ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। যে কোনো মূল্যে তেল-গ্যাসের মজুত বাড়িয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে জোর তৎপর চালাচ্ছে সরকার। লক্ষ্য পূরণে দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয় নীতির আওতায় (ডিপিএম) তিন লাখ টন ডিজেল ক্রয়ের পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত করেছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়। এছাড়া বেশি দামে হলেও আগামী এপ্রিল পর্যন্ত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে সরকার। হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া তেলবাহী একটি জাহাজ যাতে নির্বিঘ্নে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়তে পারে সেজন্য ইরান দূতাবাসকে অনুরোধ করার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই কাজটি সম্পন্ন করার কথা জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। সরকারের ভাবনায় মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র থেকেও ডিজেল আমদানির বিষয়টি রয়েছে। জানতে চাইলে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু রোববার বলেছেন, জ্বালানিবাহী বাংলাদেশের জাহাজ ছেড়ে দিতে ইরানকে অনুরোধ করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে।
আশা করি এতে বাংলাদেশের আটকা পড়া তেলবাহী জাহাজ ছাড়া পেয়ে দেশে আসবে।
জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম বলেছেন, মার্চ ও এপ্রিলের জ্বালানি তেল এবং গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে সব উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমান সরকার জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। এ জন্য প্রয়োজনে সরাসরি ক্রয় নীতির মাধ্যমে তেল-গ্যাস কেনা হবে।
জানা গেছে, মার্চে জ্বালানি তেলের চাহিদা ৩ লাখ ৮০ হাজার টন। এর মধ্যে ২ লাখ ৭৯ হাজার টন তেল সরবরাহের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন। বিপুল পরিমাণ এই তেল পাইপলাইনে রয়েছে। এর মধ্যে ৩০ হাজার টন ডিজেল নিয়ে আজ এমটি থেমিক্স এবং কাল চ্যাং হাঙ্গ জাহাজ আসার কথা রয়েছে। এর বাইরে চলতি মাসেই আরও প্রায় দুই লাখ টন তেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে একাধিক জাহাজ ভেড়ার কথা। এগুলোর মধ্যে ১৬ মার্চ গ্রান্ড চৌভা নামের একটি জাহাজ, ১৫ মার্চ বিএসপি ও ভিটল, ১৯ মার্চ ইউনিপে, ২৪ মার্চ বিএসপি, ২৬ মার্চ পিটিএলসিএল, ২৯ মার্চ ভিটল এবং ৩১ মার্চ ইউনিপের জাহাজ ভেড়ার কথা এবং তবে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত না করায় এর বিকল্প হিসাবে মার্চে এক লাখ টন তেল আমদানির জন্য বিকল্প উৎস খুঁজছে সরকার। এপ্রিলে ১৬টি তেলবাহী জাহাজ বন্দরে ভেড়ার কথা। কিন্তু সরবরাহকারীরা এখনো এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলেনি। এপ্রিলে তেল সরবরাহে যেন কোনো ধরনের সমস্যা না হয় সেজন্য দরপত্রের বাইরে বিভিন্ন উৎস থেকে তেল আনার চেষ্টা করছে সরকার। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসি জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ২৮ লাখ টন তেল কেনার অনুমোদন দিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেক তেল সরবরাহ করা হবে ঠিকাদারের মাধ্যমে এবং বাকি তেল সরবরাহ করা হবে সরকার টু সরকার বা জি টু জি পদ্ধতিতে।
সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশমুখী জাহাজ এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে ৪ দিন ধরে সৌদি আরবে অপেক্ষা করছে এমটি নরডিক পোলেক্স নামের একটি জাহাজ। যুদ্ধের কারণে জাহাজটি হরমুজ প্রণালি পার হতে পারছে না। এছাড়া বাংলাদেশের জন্য কেনা তেল মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে আটকে আছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ইরান সরকারকে অনুরোধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
এদিকে সারা দেশে মার্চে গ্যাস সরবরাহ অনেকটা নিশ্চিত হয়েছে। গতকাল কাতার থেকে দুটি পার্সেল এসেছে। এগুলো বর্হিনোঙ্গরে রাখা হয়েছে। আজ থেকে ওই জাহাজ থেকে গ্যাস খালাস করে জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হবে। কাতারের ওই এলএনজিবাহী জাহাজ যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে। তাই ওই দুই জাহাজ নিরাপদে বাংলাদেশে আসতে পেরেছে।
মার্চের জন্য স্পট মার্কেট থেকে গত সপ্তাহে দুটি পার্সেল কেনা হয়েছে। সেগুলো মার্চের শেষে খালাস করা হবে। মার্চ নিয়ে দুশ্চিন্তা না থাকলেও এপ্রিল নিয়ে চিন্তা আছে। এপ্রিলে ১১ এলএনজি পার্সেল আসার কথা। এর মধ্যে একটি ছাড়া বাকি ১০টি পার্সেল একেবারে অনিশ্চিত। কারণ কাতার, ওমান এনার্জি ওই এলএনজি সরবরাহে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। জানা গেছে, এপ্রিলে কাতারের ৭টি পার্সেল আসার কথা থাকলেও সেগুলো আর আসছে না। তাই স্পট মার্কেট থেকে ৬টি পার্সেল কিনতে পেট্রোবাংলাকে নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। আর চাহিদার বাকি এলএনজি স্পট মার্কেট বা অন্য উৎস থেকে সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশে দৈনিক ৪০০ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাসের চাহিদা আছে। আর সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে ২৬০ কোটির মতো। এর মধ্যে আমদানি করা এলএনজি হচ্ছে ৯৫ কোটি ঘনফুট।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এপ্রিল পর্যন্ত তেল এবং গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে সব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি সবাইকে বুঝতে হবে। গত এক সপ্তাহে অনেক রিফাইনারি বন্ধ হয়েছে এবং তেলের ডিপোতে হামলা হয়েছে। এই পরিস্থিতি একেবারে অস্বাভাবিক। তাই টাকা দিলেই যে তেল-গ্যাস মিলবে, এটা ঠিক নয়।
(যুগান্তর)