দীর্ঘ একটি বছর ঘুরে মাহে রমাদান আসবে, আবার চলে যাবে, এটাই নিয়ম। আল্লাহ তা’আলা যাদের তাওফিক দিয়েছেন, তারাই মাহে রমাদানের সিয়াম পালন করেছেন। তবে মাহে রমাদানের রোজা পালনেই শুধু দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। রমাদান-পরবর্তী ১১টি মাসে রয়েছে মু’মিনের অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য। এসবের আলোকে আমাদের জীবন সাজাতে হবে। এইসব দায়িত্বের অন্যতম হলো-
মাহে রমাদান-পরবর্তী আমাদের জীবনযাপন:
রমাদানের আগমন ও প্রস্থানে মানুষের সঙ্গে বেশ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কোনো পরিবারে যখন কেউ আগমন করে, তখন তার পরিবার খুশি হয়। তেমনিভাবে রমাদানের আগমনে মু’মিনরা আনন্দিত হন। আবার যখন কোনো মানুষ দুনইয়া থেকে চলে যান, তখন তার জন্য জীবিতরা কাঁদতে থাকে। তেমনিভাবে রমাদানের প্রস্থানে মু’মিনরা কাঁদতে থাকেন।
নিজের আমল নিজে নষ্ট করা চলবে না:
রমাদান মাসে মু’মিন-মুসলিমরা সিয়াম পালনের পাশাপাশি তারাবি আদায়, জিকির-আজকার, কুরআন তিলাওয়াতসহ বিভিন্ন সৎ আমলে ব্যস্ত থাকেন। গোনাহের কাজ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেন। কিন্তু রমাদান মাস চলে গেলে অনেকেই এসব আমল থেকে দূরে সরে যায়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘তোমরা কখনো সেই নারীর মতো হয়ো না, যে অনেক পরিশ্রম করে নিজের জন্য কিছু সুতা কাটল, কিন্তু পরে তা নিজেই টুকরো টুকরো ছিঁড়ে ফেলল…।’
(সূরা আন নাহল : ৯২)
বালাম বাউরার মতো না হওয়া:
বালাম বিন বাউরার নাম অনেকেই জানি। তিনি বনি ইসরায়েলের একজন বিখ্যাত বুজুর্গ। সে ঈমানের স্বাদ গ্রহণ করেছিল, কিন্তু পরে আবার আগের পথে ফিরে যায়। সে হিদায়েতের বিনিময়ে ভ্রষ্টতা ও মাগফিরাতের বদলায় আজাব ক্রয় করে। তার ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, ‘(হে মুহাম্মদ! সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তুমি তাদের কাছে (এমন) আপনি মানুষের কাহীনি (পড়ে) শোনান, যার কাছে আমি (নবীর মাধ্যমে) আমার আয়াতসমূহ নাজিল করেছিলাম, সে তা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে, অতঃপর শয়তান তার পিছু নেয় এবং সে সম্পূর্ণ গোমরাহ লোকদের দলভুক্ত হয়ে পড়ে।’
(সূরা আল আরাফ : ১৭৫)
ইবলিস শয়তানকে ভয় করা:
রমাদান মাসের পর শয়তানকে আবার আগের মতো ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু শয়তানের ষড়যন্ত্র দুর্বল- যেমনটি আল্লাহ আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। যে আল্লাহকে আঁকড়ে ধরবে, আল্লাহ তাকে শয়তানের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করবেন। শয়তানের লক্ষ্য হলো মানুষকে জাহান্নামে প্রবেশ করানো, গোনাহের কাজে জড়ানো। এসব মানুষের দোজখে প্রবেশের হাতিয়ার। তাই শয়তান সর্বদা চায়, মু’মিনদের রমাদানের আমলগুলো কীভাবে ধ্বংস করা যায়। কিন্তু শয়তানের এমন ফাঁদে পা দেওয়া চলবে না।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘শয়তান হচ্ছে তোমাদের শত্রু, অতএব তোমরা তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ করো; সে তার দলবলদের এ জন্যই আহ্বান করে যেন তারা (তার আনুগত্য করে) জাহান্নামের বাসিন্দা হয়ে যেতে পারে।’
(সূরা ফাতির : ৬)
সলাত ও সলাতের জামাত পরিত্যাগ না করা:
রমাদানের মাসে প্রায় মুসলিই জামাতের সঙ্গে সলাত আদায় করেন। রমাদানের পরও এই উত্তম অভ্যাসটি ধরে রাখতে হবে। কেননা সলাত হচ্ছে জীবন ও মরণে আলো। সলাত পরিবার ও সম্পত্তিতে বরকত হিসেবে কাজ করে। যার সলাত ঠিক, তার সব আমল ঠিক। সলাত প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সলাতের ওপর (গভীরভাবে) যত্নবান হও, (বিশেষ করে) মধ্যবর্তী সলাতের এবং তোমরা আল্লাহর জন্য বিনীতভাবে দাঁড়িয়ে যাও।’
(সূরা বাকারা : ২৩৮)
কুরআন তিলাওয়াত পরিত্যাগ না করা:
যারা শুধু রমাদানে কুরআন তিলাওয়াত করে আর বাকি বছর তা পরিত্যাগ করে- তাদের দলভুক্ত হওয়া চলবে না। নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে। প্রত্যেকের উচিত হলো- দিনের কোনো একটি সময় নির্দিষ্ট করা, যে সময়ে কম করে হলেও ১ পৃষ্ঠা কুরআন তিলাওয়াত করা যায়।
আল্লাহর জিকির অধিক পরিমাণে করা:
রমাদানের পরও অধিক হারে জিকির করতে হবে। জিকিরের মাধ্যমে সর্বদা জিহ্বাকে সিক্ত রাখতে হবে।
দরুদ শরিফ অধিক পরিমাণে করা:
সকাল-সন্ধ্যায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ করতে হবে। বিভিন্ন কাজের শুরুতে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা দেওয়া দু’আগুলো পাঠ করে কাজ শুরু করতে হবে।
সৎসঙ্গ গ্রহণ করা:
প্রত্যেক মানুষের কর্তব্য হলো- এমন বন্ধু গ্রহণ করা, যে সৎ কাজে এবং আল্লাহর আনুগত্যের পথে সাহায্য করবে। সুতরাং মু’মিনের উচিত এমন সাথি গ্রহণ করা, যে অন্যায় পথ থেকে, পাপের রাস্তা থেকে সতর্ক করে সঠিক পথের দিকে আহ্বান করবে।
শাওয়াল মাসের রোজা পালন করা:
রমাদান মাসের পর শাওয়াল মাসের রোজা পালনের ফজিলতের কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। হজরত আবু আইয়ুব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি রমাদান মাসে সিয়াম পালন করল তারপর শাওয়াল মাসের ৬টি রোজা পালন করল, তাহলে সে পুরো বছর রোজা পালন করল।’
(সহিহ মুসলিম)
মাহে রমাদানের শিক্ষা সারা বছর কাজে লাগাতে হবে। যে ভালো আমল করবে, সে ভালো ফল পাবে। আর যে মন্দ আমল করবে, সে মন্দ পরিণাম ভোগ করবে। আল্লাহ তা’আলা প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হুকুম অনুযায়ী আমাদের আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
-মুফতি মোহাম্মদ এহছানুল হক মুজাদ্দেদী
IFM desk