শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬, ০৫:০৯ অপরাহ্ন




আসামিকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠাতে হবে

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫ ১০:০৭ am
tajul Mohammad Tajul Islam lawyer Bangladesh Supreme Court Chief Prosecutor International Crimes Tribunal প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
file pic

আসামিকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠাতে হবে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। গতকাল জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ তিনজনের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়দিনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। এদিন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা মামলার স্বপক্ষে তাদের আংশিক যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ‘১৫ জন সেনা কর্মকর্তাকে রাখার জন্য সাব-জেল ঘোষণা করা হয়েছে’-এ প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর সাংবাদিকদের বলেন, আমি এখন পর্যন্ত জানি না আদৌ কোনো সাব-জেল ঘোষণা করা হয়েছে কিনা। কোনো ডকুমেন্ট আমার হাতে নেই। যদি সরকার কোনো নির্দিষ্ট জায়গাকে সাব-জেল ঘোষণা করে, সরকারের সেই ক্ষমতা আছে কোন জায়টাকে জেল ঘোষণা করবে। এটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত। সুতরাং এটা আমাদের কনসার্ন হওয়ার কোনো বিষয় না। আমাদের যেটা বক্তব্য, সেটা হলো- যখন কোনো আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হবে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন এটা তামিল করবে, কাউকে গ্রেপ্তার করবে তখন সরাসরি কাউকে জেলে নেয়ার কোনো বিধান নেই।

চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, আইন হলো-আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে আনতে হবে। আদালতে আনার পর, আদালত ফারদার অর্ডার দিয়ে যদি বলে তাকে কারাগারে পাঠাতে হবে, তখন কারাগার বলতে- সেটা কেন্দ্রীয় কারাগার হতে পারে, সেটা জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতর হতে পারে, এমপি হোস্টেল হতে পারে বা অন্য কোনো জায়গাকেও যদি সরকার কারাগার ঘোষণা করে সেখানে পাঠানো যেতে পারে। সেটা জেল বা কারাগার হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু কোন জায়গায় করা হচ্ছে এটা প্রসিকিউশন বা তদন্ত সংস্থার বিবেচ্য বিষয় না। আমাদের বিবেচ্য বিষয় হলো আইন অনুযায়ী কাজটি করতে হবে। আসামিকে গ্রেপ্তার করলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে আদালতে আনতে হবে। এরপরে আদালত যেখানে তাকে রাখতে বলবে, সেখানে রাখা হবে। এটা সংবিধানে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে, ফৌজদারি কার্যবিধিতে আছে।

পুলিশ ছাড়া কেউ গ্রেপ্তার করতে পারবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেকোনো ব্যক্তিকেই গ্রেপ্তার করতে পারবে। আইনের দৃষ্টিতে পুলিশ, আর্মি, সিভিলিয়ান বলে কোনো কথা নাই। আইনের দৃষ্টিতে প্রত্যেক মানুষই সমান। সেই ব্যক্তির গায়ে কতো দামি পোশাক আছে, অথবা বস্ত্রহীন কিনা এটা দেখবে না। আইন দেখবে কেবল মাত্র মানুষ এবং প্রত্যেক মানুষ আইনের দৃষ্টিতে সমান। এখানে কারও উঁচু মর্যাদা, কারও নিচু মর্যাদা, কাউকে ইন ট্রিটমেন্ট দেয়া, কাউকে অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা দেয়ার সুযোগ এখানে নাই। আইনের শাসনের মূল কথাই হচ্ছে- আইনের দৃষ্টিতে প্রত্যেক মানুষই সমান।

সেনা অফিসারদের গ্রেপ্তার করার ব্যাপারে তাজুল ইসলাম বলেন, আদালতের এই আদেশটা পালনের ব্যাপারে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের অফিসকে অবহিত করা হয়েছে। তারা কিন্তু গ্রেপ্তার করবেন না। তাদের অবহিত করার অর্থ হচ্ছে- পুলিশ যখন এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানাটা তামিল করতে যাবেন, তারা অবহিত থাকলে এই পরোয়ানাটা তামিল করতে তাদের সাহায্য করতে পারবেন। সুতরাং অ্যারেস্ট করার ক্ষমতা কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্য কারও নাই। সেনা হেফাজতে থাকা অফিসারদের ব্যাপারে তিনি বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত গ্রেপ্তার দেখানো না হয়েছে, যদি পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে, তখন থেকে তাদের ওপর আইন প্রযোজ্য হবে। তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোর্টে আনতে হবে। কিন্তু আপনি যদি গ্রেপ্তার না দেখান, তাহলে তার ক্ষেত্রে এই ২৪ ঘণ্টার আইনটি প্রযোজ্য নয়।

১১টি ঘটনা প্রবাহে পুরো জুলাই আন্দোলনের বর্ণনা: ট্রাইব্যুনালে জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনে শেখ হাসিনাসহ আসামিরা ব্যাপক মাত্রায় যে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছিল সেই স্বপক্ষে প্রসিকিউশনের বক্তব্য তুলে ধরেন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। এ সময় গত বছরের ১লা জুলাই থেকে ৫ই আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলন দমনে সরকারের কার্যক্রম, আন্দোলন কর্মসূচি, নিহতদের তালিকাসহ বিভিন্ন বিষয়গুলোকে ১১টি ঘটনা প্রবাহের মাধ্যমে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে ভিক্টিম ছিল বিরোধী দলের নেতাকর্মী, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও সাধারণ ছাত্র-জনতা। ভিক্টিমদের নজরদারির জন্য ডিজিএফআই, এনএসআই, সিটিটিসি, এনএসআই, এসবিসহ বিভিন্ন সরকারি গোয়েন্দা বাহিনীকে ব্যবহার করা হতো।

তিনি বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণের জন্য ‘ওয়াইড স্প্রেড’ (ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়া) এবং ‘সিস্টেমেটিক্যালি’ (ধারাবাহিকতা ও পদ্ধতিগত বাস্তবায়ন) উপায়ে অপরাধ সংঘটিত হতে হবে। আজ আসামিদের ‘ওয়াইড স্প্রেড’ অপরাধের স্বপক্ষে যুক্তিতর্ক তুলে ধরেছি, আগামীকাল আমরা অপরাধের ধারাবাহিকতা ও পদ্ধতিগত বাস্তবায়নের বিষয়টি তুলে ধরবো।

শেখ হাসিনার ফোনে ডেপুটি সামরিক সেক্রেটারিকে গুলির নির্দেশ দেন: যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের শুরুতেই ট্রাইব্যুনালে ‘দ্য ডেইলি স্টারের একটি স্পেশাল ভিডিও রিপোর্ট’ প্রদর্শন করেন চিফ প্রসিকিউটর। এতে জুলাই আন্দোলন দমন ও শেষ সময় পর্যন্ত ক্ষমতায় টিকে থাকতে শেখ হাসিনার বিভিন্ন পদক্ষেপের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। একপর্যায়ে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ডেপুটি মিলিটারি সেক্রেটারি কর্নেল রাজিবের মধ্যকার একটি অডিও কল রেকর্ডের কথোপকথন ট্রাইব্যুনালকে শোনান। কল রেকর্ডে শেখ হাসিনাকে ওই কর্মকর্তাকে বলতে শোনা যায়, ‘ওরা কিন্তু জায়গায় জায়গায় এখন জমা হতে শুরু করেছে। মিরপুর ১০ নম্বর, উত্তরা, তারপরে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি এবং বিভিন্ন জায়গায়। শুরুতেই কিন্তু ইয়ে…..করতে হবে, একদম শুরুতেই। ধাওয়া দিলে এরা গলিতে গলিতে থাকবে। এবার আর কোনো কথা নাই, এবার শুরুতেই দিবা’। পরে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম কোর্টকে বলেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে কথোপকথনের অপর পক্ষের ব্যক্তি হলেন কর্নেল রাজিব, ডেপুটি মিলিটারি সেক্রেটারি। শেখ হাসিনা গত বছরের ১৯শে জুলাই এই নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর। কর্নেল রাজিব বর্তমানে পলাতক রয়েছেন বলেও জানান তিনি।

শহীদ হৃদয়ের লাশ কড্ডা নদীতে ফেলে পুলিশ: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকায় গুলিতে নিহত কলেজছাত্র হৃদয় হোসেনের লাশ রাতের আঁধারে গাজীপুরের কড্ডা নদীতে ফেলে দেয় পুলিশ। হৃদয়কে কাছ থেকে গুলি করে কোনাবাড়ী থানার পুলিশ কনস্টেবল আকরাম। এ ব্যাপারে আকরাম স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানায় চিফ প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, লাশের সন্ধানে কড্ডা নদীতে ডুবুরি নামিয়ে খোঁজা হয়েছিল। কিন্তু নদীটি প্রচণ্ড খরস্রোতা হওয়ায় তার লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

বিভিন্ন সাক্ষীর ধরন: চিফ প্রসিকিউটর ট্রাইব্যুনালকে জানান, এই মামলায় সর্বমোট ৫৪ জন সাক্ষী তাদের সাক্ষ্যের জবানবন্দি দিয়েছেন। এদের মধ্যে- ঘটনার সাক্ষী বা চাক্ষুস সাক্ষী-৭ জন, আহত ভিকটিম-২ জন, ভিকটিম পরিবার-৮ জন, আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী-৭ জন, আহতদের চিকিৎসক সাক্ষী/ডাক্তার সাক্ষী-৩ জন, জব্দ তালিকার সাক্ষী-১৪ জন, সাংবাদিক-১ জন, পোস্টমর্টেম সাক্ষী-১ জন, ঘটনার সমর্থন সাক্ষী-২ জন, রাজসাক্ষী-১ জন, বিশেষ তদন্তকারী-১ জন, তদন্তকারী কর্মকর্তা-১ জন, ম্যাজিস্ট্রেট সাক্ষী-১ জন, বিশেষজ্ঞ সাক্ষী এআই-১ জন, ফরেনসিক সাক্ষী কণ্ঠস্বর-২ জন, ব্যালাস্টিক সাক্ষী-১ জন, ঘটনার প্রেক্ষাপট পটভূমির সাক্ষী-২, সমন্বয়ক-২, ওয়ারলেস মেসেজ সাক্ষী-১ জন।

সাক্ষী উপস্থাপন না করায় প্রসিকিউশনের প্রতি উষ্মা প্রকাশ করেন ট্রাইব্যুনাল-২: জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের সময় রংপুরে শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় করা মামলায় সাক্ষী উপস্থাপন না করায় প্রসিকিউশনের প্রতি অসন্তোষ উষ্মা প্রকাশ করেছেন বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। গতকাল এ মামলায় প্রসিকিউশনের ১২তম সাক্ষী উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য থাকলেও সাক্ষী উপস্থিত না করে সময় আবেদন করে। প্রসিকিউটর এস এম মইনুল করিম ট্রাইব্যুনালকে বলেন, সাক্ষী অসুস্থ থাকায় এবং অন্যান্য প্রসিকিউটররা ট্রাইব্যুনাল-১ এ অন্য মামলায় ব্যস্ত থাকায় সময় চাচ্ছি। আমরা ২০শে অক্টোবরের পর এই মামলার সাক্ষী উপস্থাপনের আর্জি জানাচ্ছি। এ সময় প্রসিকিউটরকে উদ্দেশ্য করে ট্রাইব্যুনাল বলেন, সাক্ষীর ব্যক্তিগত সমস্যার কথা কি লেখা যায়? আপনারা যা বলছেন, এটা কি বলতে পারেন? যদি কাজই করতে না পারেন, ব্যস্তই থাকেন, তাহলে দুটি ট্রাইব্যুনাল কেন করা হলো? আপনাদের বিরুদ্ধে কনটেম্পট প্রসিডিংস শুরু করা উচিত। ওখানে তো (ট্রাইব্যুনাল-১) যান শুধু টেলিভিশনে মুখ দেখাতে। পরে সাক্ষ্য উপস্থাপনের জন্য ২১শে অক্টোবর মামলার পরবর্তী তারিখ ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD