রাজধানীর মিরপুরের শিয়ালবাড়ীতে পোশাক কারখানা ও কসমিক ফার্মা নামে একটি কেমিক্যাল গোডাউনে লাগা আগুনে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৬ জনে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। তবে এখনও নিহতদের নাম পরিচয় জানা যায়নি।
এই দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, কেমিক্যাল গোডাউনের আগুন এখনো নেভেনি। উদ্ধারকৃত সব লাশ পোশাক কারখানার ভবন থেকে পাওয়া গেছে। উদ্ধারের পর লাশগুলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে আগুনে দগ্ধ তিনজনকে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুইজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন- মো. সুরুজ (৩০) ও মো. মামুন (৩৫)।
দুপুর দুইটার দিকে দগ্ধ অবস্থায় তাদের তিনজনকে উদ্ধার করে জাতীয় বার্নওপ্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়। মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) সকাল ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
পোশাক কারখানার আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও এখনও গোডাউনের ভেতরে জ্বলছে দাহ্য কেমিক্যাল, যা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এ পর্যন্ত ১৬টি লাশ আমরা পেয়েছি। ধারণা করছি, এরা সবাই কেমিক্যাল বিস্ফোরণ থেকে সৃষ্ট বিষাক্ত গ্যাস ইনহেল করেই মারা গেছেন। বিষাক্ত গ্যাসে খুব বেশি টক্সিক ছিল, যা তাৎক্ষণিকভাবে মৃত্যু ঘটাতে পারে। অনেকেই বের হয়ে যেতে পারলেও মৃতরা সম্ভবত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে আর সরতে পারেননি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দুই ও তিন তলা থেকে মরদেহ উদ্ধার করেছি। সার্চিং অপারেশন এখনও চলছে।
এর আগে আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে ফায়ার সার্ভিসের অপারেশন ডিরেক্টর লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমরা যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছেছি, তখন দুটি স্থানে আগুন দেখতে পাই, একটি গার্মেন্টস অংশে ও অন্যটি কেমিক্যাল গোডাউনে। তাই আগুনের মূল উৎস এখনও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।’
ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘কেমিক্যাল গোডাউনের ভেতরে এখনও আগুন জ্বলছে। আমরা কাউকেই ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছি না, এমনকি ফায়ার ফাইটারদেরও না। হিউম্যানলেস টেকনোলজি, ড্রোন এবং লুপ-৬০ গ্রাউন্ড মনিটরের মতো উন্নত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে আগুন নিয়ন্ত্রণ ও সার্চিং কার্যক্রম চলছে।’
আলম কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি নামেই স্থানীয়রা স্থানটি চেনেন। তবে এখন পর্যন্ত কারখানার মালিক, ম্যানেজার বা কর্মচারীদের কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি, কেমিক্যালটির অনুমোদন ছিল না। তবে বিষয়টি তদন্তের পরই নিশ্চিতভাবে বলা যাবে।’
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. শাওন বিন রহমান বলেন, রূপনগরের শিয়ালবাড়ি পোশাক কারখানা ও কেমিক্যাল গোডাউনে আগুনে ঘটনায় আমাদের এখানে দুইজন এসেছে। সুরুজের দুই শতাংশ দগ্ধ হয়েছে ও মামুনের ইনহালেশন ইনজুরি রয়েছে তাদের দু’জনকে অবজারভেশনে রাখা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সূত্রে জানা যায়, ‘দুটো প্রতিষ্ঠানে আগুন লেগেছে। এর মধ্যে একটি তৈরি পোশাক কারখানা, অন্যটি একটি রাসায়নিকের গুদাম। পোশাক কারখানাটি সাততলা। এর চারতলায় আগুন লেগেছে। আমরা পোশাক কারখানার এই আগুন মোটামুটি নিভিয়ে ফেলেছি। তবে রাসায়নিকের গুদামের আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ চলছে। এটা এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি।’ রাসায়নিক কারখানায় ব্লিচিং পাউডার, প্লাস্টিক, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড ছিল বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
নিখোঁজদের জন্য স্বজনের উৎকণ্ঠা-কান্না
জানা যায়, আগুন লাগা সাততলা ভবনটিতে আর এন গার্মেন্টস এবং পাশেই শাহ আলমের রাসায়নিকের গুদাম। সকাল ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে এখানে আগুন লাগে। তবে পোশাক কারখানা নাকি রাসায়নিক গুদামে আগুনের সূত্রপাত হয় তা জানা যায়নি। পোশাক কারখানায় ২৫০-৩০০ লোক কাজ করেন।
নিখোঁজ অনেকের সন্ধান পেতে ছবি নিয়ে ঘটনাস্থলে এসেছেন স্বজনরা। তাদের কান্না আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। তাদেরই একজন রেশমা আক্তার। তিনি সমকালকে বলেন, নিখোঁজ আসমা আক্তার (১৫) আগুন লাগা গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করে। মেয়েটি তাঁর ছেলের শ্যালিকা। তাদের সঙ্গে ১০ নম্বর শিয়ালবাড়ি থাকে আসমা। আগুন লাগার পর থেকে তার খোঁজ মিলছে না।
স্বামী নজরুল ইসলামের খোঁজে এসেছেন নাসিমা আক্তার। তিনি জানান, ১২ বছর ধরে তাঁর স্বামী গার্মেন্টস কারখানায় অপারেটর হিসেবে কাজ করেন। আগুন লাগার খবর পেয়ে কল দিলে শুধু ‘আগুন আগুন ‘ বলে ফোন রেখে দেন। তার পর থেকে স্বামীর ফোন বন্ধ পাচ্ছেন। তারা ৬ নম্বর শিয়ালবাড়ি এলাকায় থাকেন।
নারগিস আক্তারের খোঁজে আসেন বড় বোন লাইজু বেগম। তিনি বলেন, আমার বোন সকাল পৌনে আটটায় কাজে আসে। সকাল ১১টায় খবর পাই আগুন লেগেছে। সেখানের একজনের সঙ্গে ফোনে কথা বলে জানতে পারি কেউ ভেতর থেকে বের হতে পারেনি। এরপর থেকে আর কোনো খোঁজ পাইনি।
ভাগ্নি সুলতানা ও তার স্বামী জয়ার ছবি হাতে আসা ইয়াসিন নামের আরেকজন বলেন, আমার ভাগনি ভাগ্নির জামাই তিনদিন আগে কাজে ঢুকেছে। সকালে দুজন একসঙ্গে কাজে আসে। আগুন লাগার পর ফোন দিয়ে জানায় তারা ভেতরে আটকে গেছে।
নিখোঁজ মাহিরার মামা শফিকুল ইসলাম বলেন, আমার ভাগ্নি গার্মেন্টসের তিন তলায় কাজ করত। তাকে খুঁজে পাচ্ছি না। আগুন লাগার পর থেকে আমরা তাকে খুঁজছি। আশেপাশের হাসপাতালেও খোঁজ নিয়েছি। কোথাও খুঁজে পাইনি।
এর আগে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ওই পোশাক কারখানা ও পাশের রাসায়নিক গুদামে আগুন লাগে। পোশাক কারখানাটি চারতলা ভবনে, আর রাসায়নিক গুদাম টিনশেড ঘরে।
বিকেলে ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘তল্লাশি এখনো চলমান। পাশের যে কেমিক্যাল গোডাউন রয়েছে, সেখানে এখনও আগুন জ্বলছে। এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ওখানে কাউকে যেতে দিচ্ছি না। আমরা সর্বোচ্চ প্রযুক্তি দিয়ে, ড্রোন দিয়ে কার্যক্রম করছি।’
তিনি জানান, পানি ছিটিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা চলছে। কোথা থেকে আগুনের সূত্রপাত তা এখনো জানা যায়নি।
আগুনে নেভানোর চেষ্টার মধ্যে বিকেল সোয়া চারটার দিকে ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম ৯ মরদেহ উদ্ধারের কথা জানান। এরপর সন্ধ্যায় ফায়ার সার্ভিস থেকে জানো হয়, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬ হয়েছে।