শুরু হলো মহান স্বাধীনতার মাস মার্চ—আমাদের জাতীয় জীবনের গৌরব, বেদনা ও অদম্য প্রত্যয়ের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। এ মাস এলেই ফিরে আসে দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস, উত্তাল আন্দোলনের দিনগুলো এবং আত্মত্যাগে রঞ্জিত মুক্তিযুদ্ধের মহাকাব্য। স্বাধীনতা কোনো আকস্মিক অর্জন নয়; এটি রক্তস্নাত সংগ্রাম, অবিরাম প্রতিরোধ ও জাতিসত্তার স্বীকৃতির দাবিতে আপসহীন লড়াইয়ের ফসল।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলেও পূর্ববাংলার মানুষের ভাগ্যে কাঙ্ক্ষিত মুক্তি আসেনি। পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ হয়েও বাঙালিরা শুরু থেকেই বৈষম্যের শিকার হয়। জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক ক্ষমতা, প্রশাসন, সামরিক কাঠামো ও অর্থনীতিতে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। পূর্বাঞ্চলের পাট ও কৃষিপণ্য থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হতো মূলত পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়নে, অথচ অবকাঠামো উন্নয়নে পূর্ববাংলা ছিল উপেক্ষিত।
রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাঙালির আত্মপরিচয়ের ওপর সরাসরি আঘাত হানে। এর প্রতিবাদেই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালির প্রথম সংগঠিত প্রতিরোধে রূপ নেয়। ভাষা শহীদদের রক্ত জাতিসত্তার প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানকে সুদৃঢ় করে এবং পরবর্তী সব আন্দোলনের প্রেরণায় পরিণত হয়।
এরপর ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন এবং ১৯৬৬ সালের ছয় দফা কর্মসূচি স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সুসংহত করে। ছয় দফা ছিল মূলত অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বৈষম্য দূর করার রূপরেখা। এ দাবির প্রেক্ষিতে গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মতো দমন-পীড়ন চালানো হলেও দমে যায়নি বাঙালি। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান সামরিক শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেয়।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। গণতান্ত্রিক রীতি অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে শুরু হয় টালবাহানা ও রাজনৈতিক চক্রান্ত। একই সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত পূর্ববাংলার মানুষের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের উদাসীনতা ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা দেন—“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” সেই ভাষণ ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির স্পষ্ট নির্দেশনা এবং জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার অদ্বিতীয় আহ্বান।
অবশেষে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে নৃশংস অভিযান শুরু করে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বিচার হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণের মাধ্যমে বাঙালিকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা চলে। ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। ২৭ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। সংগঠিত হতে থাকে মুক্তিবাহিনী, প্রবাসে গঠিত হয় অস্থায়ী সরকার, বিশ্বজনমত গঠনে শুরু হয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা।
নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ এবং অসংখ্য নারী নির্যাতনের বেদনার মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মধ্য দিয়ে দখলদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়।
স্বাধীনতার মাস মার্চ শুধু অতীতের স্মরণ নয়—এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। এ মাস শেখায়, অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামই মুক্তির পথ। স্বাধীনতা মানে শুধু ভূখণ্ডের মুক্তি নয়; এটি ন্যায়, সাম্য, গণতন্ত্র ও মানবিক মর্যাদার অঙ্গীকার।