নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক শিক্ষার্থীকে আটক করে কয়েক দফা মারধরের অভিযোগ উঠেছে। পরে তাকে শাহবাগ থানায় সোপর্দ করা হয় এবং প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। রোববার দিবাগত রাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে বেশ কিছু তথ্য।
মারধরের শিকার শিক্ষার্থীর নাম রাহিদ খান পাভেল। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের আবাসিক ছাত্র।
জানা গেছে, রাতে সেহরি খাওয়ার জন্য বুয়েটের কাজী নজরুল ইসলাম হল এলাকায় গেলে সেখানে উপস্থিত কয়েকজন তাকে আটক করেন। পরে তাকে বুয়েট ক্যাম্পাস থেকে রিকশায় করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আনা হয়। এ সময় বুয়েট গেট, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সামনে, ভিসি চত্বর ও রাজু ভাস্কর্য এলাকায় কয়েক দফায় তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সবশেষে তাকে শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মারধরের সময় তাকে কিল-ঘুষির পাশাপাশি বেল্ট, ইট, বাইকের লক ও শেকল দিয়ে আঘাত করা হয়। এতে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লাগে এবং মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পুলিশ তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য পাঠায়। মারধরের সময় তার মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ ও মোটরসাইকেলের চাবি নেয়ার অভিযোগও উঠেছে।
ভুক্তভোগী রাহিদ খান পাভেল দাবি করেন, তিনি নিয়মিত ক্লাস করা একজন শিক্ষার্থী এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। তার ভাষ্য, আমার কোনো দোষ থাকলে আমাকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে বলেছিলাম। কিন্তু তারা প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে আমাকে মারধর করেছে।
তবে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগের ভিত্তিতেই তাকে আটক করা হয়েছিল। জাতীয় ছাত্রশক্তির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সাইফুল্লাহ বলেন, তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করার উদ্দেশ্যেই আটক করা হয়েছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সংগঠক হাসিব আল ইসলাম বলেন, আমরা ছাত্রলীগকে পুলিশে দিয়েছি। তবে বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে বড় করে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের বিষয়ে সারদার নাদিম মাহমুদ শুভ বলেন, সন্ত্রাস প্রতিহত করাকে আজ সন্ত্রাস বলা হচ্ছে।
সরজমিনে খোঁজ নিয়ে পাওয়া গেছে বেশ কিছু তথ্য। পাভেলের বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি আগে ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী এবং ‘প্রলয় গ্যাং’ নামে পরিচিত একটি গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গত বছরের ৫ই আগস্টের পর তার হলের সহপাঠীরা তাকে বয়কট করেন। বয়কটকৃতদের তালিকায় এই পাভেলের নামও রয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর গত বছরের ২২শে আগস্ট রাহিদসহ ১৮ জন ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীকে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল থেকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছিলেন শিক্ষার্থীরা।
তাদের দাবি, ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের বিভিন্ন নেতাকর্মীর সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এমনকি ৫ই আগস্ট সকালেও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত দর্শন বিভাগের এক ছাত্রলীগ কর্মীর সঙ্গে তাকে ক্যাম্পাসে দেখা গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের পোস্টারিংসহ কিছু কর্মকাণ্ডেও তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল। এদিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকেন্দ্রিক ছাত্রলীগের হাতে গড়া অপরাধচক্র ‘প্রলয় গ্যাং’-এর একটি গ্রুপ ছবিতেও এই পাভেলকে দেখা গেছে।
ঘটনার পর তার খোঁজখবর নিতে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী ও ক্যাডারকে তার ফোনে যোগাযোগ করতে দেখা গেছে বলেও দাবি করেছেন বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী।
এ বিষয়ে শাহবাগ থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মো. খোকন মিয়া বলেন, একদল শিক্ষার্থী তাকে ছাত্রলীগ করার অভিযোগে থানায় রেখে যায়। অসুস্থ থাকায় তাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নজরে এসেছে। অভিযোগের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব পুলিশের।
এদিকে ঘটনাটিকে ‘মব জাস্টিস’ আখ্যা দিয়ে সমালোচনা করেছেন কয়েকজন ছাত্রনেতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি আবু সাদিক কায়েম বলেন, কেউ অপরাধী হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া উচিত। কাউকে অন্যায়ভাবে শারীরিকভাবে আঘাত করা ঠিক নয়।