শনিবার, ১৩ জুলাই ২০২৪, ০১:০৪ পূর্বাহ্ন




অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৫ বছরে সরকারের ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা

আউটলুকবাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ২৩ জানুয়ারী, ২০২৩ ১:১৬ pm
money laundering illegal process money generated criminal drug trafficking terrorist funding illegally concealing illicit drug trafficking corruption embezzlement gambling converting legitimate source crime jurisdictions আমদানি ওভার ইনভয়েসিং রপ্তানি আন্ডার-ইনভয়েসিং আমদানি-রপ্তানি অবৈধ জাল অর্থ পাচার জিএফআই মানি লন্ডারিং আর্থিক খাত গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বিএফআইইউ হুন্ডি অর্থ পাচার Per capita income মাথাপিছু আয় Reserves Reserve রিজার্ভ remittance রেমিট্যান্স প্রবাসী আয় ডলার dollar Pagla Mosque পাগলা মসজিদ কোটি টাকা Pagla Mosque পাগলা মসজিদ কোটি টাকা
file pic

ব্যাংকসহ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের ঋণ বেড়েই চলেছে। শুধু গত পাঁচ বছরেই এ খাত থেকে ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে ঋণ বেড়েছে ১২৪ শতাংশ। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষেও অভ্যন্তরীণ খাত থেকে সরকারের মোট ঋণ ছিল ৩ লাখ ২০ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। ২০২২ সাল শেষে তা ৭ লাখ ১৭ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাত, সঞ্চয়পত্রসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে জনগণের কাছ থেকে এ ঋণ নিয়েছে সরকার।

সরকার প্রতি বছরই বিপুল অংকের ঘাটতি রেখে বাজেট ঘোষণা করছে। চলতি অর্থবছরেও ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৪ কোটি টাকার বাজেট ঘাটতি দেখানো হয়েছে, যা মোট বাজেটের ৩৬ শতাংশ। রেকর্ড এ বাজেট ঘাটতি পূরণ করতেই দেশী-বিদেশী উৎস থেকে ঋণ বাড়ছে। চলতি অর্থবছরেও সরকার দেশের ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। তবে এ পরিমাণ ঋণ দেয়ার সক্ষমতা নেই দেশের ব্যাংক খাতের। তাই ব্যাংকগুলোর কাছে ট্রেজারি বিল-বন্ড বিক্রি না করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই এ ঋণের জোগান দিয়ে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারের নেয়া ঋণের পরিমাণ বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে। গত পাঁচ বছরেই এ ঋণ বেড়েছে ৯২৭ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৭ সাল শেষে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারকে দেয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা। ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে তা ১ লাখ ২১ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ হিসাবে পাঁচ বছরের ব্যবধানে ৯২৭ শতাংশ বেড়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ২০১৭ সালে সরকারের নেয়া ঋণের স্থিতি ছিল ৭০ হাজার ৭ কোটি টাকা। গত বছর শেষে এ ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৮০ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। সে হিসাবে পাঁচ বছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ বেড়েছে ১৫৮ শতাংশ। আর সঞ্চয়পত্র বিক্রিসহ অন্যান্য খাত থেকে এ সময়ে নেয়া ঋণ ৭৪ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৭ সালের নভেম্বরে এ উৎসগুলো থেকে সরকারের নেয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৩৮ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা। গত বছরের নভেম্বরে জনগণের কাছ থেকে সরাসরি নেয়া ঋণের পরিমাণ ৪ লাখ ১৪ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাবদ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬২ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা।

রাজস্ব আহরণে ব্যর্থতার কারণে সরকারের ঋণের পরিমাণ বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, রাজস্ব আহরণে ব্যর্থতায় ঘাটতি বাজেটের আকার প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এটার আকার যত বড় হবে সরকারের ঋণও তত বাড়বে। মুদ্রাবাজারে তারল্য সংকটের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই এখন সরকারকে ঋণ দিচ্ছে। এর মানে হলো সম্পদ সৃষ্টি না হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন টাকা ছাপাচ্ছে। এ পরিস্থিতি চলমান থাকলে দেশের মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখিতা থামবে না। আবার অর্থনীতির ভিতও নাজুক পরিস্থিতিতে পড়বে।

অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই সরকারকে ঋণ দেয়ার মানে হলো নতুন টাকা ছাপানো। ব্যাংক খাতে পর্যাপ্ত তারল্য নেই। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারকে ঋণ দিচ্ছে। আমরা জানি, সরকারের চলতি হিসাব ঘাটতি থাকলে নতুন টাকা ছাপানো যায় না। সরকারের চলতি হিসাবে এখন বিপুল ঘাটতি। এ অবস্থায় হিসাবশাস্ত্রের কোন তত্ত্ব ব্যবহার করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারকে ঋণ দেয়ার পাশাপাশি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করছে সেটি বোধগম্য নয়।’

আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, রাজস্ব আহরণে সরকারের ব্যর্থতার কারণেই প্রতি বছর ঘাটতি বাজেটের পরিমাণ বাড়ছে। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের কোনো দেশই এত কম রাজস্ব আয় দিয়ে চলে না। বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি বাড়ানো সম্ভব না হলে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশী উৎস থেকে সরকারের ঋণ বাড়বেই। রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত অন্তত ২০-২২ শতাংশে উন্নীত করতে না পারলে সংকটের কোনো সমাধান হবে না।’

এক যুগ আগে ২০১০ সালে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের নেয়া মোট ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ১ লাখ ১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। পাঁচ বছর পর ২০১৫ সালে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ ২১ হাজার ৯২৩ কোটি টাকায়। অভ্যন্তরীণ উৎসের সে ঋণই এখন ৭ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ঋণের পরিমাণ বাড়ায় দেশের জিডিপি-ঋণ অনুপাতও বাড়ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশের জিডিপির অনুপাতে সরকারের ঋণ ছিল ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে ২০২০-২১ অর্থবছরে এ অনুপাত ৪১ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপি ও সরকারের ঋণের অনুপাত ৪২ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

বহুজাতিক সংস্থাটির তথ্য বলছে, গত অর্থবছর শেষে বাংলাদেশ সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। প্রতি ডলারের মূল্য ১০০ টাকা ধরলে বাংলাদেশী মুদ্রায় সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। বিপুল এ ঋণের ৫৮ শতাংশ দেশের অভ্যন্তরীণ খাত থেকে নেয়া হয়েছে। বাকি ঋণ এসেছে বিদেশী উৎস থেকে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর শেষে বহুজাতিক বিভিন্ন সংস্থাসহ বিদেশী উৎস থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৭ বিলিয়ন ডলার। বিদেশী উৎসের এ ঋণ বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ১৮ শতাংশ।

প্রত্যাশা অনুযায়ী আয় বাড়াতে না পারলেও প্রতি বছরই বাজেটে ব্যয়ের খাত বাড়াচ্ছে সরকার। এতে বাজেটের আকার বড় হওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভারী হচ্ছে ঘাটতির পরিমাণ। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও এ বাজেটের ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৪ কোটি টাকাই রাখা হয়েছে ঘাটতি বাজেটের খাতায়। বিপুল অংকের এ ঘাটতি পূরণের জন্য বিদেশী উৎস থেকে ১ লাখ ১২ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। বাকি ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা ব্যাংকসহ দেশের অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

কর মওকুফের সংস্কৃতি থেকে বেরোতে না পারলে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে না বলে মনে করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ। তিনি বলেন, ‘সরকারি-বেসরকারি বড় বড় প্রকল্পে কর মওকুফ করা হচ্ছে। এটি করা হচ্ছে বিশেষ শ্রেণীর ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেয়ার জন্য। এ কারণে জিডিপির আকার বাড়লেও সরকারের রাজস্ব বাড়ছে না। ব্যাংক খাতে তারল্য নেই, এ অজুহাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারকে ঋণ দিচ্ছে। এর আক্ষরিক অর্থ হলো নতুন টাকা ছাপানো হচ্ছে। এভাবে টাকা ছাপিয়ে দেয়া ঋণ সরকার কীভাবে পরিশোধ করবে, সে বিষয়ে কোনো রূপরেখা নেই। সরকার এখনো যেভাবে মেগা প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে, তাতে বাজেট ঘাটতি কমারও কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের প্রধান দায়িত্ব হবে অপরিহার্য নয় এমন সব কাজ ও প্রকল্প থেকে বিরত থাকা।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক অবশ্য বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতির হাতিয়ার ব্যবহার করেই সরকারকে ঋণের জোগান দিয়েছে। এক্ষেত্রে অর্থনীতি কিংবা হিসাবশাস্ত্রের কোনো রীতিই ভঙ্গ হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘ঋণপত্রের দায় পরিশোধের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করেছে। এর মাধ্যমে বাজার থেকে ১ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চলে এসেছে। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলোর কাছে সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ড বিক্রি করা হলে তারল্য পরিস্থিতি আরো খারাপ হতো। উঠে আসা তারল্য থেকেই সরকারকে ঋণ দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আবার বাজারে অর্থপ্রবাহ বাড়াতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে।’ [বণিক বার্তা]




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD