প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিশাঞ্চলে পানীয় জলের অভাব তীব্র আকার ধারণ করেছে। দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে নারীরা বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে এ অঞ্চলের মানুষ বিশেষ করে নারীদের বিপদাপন্নতা বেড়েছে। এর ফলে মোংলায় ৮০% এবং শ্যামনগরে ৭০% পরিবার স্থানান্তরণের সংঙ্কায় রয়েছেন
বৃস্পতিবার রাজধানী একটি হোটেলে সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিপিআরডি) উদ্যোগে এবং ব্র্যাড ফর দি ওয়ার্ল্ড, ডিয়াকোনিয়া ও এইচইকেএস/ইপিইআর’র সহযোগিতায় জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে দেশের দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের বিপদাপন্নতা অনুসন্ধানে পরিচালিত গবেষণা ফলাফল প্রকাশ করা হয়। গবেষণা থেকে এই চিত্র উঠে এসেছে। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে দেশের দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের বাগেরহাট জেলার মোংলা উপজেলায় এবং সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলায়। একটি মিশ্র গবেষণা পদ্ধতি (প্রশ্নপত্র সমীক্ষা, এফজিডি, কেইস এবং সেকেন্ডারি ডাটা) ব্যবহার করা হয়েছে গবেষণাটিতে।
গবেষণা ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিপিআরডি’র নির্বাহী প্রধান মো. শামছুদ্দোহা, প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়াম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহম্মেদ। এ ছাড়া আলোচনা করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন-এর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, ইউএনডিপির সহাকরি আবাসিক প্রতিনিধি মিস্টার প্রসেনজিৎ চাকমা, ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অফ পাবলিক হেলথ-এর ডিন, প্রফেসর ড. সাবিনা ফায়েজ রশীদ।
সভায় আলোচনা করেন দিলরুবা হায়দার, প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট, ইউএন উইমেন, মাহফুজা আক্তার মালা, জিবিভি এক্সপার্ট, খোদেজা সুলতানা লোপা, কান্ট্রি ম্যানেজার দিয়াকোনিয়া, গওহার নঈম ওয়ারা সদস্য সচিব, ডিএফ, ধারা চৌধুরী কান্ট্রি ডিরেক্টর, এইচইকেএস/ইপিআ, সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের প্রতিনিধি শিরিন লীরা। সভায় গবেষণা ফলাফল উপস্থাপন করেন সিপিআরডির প্রজেক্ট সমন্বয়ক মো. আকিব জাবেদ এবং রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি অফিসার নাজনীন সুলতানা। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মর্কতা কর্মচারীবৃন্দ উপস্থিত থেকে মতামত ব্যক্ত করেন।
গবেষণায় বলা হয়, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিশাঞ্চলে পানীয় জলের অভাব তীব্র আকার ধারণ করায় দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে নারীরা বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন, এর মধ্যে প্রতিবেশী কর্তৃক খারাপ ব্যবহার (মোংলা অঞ্চলে ৫৭.৮% এবং শ্যামনগর অঞ্চলে ৭৬%), ইভটিজিং (উভয় এলাকায় ১০%), শারীরিকভাবে আহত হওয়া (দুই উপজেলায় ৭০% এর সমান্য কম) উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘ সময় ধরে লবণাক্ততার সংস্পর্শে আছেন বা ছিলেন এমন নারীদের প্রায় সবাই স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এসব নারীদের মধ্যে একটি বড় অংশ প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন (৬৪% মোংলায় এবং ৫৪% শ্যামনগরে)।
সমীক্ষায় জানানো হয়, আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে পানির সমস্যা, স্যানিটেশনের সমস্যায় (টয়লেট, স্যানিটারি ন্যাপকিন) ভুগে থাকেন মোংলায় ৪১% নারী এবং শ্যামনগরে ৩১% নারী এবং এর ফলে অনেক নারী আশ্রয়কেন্দ্রের ভেতরে মাসিক ঋতু-চক্রের ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত জটিলতায়ও ভুগেছেন। শ্যামনগর এবং মোংলা অঞ্চলের ৯০% নারী জীবনে অন্তত একবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তাদের গৃহ হারিয়েছেন অথবা ক্ষয়-ক্ষতির শিকার হয়েছেন।
বর্তমানে মোংলার ৮০% পরিবার এবং শ্যামনগরের ৭০% পরিবার স্থানান্তরণের সংঙ্কায় রয়েছেন। মোংলা অঞ্চলের ৯২.৩% অংশগ্রহণকারী এবং শ্যামনগর অঞ্চলের ৯৪% অংশগ্রহণকারী বলেছেন, তাদের অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেই স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশুদের হার আশঙ্কাজনক, মোংলায় ৫৬.৬% পরিবারের শিশুরা স্কুল থেকে ঝরে পড়ে এবং শ্যামনগরে সেটি ৭২.৮%। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত এসকল নারীরা সরকারি বেসরকারি সহযোগিতা নিতে হলে স্থানীয় প্রভাবশালীদের টাকা প্রদান করতে বাধ্য হন। মাঠ পর্যায়ে নারীদের কর্তৃক এক থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত স্থানীয় প্রভাবশালীদের দেয়ার তথ্য পাওয়া গেছে গবেষণাটিতে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়াম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশে বিভিন্ন সংকট তৈরি হচ্ছে। দুর্যোগগুলো কখনোই ভীতিকর হয়ে উঠবে না যদি আমরা দুর্যোগের অভিঘাতের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে পারি এবং দুর্যোগ ব্যপস্থাপনাকে মজবুত করতে পারি।
শাহীন আনাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন দেশের সর্বত্র নারীদের বিপদাপন্ন করে তুলছে। গবেষণায় এবং নীতি প্রণয়নে এই বিষয়গুলোকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।