তি এবং নিম্নমানের বই সরবরাহের অভিযোগে গৃহীত ব্যবস্থাসহ বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দুদক থেকে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বলে জানা গেছে।

১৭ বছরে এনসিটিবিতে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী মুদ্রণ সিন্ডিকেট এখনো বই ছাপানোর বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয় রয়েছে। তাদের প্রভাবে বর্তমান সরকারের সময়েও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। আগামী শিক্ষাবর্ষের বই ছাপানো ঘিরে এবারও ‘সিন্ডিকেট দর’ দিয়েছে একশ্রেণির মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। এতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিনে শিক্ষা খাতে গড়ে ওঠা দুর্নীতিবাজদের থাবা পড়েছে এনসিটিবির ওপর। অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি এনসিটিবিতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১৭ বছরের কার্যক্রম পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, সরবরাহসহ প্রায় ২০টি খাতে এসব অনিয়ম হয়েছে। কাগজের মান যথাযথভাবে পরীক্ষা না করেই প্রায় ১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার নিম্নমানের পাঠ্যবই মুদ্রণ ও সরবরাহ করা হয়। এছাড়া চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও ৫১৬ কোটি ৩৪ লাখ ৪১ হাজার ২১১ টাকার অতিরিক্ত বই ছাপানো হয়। পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহে অতিরিক্ত ব্যয়ের মাধ্যমে সরকারের আরও ২১৬ কোটি ৪৯ লাখ ২৯ হাজার ৭৫৪ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। আর এর সুবিধাভোগী হলেন মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের মালিক ও এনসিটিবির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বই ছাপানোয় টেন্ডার প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় থেকে একাদশ সর্বনিম্ন দরদাতাকেও কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এতে সরকারের ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৪৩ হাজার ৩৪৩ টাকার ক্ষতি সাধিত হয়। একই সঙ্গে ঠিকাদারদের মধ্যে যোগসাজশ ও ‘সিন্ডিকেট দর’ প্রমাণিত হওয়ার পরও দরপত্র বাতিল না করে কার্যাদেশ দেওয়ায় আরও ৬১ কোটি ৮ লাখ ৮২ হাজার ৪১৫ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়।

নিরীক্ষায় আরও উঠে এসেছে, প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও এনসিটিবির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উৎসাহ-উদ্দীপনা ভাতা হিসাবে ১ কোটি ৬ লাখ ৯৩ হাজার ২৯৭ টাকা গ্রহণ করেছেন। প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও নিয়মিত দাপ্তরিক কাজের নামে অতিরিক্ত সম্মানি বাবদ ব্যয় করা হয়েছে প্রায় দেড় কোটি টাকা, যা সরকারি অর্থের অপচয় হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে।

প্রি-ডেলিভারি ইনস্পেকশনের (পিডিআই) জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ থাকা সত্ত্বেও প্রেস মনিটরিংয়ের নামে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অতিরিক্ত ১ কোটি ৩৭ লাখ ২৬ হাজার ১০০ টাকা বিল নিয়েছেন। এছাড়া টেন্ডার কমিটির সদস্যদের প্রাপ্যতার বাইরে ৩৫ লাখ ৩৪ হাজার ৬৮০ টাকা সম্মানি এবং সম্মানি বিল থেকে আয়কর কর্তন না করায় ২৪ লাখ ৯০ হাজার ৭৭২ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়। ইনসিটু প্রকল্পে অযৌক্তিক সম্মানি প্রদানের মতো অনিয়মও প্রতিবেদনে উঠে আসে।

এছাড়া রয়্যালটি বিল থেকে ভ্যাট কর্তন না করায় ১২ কোটি ২৫ লাখ টাকার অনিয়ম, কর্মকর্তাদের দেওয়া অগ্রিম অর্থ সমন্বয় না করায় প্রায় ১৮ লাখ টাকার অনিয়ম এবং বিধিবহির্ভূতভাবে ৫ কোটি ১ লাখ ৫২ হাজার ৭৪০ টাকা অগ্রিম উত্তোলনের তথ্যও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে আসে।

এ বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, পূর্ণাঙ্গ অডিট প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর অভিযোগ পর্যালোচনা করা হবে। অনিয়মের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরই মধ্যে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপানোর দরপত্রেও পুরোনো সিন্ডিকেটের প্রভাব এখনো বহাল রয়েছে। এবারও বেশির ভাগ বই ছাপার কাজ পেয়েছে বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কাজ পাওয়া মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো। যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক।

অভিযোগের কাঠগড়ায় যেসব মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান : অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস, আমিন আর্ট প্রেস, আনন্দ প্রিন্টার্স, অনন্যা, সরকার ও বলাকা প্রিন্টার্স, আনোয়ারা, কচুয়া প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, অনুপম প্রিন্টার্স লি., অটো ও মোল্লা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, বাংলাদেশ ডিজিটাল প্রিন্টিং প্যাকেজিং, ভাই ভাই প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, ব্রাইট, প্রোমা প্রিন্টিং প্রেস, বৃষ্টি প্রিন্টিং প্রেস, দিগন্ত অফসেট প্রিন্টার্স, ফাহিম প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, ন্যাশনাল প্রিন্টার্স, ফায়িজা প্রিন্টিং প্রেস, ফাথিন প্রিন্টিং, ফাইভ স্টার প্রিন্টিং, ফরাজী প্রেস পাবলিকেশন, হাওলাদার অফসেট প্রেস, কাশেম অ্যান্ড রহমান প্রিন্টিং প্রেস, দ্য গুডলাক প্রিন্টার্স, আলিফ প্রিন্টিং প্রেস, মেরাজ প্রিন্টিং প্রেস, পানামা প্রিন্টার্স, মৌসুমী অফসেট, জনতা প্রেস, নুরুল ইসলাম প্রিন্টিং প্রেস, পাঞ্জেরী প্রিন্টার্স, খন্দকার এন্টারপ্রাইজ, প্রিয়াংকা প্রিন্টিং, রেদওয়ানিয়া প্রেস, এসআর প্রিন্টিং, এসএস প্রিন্টার্স, শৈলী প্রিন্টার্স, টাঙ্গাইল অফসেট, সোমা প্রিন্টিং, ভয়েজার পাবলিকেশন্স, রূপালী প্রিন্টিং ও ঢাকা প্রিন্টার্স।

সরকারের গচ্চা প্রায় ৫০০ কোটি টাকা : আগামী শিক্ষাবর্ষের বই ছাপাতে দরপত্রে ‘সিন্ডিকেট দর’ দিয়ে কাজ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একশ্রেণির মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এতে সরকারকে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এবার ই-টেন্ডারে প্রতি ফর্মার প্রাক্কলিত দর ৩০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪৫ পয়সা করা হয়েছে। এতে শুধু প্রাক্কলিত দর বৃদ্ধির কারণেই সরকারের অতিরিক্ত ৩০০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। এর সঙ্গে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে উচ্চমূল্যে কার্যাদেশ দেওয়ার বিষয়টি যোগ হলে সরকারের মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, দুদকের তথ্য চাওয়া মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোই এসব অনিয়মে জড়িত। যাদের বিষয়ে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও তথ্য উঠে এসেছে। তিনি বলেন, আগামী শিক্ষাবর্ষের বই ছাপানোর বেশির ভাগ কাজই অনিয়মে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো পেয়েছে। এসব বিষয়ে বর্তমান সরকার ও শিক্ষা প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। না হলে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের আরও বড় ক্ষতি হবে। ক্ষতি হবে শিক্ষার্থীদের।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, পাঠ্যবই মুদ্রণ ও বিতরণে অনিয়ম শুধু আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়। এটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও আঘাত হানে। কোটি কোটি শিক্ষার্থীর হাতে যে বই পৌঁছে দেওয়া হয়, সেখানে নিম্নমান বা দুর্নীতির কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে যেসব অনিয়ম উঠে এসেছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে এনসিটিবির ক্রয় ও টেন্ডারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা এবং স্বাধীন নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম আর না ঘটে।

(যুগান্তর)




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD