শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৮ পূর্বাহ্ন




লোকসানের মুখে চামড়া সংগ্রহ বন্ধ করে দিয়েছে ৭৩ বছরের পুরনো ট্যানারি

চামড়া সংগ্রহ বন্ধ করে দিয়েছে ৭৩ বছরের পুরনো ট্যানারি

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৮ জুন, ২০২৩ ১১:২৪ am
চামড়া hides hide Rawhide cowhides Bangladesh Tanners Association BTA বাংলাদেশ ট্যানার্স এসোসিয়েশন বিটিএ leather চামড়াজাত চামড়া শিল্প কাঁচা চামড়া শিল্পনগরী ট্যানারি শিল্প লেদারটেক লেদার কুরবানির পশুর চামড়া চামড়া
file pic

ব্রিটিশ আমলে ভারতের একটি ট্যানারিতে কাজ করতেন সাঈদ মিয়া। কাজের সুবাদে চামড়া প্রক্রিয়াজাতের খুঁটিনাটি সব জেনে নেন। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগের সময় দেশের বাড়ি নোয়াখালীতে ফিরে আসেন। এসে দেখেন, স্থানীয় লোকজন গরু-ছাগল জবাই করে চামড়াগুলো খালে ফেলে দিচ্ছেন কিংবা পুঁতে ফেলছেন। নোয়াখালী অঞ্চলে তখন কোনও ট্যানারি না থাকায় পশুর চামড়াগুলো কোনও কাজে লাগাতো না। তা দেখে নোয়াখালীতে ট্যানারি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন সাঈদ। ১৯৫০ সালে নোয়াখালীর সোনাপুরের দত্তেরহাট এলাকার গোপাই গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন ‘দ্য নোয়াখালী ট্যানারি।’

স্বাধীনতার পর সরকারের কাছ থেকে নোয়াখালী ট্যানারির নামে দেড় একর (১৫০ শতাংশ) জমি লিজ নেন। জমি লিজ নিয়ে ট্যানারির ব্যবসার পরিধি বাড়ান। পার্শ্ববর্তী ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকারদের মাধ্যমে পশুর চামড়া সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করতেন। পরে সেগুলো ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করতেন। ১৯৭৭ সালে বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান সাঈদ। তার মৃত্যুর পর ছেলে গোলাম ছারওয়ার মিন্টু ব্যবসার হাল ধরেন। বাবার গড়া প্রতিষ্ঠানকে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আরও এগিয়ে নেন মিন্টু। ২০০৭ সালে তিনিও মারা যান। মিন্টুর মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার দায়িত্ব নেন তার ছেলে শাহরিয়াত ছারওয়ার। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন তিনি।

দাদা সাঈদ মিয়ার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানকে নাতি শাহরিয়াত ছারওয়ার এগিয়ে নিয়েছেন অনেক দূর। নোয়াখালী ট্যানারি থেকে প্রক্রিয়াজাতকৃত চামড়া দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি শুরু করেছিলেন। মাসে ন্যূনতম ৫০ হাজার ডলার করে বছরে ছয় লাখ ডলার পর্যন্ত আয় করতেন। এর মধ্যে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও ইতালিতে চামড়া সরবরাহ করে আসছিলেন। কিন্তু ২০২০ সালে মহামারি করোনার সময় বন্ধ হয়ে যায় রফতানি। রফতানি বন্ধ হলেও দেশের বাজারে প্রক্রিয়াজাতকৃত চামড়া সরবরাহ করে কোনো রকমে টিকে ছিল এই প্রতিষ্ঠান।

২০২১ সালে ঈদুল আজহায় পাইকারদের কাছ থেকে চামড়া সংগ্রহ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এরপরই নেমে আসে অন্ধকার। লবণ ও কেমিক্যালসহ অন্যান্য জিনিসের দাম বৃদ্ধি, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, দেশের বাজারে চাহিদা না থাকা, রফতানি বন্ধ, আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতনসহ নানা কারণে ২০২২ সাল থেকে চামড়া সংগ্রহ বন্ধ করে দেয়। ফলে এবার ঈদুল আজহায় পশুর চামড়া সংগ্রহ করবে না প্রতিষ্ঠানটি।

সরেজমিনে নোয়াখালী ট্যানারিতে গিয়ে দেখা যায়, কোনও কর্মযজ্ঞ নেই। নেই কারও কোলাহল। কয়েক বছর আগের কিছু চামড়া গোডাউন ও আশপাশে বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে আছে। ট্যানারির মেশিনগুলো গত দুই বছর থেকে না চলায় নষ্ট হয়ে গেছে। ট্যানারির ছাউনি ভেঙে পড়ে আছে। দুই জন প্রহরী বসে পাহারা দিচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটি। তাদের মধ্যে একজন নুরুননবী। বয়স ৭৫। প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় নুরুননবীর।

৪৫ বছর ধরে এখানে কাজ করছি জানিয়ে নুরুননবী বলেন, ‘নোয়াখালী ট্যানারির সবচেয়ে পুরনো স্টাফ আমি। এখানে আগে সারা বছর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হতো। কোরবানির ঈদে গরুর দেড় থেকে দুই লাখ, ছাগলের তিন লাখ ও ৫০-৬০ হাজার মহিষের চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা হতো। শত শত শ্রমিক কাজ করতেন। এখানে কাজ করে ছেলেমেয়েদের বড় করেছি। কাজ যত বেশি হতো তত বেশি আনন্দ পেতাম। সবাই মিলেমিশে কাজ করতাম। কত হাজারো স্মৃতি আছে ট্যানারি ঘিরে। গত বছর মালিক কোনও কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করেননি। এ বছরও করবেন না বলে জানিয়েছেন। আমরা আট জন শ্রমিক এখানে আছি। এখন অলস সময় কাটাই। কারখানা পাহারা দিই। জীবনে অন্য কোনও কাজ শিখিনি। এই বয়সে অন্য কেউ কাজেও নেবে না। তাই এখানে পড়ে আছি। মাস শেষে মালিক যা দেন, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে।’

একসময় নোয়াখালী ট্যানারিতে কাঁচা চামড়া সরবরাহ করতেন দত্তেরহাট বাজারের বাসিন্দা সবুজ হোসেন। তিনি বলেন, ‘নোয়াখালী ট্যানারিতে অনেক বছর চামড়া সরবরাহ করতাম। চামড়াগুলো বিভিন্ন স্থান থেকে কিনে পাইকারিতে বিক্রি করতাম। গত কোরবানির ঈদে তারা আমাদের থেকে কোনও চামড়া নেয়নি। শুনেছি এবারও নেবে না। চামড়া না নেওয়ায় আমরা সংগ্রহ কমিয়ে দিয়েছি। বাজারে কাঁচা চামড়ার দাম একেবারে কম। কেউ এখন আর চামড়া নিতে চায় না। তারপরও কোরবানির ঈদে যেসব চামড়া সংগ্রহ করবো, সেগুলো ঢাকা-চট্টগ্রামে পাঠিয়ে দেবো। এতে আমাদের বাড়তি পরিবহন খরচ লাগবে।’

নোয়াখালী ট্যানারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়াত ছারওয়ার বলেন, ‘দাদা সাঈদ মিয়ার হাতে গড়া এই প্রতিষ্ঠান। আমাদের পরিবারের বহু স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই ট্যানারি ঘিরে। দাদার মৃত্যুর পর বাবা হাল ধরেন। বাবার মৃত্যুর পর আমি। গত কয়েক বছর ভালো ব্যবসা হয়েছে। এখানে প্রক্রিয়াজাতকৃত চামড়া দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি করতাম। গত বছর থেকে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ একেবারে বন্ধ রেখেছি। এ বছরও চামড়া সংগ্রহের কোনও পরিকল্পনা নেই।’

চামড়া সংগ্রহ না করার কারণ জানতে চাইলে শাহরিয়াত ছারওয়ার বলেন, ‘বিশেষ করে কেমিক্যালের দাম বৃদ্ধি, ডলার সংকটে এলসি বন্ধ, লবণের অতিরিক্ত দাম, শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে, কাঁচা চামড়ার বৈশ্বিক বাজারে ধস, লোকসান—এসব কারণে চামড়া সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত বন্ধ রেখেছি। ভবিষ্যতে কখনও চালু করতে পারবো কিনা জানি না। ভাবতেই খারাপ লাগছে। একসময়ের প্রাণবন্ত ট্যানারি এখন বন্ধ। সরকার যদি স্বল্প সুদে বড় অংকের ঋণ দেয়, তাহলে কারখানাটি পুনরায় চালু করতে পারবো বলে আশা রাখছি।’

ট্যানারির ছাউনি ভেঙে পড়ে আছে

ট্যানারি সচল করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের কোনও উদ্যোগ আছে কিনা জানতে চাইলে নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক দেওয়ান মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘নোয়াখালী ট্যানারির কার্যক্রম বন্ধের বিষয়টি জেনেছি। সচল করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করবো। তারা জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা চাইলে আমরা প্রস্তুত আছি।’




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD