কয়েক বছর আগেও দেশের আমের সেরা জাত ছিল ফজলি, হিমসাগর, ল্যাংড়া কিংবা গোপালভোগ। সব হিসাব ওলট-পালট করে সেরার জায়গা দখল করেছে এখন আম্রপালি। জাতটি এখন আবাদ, রপ্তানি ও জনপ্রিয়তায় শীর্ষে।
গাজীপুরের বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উদ্ভাবিত এ বারি আম-৩ জাতটি ১৯৯৬ সালে চাষের জন্য সরবরাহ করা হয়, যা ২০০৯-১০ সাল থেকে বাজারে আম্রপালি নামে ব্যাপকতা পায়। মাত্র দেড় দশকের মধ্যেই এ জাতটি এখন সর্বোচ্চ চাষাবাদ হচ্ছে। উৎপাদন ও রপ্তানিতেও সর্বোচ্চ হিস্যা এ আমের। বাংলাদেশ থেকে যত আম রপ্তানি হচ্ছে, এর প্রায় ৮০ শতাংশ আম্রপালি জাতের।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক এক তথ্যে দেখা যায়, দেশে উৎপাদিত প্রধান জাতগুলোর মধ্যে আম্রপালি মোট জমির একাই এক-চতুর্থাংশ জায়গা দখল করেছে। তথ্য বলছে, দেশে গত বছর (২০২৫) দুই লাখ ৭ হাজার হেক্টর জমিতে আমের উৎপাদন হয়। এর মধ্যে বাণিজ্যিক চাষাবাদ হয়েছে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৪৬৬ হেক্টর জমিতে। আর একক জাত হিসেবে সবচেয়ে বেশি জমিতে চাষ হচ্ছে আম্রপালি, যা ৩৬ হাজার ৪২৫ হেক্টর।
অন্য জনপ্রিয় জাতগুলোর আবাদি জমির পরিমাণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ওই বছর আশ্বিনা ১৩ হাজার ১২১ হেক্টর, ফজলি ১১ হাজার ৭০২ হেক্টর, ল্যাংড়া ১১ হাজার ৬১৫ হেক্টর, খিরসাপাত ৮ হাজার ৮২৮ হেক্টর, গোপালভোগ ৭ হাজার ৪ হেক্টর ও হিমসাগর চাষ হয়েছে ৪ হাজার ৯৯৮ হেক্টর জমিতে।
অর্থাৎ, ঐতিহ্যবাহী ল্যাংড়া, ফজলি বা খিরসাপাতের চেয়ে বহুগুণ বেশি জমিতে এখন আম্রপালির চাষ হচ্ছে। এমনকি নতুন ও আকর্ষণীয় জাত যেমন কাটিমন, মল্লিকা, বানানা ম্যাঙ্গো, বারি আম-৪ এর তুলনায় আম্রপালির বিস্তৃতি কয়েকগুণ বেশি।
গবেষকদের মতে, দেশে ৭২টিরও বেশি জাতের আম আছে। যার ১৬ থেকে ১৮টি জাত বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হয়। তথ্য বলছে, গত বছর (২০২৫) বাংলাদেশ থেকে দুই হাজার ১৯৪ টন আম রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ রপ্তানি হয়েছে আম্রপালি জাত।
কেন, কীভাবে এই রাজত্ব?
চাষি ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, আম্রপালি গাছের গঠন ছোট হওয়ায় প্রতি হেক্টরে বেশি সংখ্যক গাছ রোপণ করা যায়। এছাড়া এই জাতের আম নিয়মিত ফলন দেয় এবং এর রোগবালাই সহ্য করার ক্ষমতা অন্য জাতের চেয়ে তুলনামূলক বেশি।
এছাড়া এ আমের সংরক্ষণকাল বেশি। পাকা আম বেশিদিন ভালো থাকে। ক্রেতাদের কাছে এর তীব্র মিষ্টি স্বাদ ও চমৎকার সুবাসের কারণে বাজারে এর চাহিদাও তুঙ্গে। ফলে চাষিরা এই আম চাষে বেশি লাভবান হচ্ছেন।
ফলে একসময় আমের রাজধানী বলতে কেবল রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জকে বোঝানো হলেও, আম্রপালির হাত ধরে এখন নওগাঁসহ দেশের পার্বত্য জেলায়ও আমের ব্যাপক বাণিজ্যিক উৎপাদন হচ্ছে। ওইসব এলাকা ছাড়াও ৩০ জেলায় বাণিজ্যিক চাষাবাদ হচ্ছে। গত এক দশকে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বেড়েছে এই জাতের আম চাষ।
আম্রপালি আমআম্রপালি আম
বারির উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘মূলত তিনটি কারণে এ আম এখন সবচেয়ে এগিয়ে। এর মধ্যে প্রথমটি জনপ্রিয়তা। এ আম খুব দ্রুত সময়ে জনপ্রিয় হয়েছে মানুষের মধ্যে। দ্বিতীয়ত, এটি দীর্ঘদিন স্বাভাবিকভাবে ভালো রাখা যায়, সহজে পচে না। এমনিতেই ১৩-১৪ দিন ভালো থাকে।’
আর শেষ কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আমের মিষ্টতা। আম্রপালির মিষ্টির মাত্রা প্রায় ২৬ শতাংশ, যা সব আমের মধ্যে সর্বোচ্চ।
হংকং গেলো চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম
রপ্তানি নিয়ে কাজ করা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আম্রপালি আম রপ্তানি প্রতিবছর বাড়ছে। প্রতি বছর যা আম রপ্তানি হয় তার প্রায় ৭৫-৮০ শতাংশ আম্রপালি জাতের।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের আম বিদেশি এথেনিক মার্কেটে জনপ্রিয়। এ আম সুস্বাদু ও বেশিদিন ভালো থাকে, যা রপ্তানির জন্য উপযোগী।’
নওগাঁর সাপাহার উপজেলার কৃষক মুনির হোসেন বলেন, ‘আমাদের এখানে আমের বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয় আম্রপালি জাতের মাধ্যমে। এ আম চাষে ভালো লাভ হয়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। গাছ ছোট বলে অল্প জায়গায় ভালো ফলন পাওয়া যায়।’
তিনি বলেন, ‘জনপ্রিয়তার কারণে এ আমের দামও ভালো থাকে প্রতি বছর। আম্রপালি একটি হাইব্রিড জাত, যা রোপণের দ্বিতীয় বছর থেকেই ফল পাওয়া যায়।’