তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতি মানবজাতির যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। আজ বিশ্ব যেন হাতের মুঠোয়—যেখানে দূরের মানুষও যেন খুব কাছের। এই প্রযুক্তির সুফল সমাজে গতিশীলতা ও জ্ঞানের প্রসার ঘটালেও, এর অপব্যবহার মানবিকতা ও নৈতিকতার এক গভীর সংকটে ফেলে দিয়েছে।
তথ্যের অবাধ প্রবাহ কখনো কখনো সত্যকে ম্লান করে দেয় মিথ্যার অতিচমকে। ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সমাজ যখন অসত উদ্দেশ্যে গুজব ছড়ায়, তখন তা শুধু ভুল বোঝাবুঝিই নয়—অরাজকতা, আতঙ্ক ও দ্বন্দ্বেরও জন্ম দেয়। এমন বিভ্রান্তি কখনো ব্যক্তি জীবনে, কখনো জাতীয় পর্যায়ে চরম বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ইসলাম সত্য, সুন্দরের ধর্ম। এই ধর্মে প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি কাজের জবাবদিহিতার চেতনা রয়েছে। গুজব ছড়ানো মানেই মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া, যা ইসলাম কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “যে চুপ থাকে, সে নিরাপদ থাকে।”
(তিরমিজি: ২৫০১)
গুজব কখনো হাস্যরসের ছলে, আবার কখনো আতঙ্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ছড়ানো হয়। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে—কারণ যাই হোক না কেন—মিথ্যার প্রচার কখনো বৈধ নয়। এটি আত্মিক পবিত্রতার পরিপন্থী, হৃদয়ের অন্ধকার দিককে উসকে দেয়।
আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন অনেকেই নিজের মতবাদ ও চিন্তাধারার পক্ষে যেকোনো সংবাদ যাচাই ছাড়াই প্রচার করে থাকি। রাসুল (সা.) বলেন, “সব শোনা কথা প্রচার করাই একজনকে মিথ্যাবাদী হিসেবে যথেষ্ট।”
(আবু দাউদ: ৪৯৯২)
এ হাদিসে হুঁশিয়ার করা হয়েছে—ভিত্তিহীন প্রচার মানুষকে সত্য থেকে বিচ্যুত করে এবং সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, যা ইসলামের পরিপন্থী।
পবিত্র কুরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
“হে মু’মিনগণ! যদি কোনো ফাসেক ব্যক্তি কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করো…”
(সুরা হুজুরাত: ৬)
এ আয়াত প্রমাণ করে, সংবাদ প্রচারের আগে যাচাই করা শুধু ব্যক্তিগত বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক নয়, বরং এটি ঈমানদারদের দায়িত্ব। ইসলাম এমন কোনো সংবাদ প্রচারকে অনুমোদন দেয় না, যা মিথ্যা, সন্দেহজনক বা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী।
যে সংবাদ মানুষের সমাজ, জাতি বা উম্মাহর কল্যাণে নয় বরং রাগ, হিংসা বা ব্যক্তিগত বিদ্বেষের কারণে প্রচার করা হয়, তা ইসলামী দৃষ্টিতে গিবত বা অপবাদের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ বলেন:
“তোমরা একে অপরের দোষচর্চা কোরো না… তোমাদের কেউ কি মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে?”
(সুরা হুজুরাত: ১২)
এখানে কোরআনের ভাষায় গিবতের ভয়াবহতা এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়।
গুজব ছড়ানো কেবল ভুল কাজ নয়—এটি মুনাফিকি ও শয়তানী চক্রান্তের অংশ। কোরআনে বলা হয়েছে:
“যদি তারা তোমাদের সঙ্গে বের হতো, তবে শুধু বিশৃঙ্খলাই সৃষ্টি করত…” (সুরা তাওবা: ৪৭)
আরও বলা হয়েছে, “শয়তান মানুষের রূপ ধরে মিথ্যা সংবাদ ছড়ায়।” (সহিহ মুসলিম)
প্রযুক্তির এই যুগে একজন সচেতন মুসলিমের দায়িত্ব শুধু গুজব থেকে বিরত থাকা নয়, বরং তা প্রতিরোধ করাও। কোরআন আমাদের নির্দেশ দেয়, এমন সংবাদ যেন যথাযথ কর্তৃপক্ষ ও গবেষণাশীলদের যাচাইয়ের পরই প্রচার হয়।
“তারা যদি তা রাসুল বা কর্তৃত্বপ্রাপ্তদের কাছে পৌঁছে দিত, তবে… তারা সত্য অনুধাবন করতে পারত।” (সুরা নিসা: ৮৩)
গুজব ছড়ানো শুধু সামাজিক অপরাধ নয়, এটি আত্মার ওপরও এক ভয়াবহ কলঙ্ক। একজন ঈমানদার সর্বদা সত্য, ধৈর্য ও অনুসন্ধান-নির্ভর জীবনের পথে চলবে। হোক তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা বাস্তব জীবন—প্রত্যেক ক্ষেত্রেই আমাদের দায়িত্ব, আমরা যেন আলোর বাহক হই—মিথ্যার নয়।
IFM desk