বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ০১:৪৫ পূর্বাহ্ন




ভারত জোর করে মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাচ্ছে: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬ ৯:১০ pm
এইচআরডব্লিউ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ Human Rights Watch hrw হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এইচআরডব্লিউ
file pic

বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর উদ্দেশ্যে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলিমদের জোরপূর্বক বহিষ্কার করছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ- এমন গুরুতর অভিযোগ তুলেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটি বলছে, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ’র কর্মকাণ্ড ও বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি’র বাধার কারণে বহু পরিবার বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ‘জিরো লাইন’-এ আটকে পড়ছে।

এইচআরডব্লিউর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জোরপূর্বক বহিষ্কারের শিকার ব্যক্তিদের বেশিরভাগই ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জাতিগত বাঙালি বাসিন্দা ও তাদের অধিকাংশই মুসলিম। তাদের বিরুদ্ধে কোনো মৌলিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে এইচআরডব্লিউ।

১ জুন থেকে ২০০ জনেরও বেশি মানুষকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা

বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে বিএসএফ ২১টি পৃথক প্রচেষ্টায় ২০০ জনেরও বেশি মানুষকে, যাদের মধ্যে শিশুরাও রয়েছে, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেছে। তবে বিজিবি এসব প্রচেষ্টা প্রতিহত করেছে।

পশ্চিমবঙ্গে মার্চ মাসের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে বিজেপি। আর এই সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হন শুভেন্দু অধিকারী।

এই নেতার দাবি, তার সরকারের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির আওতায় শত শত কথিত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’কে আটক করা হয়েছে এবং প্রায় ৫ হাজার জনকে ‘ফিরিয়ে দেওয়া’ হয়েছে।

এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মিনাক্ষী গাঙ্গুলী (Meenakshi Ganguly) বলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরিবারগুলোকে নির্মমভাবে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাচ্ছে অথবা সীমান্তে আটকে রাখছে, তাদের মৌলিক মানবাধিকারকে উপেক্ষা করে।

তিনি বলেন, ভারত সরকারের উচিত অবৈধ বহিষ্কার বন্ধ করা, যথাযথ আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা এবং মুসলিমদের প্রতি এই বৈরী মনোভাবের অবসান ঘটানো।

এইচআরডব্লিউ নয়জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তারা জানিয়েছেন, ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা গভীর রাতে দলবদ্ধ মানুষকে সীমান্তে নিয়ে আসে ও কাঁটাতারের বেড়ার কাটা অংশ দিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে দেয়।

বেশ কয়েকটি ঘটনায় বিজিবি তাদের প্রবেশে বাধা দিলে বিএসএফ পরে ওই ব্যক্তিদের আবার ভারতে ফিরিয়ে নেয়।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড় জেলায় ৫ জুন সংঘটিত একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল হোসেন (৩৫)।

তিনি বলেন, বিএসএফ শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। দলটি বাংলাদেশের ভেতরে প্রায় ৫০ ফুট প্রবেশ করেছিল। স্থানীয়রা বিষয়টি জানালে বিজিবি সদস্যরা সেখানে পৌঁছান।

রুবেল হোসেন বলেন, দেখে মনে হচ্ছিল যুদ্ধাবস্থার মতো পরিস্থিতি। বিএসএফ ও বিজিবি উভয় পক্ষের বড় ধরনের মোতায়েন ছিল।

তিনি জানান, প্রথম রাতে আটকে পড়া লোকজন বজ্রপাত ও ভারী বৃষ্টির মধ্যে খোলা আকাশের নিচে ছিল। দ্বিতীয় দিনে বিএসএফ তাদের কিছু শুকনো খাবার দেয়। একাধিক পতাকা বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর অবশেষে বিএসএফ দলটিকে ভারতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

নারী-শিশুসহ দুই পরিবারকে সীমান্তে ফেলে রাখা

৬ জুন ভোরে বিএসএফ দুই বাঙালি মুসলিম পরিবারের ছয় সদস্যকে- তিন পুরুষ, দুই নারী ও এক শিশুসহ বাংলাদেশের টেটুলবাড়িয়া সীমান্তের দিকে ঠেলে দেয়।

বিজিবি তাদের প্রবেশে বাধা দেয়। একই সঙ্গে বিএসএফও তাদের ভারতে ফিরতে দেয়নি। ফলে পরিবারগুলো সীমান্তে আটকা পড়ে যায় ও খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হয়। পরে ভারতীয় বাহিনী তাদের ফেরত যেতে অনুমতি দেয়।

গর্ভবতী নারী ও শিশুসহ ১১ জন ৪৮ ঘণ্টা আটক

৮ জুন বিজিবি জানায়, ঠাকুরগাঁও জেলার জিরো লাইনে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা আটকে থাকার পর বিএসএফ ১১ জনকে ফেরত নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে একজন গর্ভবতী নারী ও একটি শিশুও ছিল।

ভোটার তালিকা সংশোধনের পর শুরু হয় বিতর্ক

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মার্চের নির্বাচনের আগে ভারতের নির্বাচন কমিশন দ্রুত ও বিতর্কিতভাবে ভোটার তালিকা সংশোধন করে। এতে ৯০ লাখের বেশি মানুষের নাম বাদ পড়ে যায়।

এর ফলে বহু মানুষ আটক ও বহিষ্কারের আশঙ্কার মুখে পড়ে।

সংস্থাটি আরও উল্লেখ করেছে, ২০১৯ সালে আসামে নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ার ফলে ১৯ লাখের বেশি মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েছিল। বাংলা ভাষাভাষী বহু মানুষকে আটক কেন্দ্রে রাখা হয় এবং অনেককে অবৈধভাবে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

আসামেও এক অবস্থা

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা দীর্ঘদিন ধরে বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ বলে আখ্যা দিয়ে আসছেন।

সম্প্রতি তিনি বলেন, আমরা তাদের সীমান্তের কাছাকাছি সুবিধাজনক স্থানে নিয়ে যাই ও আক্ষরিক অর্থেই সীমান্ত পার করে ঠেলে দিই। এখন আসামে এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে যে অনেক বাংলাদেশি নিজেরাই ফিরে যেতে শুরু করেছে।

ভোট দিয়েছেন চারবার, তবুও ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে আটক

পঞ্চগড় সদর ইউনিয়নের সদস্য হাসিবুর ইসলাম জানান, তিনি পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি থেকে আসা একটি পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছেন।

পরিবারটির সদস্যরা দাবি করেন, তাদের আধার কার্ড ছিল। কিন্তু ভোটার তালিকা সংশোধনের পর তাদের নাম বাদ পড়ে যায়। এরপর পুলিশ তাদের আটক করে ও বিএসএফের হাতে তুলে দেয়।

হাসিবুর ইসলাম বলেন, পরিবারের সবচেয়ে বয়স্ক সদস্য চারবার ভোট দিয়েছেন। কিন্তু এ বছর তাদের কারও ভোট দেওয়ার সুযোগ হয়নি, কারণ ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল।

তিন দিন সীমান্তে আটকে থাকার পর পরিবারটিকে ভারতে ফিরে যেতে দেওয়া হয়।

ভারতের দাবি, অবৈধ বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে

ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, বহু বাংলাদেশি অবৈধভাবে ভারতে বসবাস করছে ও তাদের স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

তবে এইচআরডব্লিউ বলেছে, স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও কাউকে জোর করে ফেরত পাঠানো বা বহিষ্কার করা গ্রহণযোগ্য নয়।

সংস্থাটি আরও বলেছে, সাক্ষাৎকার দেওয়া কয়েকজন অভিযোগ করেছেন যে বহিষ্কারের আগে তাদের পরিচয়পত্র, অর্থ এবং ব্যক্তিগত মালামালও কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

আটককেন্দ্রে শত শত মানুষ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী এলাকায় শত শত কথিত বাংলাদেশি অভিবাসীকে আটককেন্দ্রে রাখা হয়েছে।

একজন ভারতীয় অধিকারকর্মীর মতে, সীমান্তবর্তী আটক কেন্দ্রগুলোতে প্রায় ৪০০ মানুষ আটক রয়েছে। তাদের অধিকাংশ মুসলিম হলেও কিছু হিন্দুও রয়েছেন। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পর অনেককে আটক করা হয়েছে।

তার ভাষায়, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া এখন গ্রেফতার, আটক ও বহিষ্কারের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ও এটি ব্যাপক ভয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ বলছে, আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে নেবে না

বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে, বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া সীমান্তে ঠেলে দেওয়া কাউকে গ্রহণ করা হবে না। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের মতে, নাগরিকত্ব যাচাই ও প্রতিষ্ঠিত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই যেকোনো প্রত্যাবর্তন সম্পন্ন হতে হবে।

আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ

এইচআরডব্লিউ বলছে, ভারত ‘নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি’ ও ‘সকল প্রকার বর্ণবৈষম্য নিরসন সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ’-এর অধীনে সবার অধিকার রক্ষা ও জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হওয়া প্রতিরোধে বাধ্য।

সংস্থাটি বলছে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক বা বহিষ্কার করা মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। একইসঙ্গে খাদ্য, পানি, আশ্রয় ও চিকিৎসা ছাড়া মানুষকে সীমান্তে ফেলে রাখা নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণের শামিল হতে পারে।

শিশুদের ক্ষেত্রেও অধিকার লঙ্ঘন

এইচআরডব্লিউর মতে, শিশুদের সীমান্তে আটকে রাখা বা বহিষ্কার করা ‘শিশু অধিকার সনদ’-এর পরিপন্থি।

এই সনদ অনুযায়ী, শিশুদের নাগরিকত্ব সংরক্ষণের অধিকার রয়েছে ও তাদের স্বাধীনতা স্বেচ্ছাচারীভাবে কেড়ে নেওয়া যায় না।

বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থাও উপেক্ষিত

সংস্থাটি বলেছে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নাগরিকত্ব যাচাই এবং নিজ নিজ নাগরিকদের সুশৃঙ্খলভাবে ফেরত পাঠানোর জন্য দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা রয়েছে।

কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এসব প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়ায় বহু মানুষ দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝখানে আটকা পড়ছে ও তাদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।

প্রতিবেদনের শেষে মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, জাতীয়তা যাই-ই হোক না কেন, কোনো মানুষই দুই সশস্ত্র সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝখানে খোলা মাঠে রাত কাটাতে বাধ্য হওয়া উচিত নয়। ভারতকে এই নিষ্ঠুর বহিষ্কারনীতি বন্ধ করতে হবে ও উভয় সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যেন সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নামে আর কখনও মানুষের মৌলিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন না হয়।

সূত্র: এইচআরডব্লিউ




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD