জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেছেন, দেশের ব্যাংকিং খাত চরম দুর্বল ও ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছেছে। অধিকাংশ ব্যাংক ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। রাজনৈতিক প্রভাব ও অলিগার্কদের স্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রের ভূমিকার পরিবর্তন না হলে অর্থনীতির সংকট আরও গভীর হতে পারে। তিনি বলেন, ‘অর্থনীতি এবার লাইনচ্যুত হয়েছে। ভবিষ্যতে শুধু লাইনচ্যুত হবে না, হয়তো নদীতে গিয়ে পড়বে। তাই অলিগার্কদের বিষয়ে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকা উচিত।’
বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) দুই দিনব্যাপী বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের শেষ দিনের প্রথম অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরে মাহবুব উল্লাহ বলেন, অনিয়মের কারণে ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা ব্যাপকভাবে কমেছে। বাজারের নিয়ম অনুসরণ করা হলে দুর্বল ব্যাংকগুলোর অনেকগুলোই এত দিনে বিলুপ্ত হয়ে যেত। কিন্তু নানা উপায়ে সেগুলো টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তার মতে, ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সংকট এখন আস্থার অভাব। তবে কয়েকটি ব্যাংক এখনো ভালোভাবে পরিচালিত হচ্ছে। সেগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পুরো খাতের উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং খাত এখন অনেকটাই সরকারমুখী হয়ে পড়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে যথেষ্ট মনোযোগ না থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারের ঋণের বোঝা বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে পরিশোধের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
মাহবুব উল্লাহ বলেন, ক্ষমতাসীনরা দীর্ঘদিন রাষ্ট্রকে জনগণের সম্পদ হিসেবে না দেখে ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যের মতো ব্যবহার করেছেন। নিজেদের সমর্থক, আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের সুবিধা দেয়াই হয়ে উঠেছে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম সমস্যা। রাষ্ট্রের এই চরিত্র বদলে সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা না গেলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। ব্যাংক খাতে বিপরীতমুখী চাপসম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক বরকত-এ-খোদা। তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে একদিকে কিছু দুর্বল ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক তারল্যসংকটে ভুগছে, অন্যদিকে পুরো খাতে অলস তারল্য রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তার উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংক খাতে অলস তারল্যের পরিমাণ ৪ ট্রিলিয়ন টাকা ছাড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৯ শতাংশ বেশি।বরকত-এ-খোদা বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল সুশাসন, নমনীয় ঋণনীতি ও বারবার ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগের কারণে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ধীরগতিও ব্যাংকিং খাতের সংকটকে জটিল করেছে। তিনি আরও জানান, ভুয়া ঋণ ও দুর্নীতির মাধ্যমে আনুমানিক পাঁচ লাখ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মাধ্যমে আড়াই থেকে তিন লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগও তুলে ধরেন তিনি।
ব্যাংকের পরিচালক, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের যোগসাজশে ঋণনীতি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সুযোগ নেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন এই অর্থনীতিবিদ। অধিবেশনে স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইবিএমের অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিব।