দক্ষিণ লেবাননের আকাশে সম্প্রতি নতুন ধরনের এক ড্রোন যুদ্ধের চিত্র সামনে এসেছে। আর এটি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য তৈরি করেছে নতুন চ্যালেঞ্জ। ফাইবার-অপটিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচালিত এই ড্রোনগুলো সহজে শনাক্ত করা যায় না এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিংও এদের থামাতে পারে না। ফলে ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে হিজবুল্লাহর নির্ভুল হামলার সক্ষমতা বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। সাম্প্রতিক হামলার একটি ভিডিও ও সামরিক বিশ্লেষকদের বক্তব্যে এই নতুন অস্ত্রের কার্যকারিতা ও ঝুঁকি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলছে, বিস্ফোরক বহনকারী একটি কোয়াডকপ্টার ড্রোন দক্ষিণ লেবাননের বাড়ির ছাদ ঘেঁষে উড়ছিল। ধ্বংসস্তূপে পরিণত ভবনের ফাঁক দিয়ে এবং কাঁচা রাস্তার ওপর দিয়ে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এগোচ্ছিল সেটি। ড্রোনটির অপারেটর প্রথম-ব্যক্তি দৃষ্টিকোণ থেকে স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছিল লক্ষ্যবস্তু। আর সেই লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে একটি ইসরায়েলি ট্যাংক এবং তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেনারা।
ছবির ওপরের দিকে সাদা অক্ষরে লেখা ছিল দুটি শব্দ— ‘বোম্ব রেডি’ (BOMB READY)। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ছিল মূলত ফাইবার-অপটিক ড্রোন। এটি এমন এক অস্ত্র যা হিজবুল্লাহ সাম্প্রতিক সময়ে ক্রমশই বেশি করে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে এবং সেটিও আবার মারাত্মক নির্ভুলতার সঙ্গে। এই ড্রোনগুলো থামানো কঠিন, আর শনাক্ত করা আরও কঠিন। কারণ এগুলো লক্ষ্যবস্তুর উচ্চ রেজোলিউশনের ছবি দেয়, কিন্তু এমন কোনও সংকেত ছড়ায় না যা জ্যাম করা যায়।
ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক ইয়েহোশুয়া কালিস্কি বলেন, এসব ড্রোন যোগাযোগ জ্যামিং থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। কোনও ইলেকট্রনিক সিগনেচার না থাকায় এগুলো কোথা থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে, সেটিও শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।
রোববার (৩ মে) প্রকাশিত হিজবুল্লাহর একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েক কেজি ওজনের একটি কোয়াডকপ্টার ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে। আর ইসরায়েলি সেনারা তা বুঝতেই পারেনি। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, এই হামলায় ১৯ বছর বয়সী সার্জেন্ট ইদান ফুকস নিহত হন এবং আরও কয়েকজন সেনাসদস্য আহত হন। পরে আহতদের সরাতে আসা একটি উদ্ধার হেলিকপ্টারেও হিজবুল্লাহ ড্রোন হামলা চালায়।
যেভাবে কাজ করে ফাইবার-অপটিক ড্রোন
সিএনএন বলছে, ফাইবার-অপটিক ড্রোনের কার্যকারিতা এর সহজ-সরল প্রযুক্তিতে। সাধারণ ড্রোন যেখানে ওয়্যারলেস সংকেতের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়, সেখানে এই ড্রোনগুলো সরাসরি অপারেটরের সঙ্গে ফাইবার-অপটিক কেবল দিয়ে সংযুক্ত থাকে।
ইসরায়েলি এক সামরিক সূত্র সিএনএনকে জানায়, এই কেবল বা তার এতটাই পাতলা ও হালকা যে খালি চোখে তা প্রায় দেখা যায় না। এটি প্রায় ১৫ কিলোমিটার বা তার বেশি দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। ফলে অপারেটর নিরাপদ দূরত্বে থেকেও স্পষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তু দেখতে পারেন।
ড্রোন প্রতিরোধে ইসরায়েল এতদিন প্রযুক্তিগত সুবিধার ওপর নির্ভর করেছে, ড্রোনের সংকেত জ্যাম করে সেগুলোকে থামানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু ফাইবার-অপটিক ড্রোনে কোনও সংকেত না থাকায় তা জ্যাম করা সম্ভব নয়, ফলে এগুলো শনাক্ত করাও আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ইসরায়েলি সামরিক সূত্র বলছে, জাল বা অন্যান্য শারীরিক বাধা ছাড়া এ ধরনের ড্রোন ঠেকানোর উপায় খুব কম। এটি মূলত অসম যুদ্ধের জন্য তৈরি একটি নিম্ন প্রযুক্তির কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা।
ফাইবার-অপটিক ড্রোন প্রথম বড় আকারে দেখা যায় ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে। ওই যুদ্ধে রাশিয়া এগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করে। রাশিয়া ড্রোনকে একটি বেস ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত করে অপারেটরকে আরও দূরে রাখার ব্যবস্থা করে। এতে করে ওই অপারেটর আরও নিরাপদ থাকেন।
হিজবুল্লাহর ক্ষেত্রে লক্ষ্যবস্তু অবশ্য ভিন্ন। ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে নিজস্ব ঘাঁটির কাছাকাছি অবস্থান করছে, ফলে বড় সরবরাহ লাইন আক্রমণের সুযোগ কম। তাই হিজবুল্লাহ সরাসরি সেনাদের লক্ষ্য করে ড্রোন ব্যবহার করছে। সেন্টার ফর নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির গবেষক স্যামুয়েল বেনডেট বলেন, দক্ষ অপারেটরের হাতে এই ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর। এমনকি সদা প্রস্তুত থাকা কোনও বাহিনীর বিরুদ্ধেও এটি প্রাণঘাতী হতে পারে।
ইসরায়েলের ধারণা, হিজবুল্লাহ চীন বা ইরান থেকে বেসামরিক ড্রোন সংগ্রহ করে এবং তাতে গ্রেনেড বা বিস্ফোরক যুক্ত করে। ফলে এটি প্রায় অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত নির্ভুল একটি অস্ত্রে পরিণত হয়। অবশ্য চীন এই সংঘাতে কোনও পক্ষকে অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এদিকে এই ড্রোনগুলো বড় ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে না পারলেও কম ব্যয়বহুল হওয়ায় তা হিজবুল্লাহর জন্য কার্যকর অস্ত্র হয়ে উঠেছে। বেনডেট বলেন, হিজবুল্লাহর ইতোমধ্যেই উন্নত ড্রোন ভাণ্ডার রয়েছে এবং তাদের অনেক অভিজ্ঞ অপারেটরও আছে।
মূলত বছরের পর বছর ইরানের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় হিজবুল্লাহ বড় ধরনের রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে। গাজা যুদ্ধের আগে ইসরায়েলের হিসাব অনুযায়ী তাদের কাছে প্রায় দেড় লাখ রকেট ছিল। তবে যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের হামলা ও হিজবুল্লাহর ব্যবহার মিলিয়ে এখন সেই মজুদ প্রায় ১০ শতাংশে নেমে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসরায়েলের সামরিক শক্তির সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠী অসম যুদ্ধ কৌশল গ্রহণ করেছে। ইসরায়েল পাল্টা হিসেবে জাল ও অন্যান্য কৌশল ব্যবহার করলেও এক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে, এসব কৌশল পুরোপুরি কার্যকর নয়। তিনি বলেন, ‘এটি শতভাগ নিরাপদ নয়, যতটা আমরা চাই।’
আইডিএফ এখন গোয়েন্দা বিভাগের সঙ্গে কাজ করে এই ড্রোন মোকাবিলার নতুন উপায় খুঁজছে। তবে ঝুঁকি এখনও রয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, ‘এটি এমন এক হুমকি, যার সঙ্গে আমরা এখনও মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি।’
এছাড়া একাধিক ড্রোন একসঙ্গে হামলা চালালে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। কারণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তা সামাল দিতে হিমশিম খেতে পারে। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘হিজবুল্লাহ দ্রুত শিখছে। তারা সমন্বিত হামলার চেষ্টা করছে, এটা বড় ধরনের হুমকি।’