বিশ্বকাপজুড়ে রেফারিং ও ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) নিয়ে ধারাবাহিক বিতর্কের পর বড় পরিবর্তন এনেছে ফিফা। টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বাকি সব ম্যাচে স্টেডিয়ামের ভেতরেও একজন রিজার্ভ ভিএআর কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। মূল ভিএআর কার্যক্রম আগের মতোই যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ডালাসে অবস্থিত আন্তর্জাতিক সম্প্রচার কেন্দ্রের (আইবিসি) কেন্দ্রীয় ভিএআর হাব থেকে পরিচালিত হবে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ফ্রান্স ও মরক্কোর কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ থেকেই নতুন এই ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে। ফিফার দাবি, ডালাসের ভিএআর হাব ও স্টেডিয়ামের মধ্যে যোগাযোগে কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিলে মাঠে থাকা রিজার্ভ ভিএআর কর্মকর্তা তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্ব নিয়ে ম্যাচ পরিচালনায় সহায়তা করবেন। ফলে প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে খেলা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা অনেকটাই কমে যাবে।
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর কয়েকটি ম্যাচের পর থেকেই ভিএআর নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার ৩-২ গোলে মিশরকে হারানো ম্যাচে কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। ম্যাচ শেষে মিশরের প্রধান কোচ হোসাম হাসান অভিযোগ করেন, রেফারিংয়ে তাদের প্রতি অবিচার করা হয়েছে এবং আর্জেন্টিনাকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। একই ধরনের অসন্তোষ প্রকাশ করেন মিশরের উইঙ্গার মোস্তফা জিকোও।
অন্যদিকে সহ-আয়োজক মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচে ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার জ্যারেল কোয়ানসাহর লাল কার্ডের ঘটনায় ম্যাচ পরিচালনার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেল। তার মতে, রেফারিংয়ে ধারাবাহিকতার অভাব রয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আরও নির্ভুল হওয়া প্রয়োজন।
তবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন ফিফার রেফারিং প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনা। তিনি বলেন, ফিফার ম্যাচ কর্মকর্তারা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তাদের সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রভাবাধীন নয়। এমনকি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোরও রেফারিং সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব নেই। কলিনার মতে, ম্যাচ কর্মকর্তাদের সততা নিয়ে ভিত্তিহীন অভিযোগ তাদের ও তাদের পরিবারের জন্য অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি তৈরি করে।
দ্য সানের খবরে বলা হয়, কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম ম্যাচে ফ্রান্স ও মরক্কোর খেলায় মূল ভিএআর কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন আর্জেন্টিনার হারনান মাস্ত্রানগেলো। স্টেডিয়ামে রিজার্ভ ভিএআর ছিলেন নিকারাগুয়ার তাতিয়ানা গুজমান। ম্যাচের প্রধান রেফারি আর্জেন্টিনার ফাকুন্দো তেলো। তাকে সহায়তা করছেন স্বদেশি সহকারী রেফারি হুয়ান পাবলো বেলাত্তি ও গ্যাব্রিয়েল শাদে।
এবারের বিশ্বকাপে ভিএআরের ব্যবহারও আগের চেয়ে আধুনিক করা হয়েছে। শুধু গোল, পেনাল্টি বা সরাসরি লাল কার্ড নয়, ভুলভাবে দেওয়া কর্নার বা ফ্রি-কিক, দ্বিতীয় হলুদ কার্ড থেকে লাল কার্ডের পরিস্থিতি, ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়া এবং বল পুনরায় খেলায় ফেরার আগে আক্রমণভাগের ফাউলের ঘটনাও এখন ভিএআরের মাধ্যমে পর্যালোচনা করা যাবে।
প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের পাশাপাশি চলতি বিশ্বকাপে আরও কয়েকটি নতুন নিয়ম চালু করেছে ফিফা। সময় নষ্ট কমাতে বদলি হওয়া খেলোয়াড়কে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে মাঠ ছাড়তে হবে। অযথা দেরি করলে বদলি খেলোয়াড় পরবর্তী খেলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত মাঠে নামতে পারবেন না এবং ওই সময় দলকে ১০ জন নিয়েই খেলতে হবে।
থ্রো-ইন ও গোল কিকেও কঠোর হয়েছে ফিফা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বল খেলায় না আনলে থ্রো-ইনের অধিকার প্রতিপক্ষ পাবে, আর গোল কিক বিলম্বিত হলে প্রতিপক্ষকে কর্নার দেওয়া হবে।
মাঠের বাইরে চিকিৎসা নেওয়া কোনো খেলোয়াড়কে অন্তত এক মিনিট মাঠের বাইরে থাকতে হবে। এ সময় তার দলকে একজন কম নিয়ে খেলতে হবে।
শৃঙ্খলা বজায় রাখতেও নতুন বিধান যুক্ত হয়েছে। কোনো সংঘর্ষ বা বিতর্কের সময় মুখ ঢেকে কথা বললে সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়কে লাল কার্ড দেখানো হবে। একইভাবে রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে মাঠ ত্যাগ করলে সরাসরি লাল কার্ড দেওয়া হবে। আর কোনো দল মাঠ ছেড়ে ম্যাচ পরিত্যাগ করলে সেই দলকে পরাজিত হিসেবে গণ্য করা হবে।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব যত এগোচ্ছে, ততই ম্যাচ পরিচালনা নিয়ে বিতর্ক কমিয়ে আনতে এবং প্রযুক্তিগত নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে ফিফা এই পরিবর্তনগুলো কার্যকর করেছে। সংস্থাটির আশা, নতুন ভিএআর ব্যবস্থা এবং সংশোধিত নিয়মগুলো টুর্নামেন্টের বাকি ম্যাচগুলোতে রেফারিং নিয়ে বিতর্ক কমিয়ে ফুটবলের দিকেই সবার মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়ক হবে।