দিনাজপুরের হিলিতে লাভের আশায় চামড়া কিনে বিপাকে পড়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। যে দামে চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে তাতে করে লাভ তো দূরের কথা কেনা দাম উঠছে না বলে দাবি তাদের। গরুর চামড়া বিক্রি করতে পারলেও ছাগলের চামড়া কেউ নিচ্ছে না। তবে কেউ কেউ গতবারের চেয়ে দাম বেশি পাওয়ায় লাভের কথা বলছেন। ন্যায্য দামেই চামড়া কেনা হচ্ছে জানিয়ে লবণের দাম বাড়ার কারণে বাড়তি দাম দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে দাবি চামড়া ক্রেতাদের।
হিলির মুন্সিপট্টির চামড়াপট্টিতে গিয়ে দেখা যায়, দুপুরের পর থেকেই হিলির বিভিন্ন এলাকা থেকে চামড়া নিয়ে আড়তে আসতে শুরু করেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। একইভাবে বিভিন্ন স্থান থেকে মাদ্রাসা, এতিমখানা কর্তৃপক্ষ তাদের সংগ্রহ করা চামড়া নিয়ে সেখানে আসতে শুরু করেন। তবে তুলনামূলক চামড়ার দাম না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
এদিকে বৃষ্টির মধ্যে চামড়া কেনাবেচা নিয়ে সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে তাদের।
চামড়া বিক্রি করতে আসা হিলির সাদুড়িয়া গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এবার ৯০ হাজার টাকা দিয়ে গরু কোরবানি দিয়েছি। সেই গরুর চামড়া বিক্রি করতে এসেছি হিলিতে। কিন্তু চামড়ার যে দাম বলছে তাতে করে আমি অবাক। গ্রামেই যে চামড়ার দাম ৬০০ টাকা বলেছিল সেই চামড়া হিলিতে নিয়ে আসে দাম বলছে ৪০০ টাকা। গ্রামের চেয়ে এখানে আরও ২০০ টাকা কম বলছে আবার গাড়ি ভাড়া দিয়ে এখানে আসলাম সেই খরচ তো বাদই দিলাম। আমাদের নিজেদের গরুর চামড়া দেখে হয়তো লোকসান করেও দিলাম। কিন্তু যারা মৌসুমি ব্যবসায়ী এরকম হলে তারা বিপাকে পড়ে যাবেন।’
চামড়া বিক্রি করতে আসা হিলির সাতকুড়ি গ্রামে ইয়াসিন আলী বলেন, ‘প্রতি বছরের মতো এবারও কিছুটা লাভের আশায় পাড়া মহল্লায় কোরবানির পশুর চামড়া কিনেছি। স্থানীয়দের কাছ থেকে গরুর চামড়া কিনেছি ৩৫০ টাকা করে। কিন্তু হিলিতে চামড়া বিক্রি করতে এসে শুনি দাম বলছে ৩৩০ টাকা। আমদানি বেশি, যার কারণে ক্রেতারা দাম কম বলছে। এখন বাধ্য হয়ে তাদের দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। এগুলো রাখা তো সম্ভব নয়। আর খাসির চামড়া তো নিতেই চাচ্ছে না। ১৩টি খাসির চামড়া নিয়ে এসেছিলাম। সবগুলো চামড়া মাত্র ৫০ টাকায় দিয়েছে। সরকার যে চামড়ার দাম বেঁধে দিয়েছে সেই দামে এখানে চামড়া কিনছে না। পাড়া-মহল্লায় মৌসুমি ব্যবসায়ী হিসেবে চামড়া কিনেছি লাভের আশায়। কিন্তু এখন বিক্রি করতে নিয়ে এসে দেখি বাজার খারাপ।’
চামড়া বিক্রি করতে আসা হিলির ছাতনি গ্রামের আব্দুল আওয়াল বলেন, ‘প্রতি বছরই ঈদের সময় চামড়া ককিনি। এবারও কিনেছি। কিন্তু গতবারের চেয়ে এবার চামড়ার ভালো দাম রয়েছে। এবার ৩২টি গরুর চামড়া কিনেছিলাম। সব খরচ বাদ দিয়ে ১ হাজার ৬০০ টাকা আয় হয়েছে। প্রতি পিস গরুর চামড়া খরচ দিয়ে আমার ৪০০ টাকা পড়েছিল। আর বিক্রি করলাম ৪৫০ টাকা পিস হিসাবে। তবে ছাগলের চামড়া ৬/৭টা ছিল। এগুলোর কোনও টাকা দেয়নি। গতবার দাম না থাকায় যে টাকা দিয়ে চামড়া কিনেছিলাম সেই আসল টাকায় ওঠেনি।’
হিলির চামড়াপট্টির চামড়া ক্রেতা স্বপন মুন্সি বলেন, ‘প্রতি বছরের মতো এবারও চামড়া কিনছি। চামড়ার বেশ ভালোই আমদানি রয়েছে। তবে চামড়া বিক্রেতারা ভালো দাম পাচ্ছে না। এর কারণ লবণের দাম বৃদ্ধি। গতবারে যে লবণের বস্তা ছিল ৬০০ টাকা সেই লবণের বস্তা এখন ৯০০ টাকা। এ কারণে চামড়া দাম খুব একটা বাড়তি দাম দিয়ে কেনা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে আমরা প্রকারভেদে প্রতি পিস গরুর চামড়া ৪০০ টাকা থেকে শুরু করে ৭০০ টাকা পর্যন্ত কিনছি। মূলত চামড়ার মানের উপর নির্ভর করছে দাম। এর ওপর বৃষ্টির কারণে চামড়া প্রসেসিং করতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।’
অপর চামড়া ক্রেতা আশরাফুল মুন্সি বলেন, ‘এবার আমরা তো বাড়তি দাম দিয়েই চামড়া কিনেছি। লবণের বাড়তি দামের কারণে চামড়া প্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা খরচ পড়ে যাবে। সরকার যে হিসাবে চামড়ার দামের ঘোষণা দিয়েছে সেই হিসাবে যদি এখন ট্যানারি মালিকরা আমাদের কাছ থেকে চামড়া কিনে তাহলে কিছুটা লাভ হবে। আর যদি না কিনে তাহলে ব্যবসায়ীদের বড় লোকসান হবে।’
সরকার এ বছর কোরবানির ঈদে ঢাকায় গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬ শতাংশ বাড়িয়ে ৫০-৫৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। রাজধানীর বাইরে গরুর কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৫-৪৮ টাকা বর্গফুট। আর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতি বর্গফুট ছাগলের চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ থেকে ২০ টাকা।