দেশের কৃষিকীটনাশক শিল্পের বিকাশ থমকে আছে শুল্ক বৈষম্য বা শুল্ক বাধার কারণে। বর্তমানে ৫ শতাংশ শুল্ক দিয়ে নিম্ন মানের ফিনিশড কীটনাশক পণ্য ভারত ও চীন থেকে আমদানি করা হয়। অথচ উৎপাদনের ক্ষেত্রে কাঁচামাল আমদানিতে দিতে হয় ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক। একই সঙ্গে কাঁচামাল আমদানিতেও অযৌক্তিকভাবে বসিয়ে রাখা হয়েছে ১৫ শতাংশ ভ্যাট। কিন্তু ওই ফিনিশড পণ্যে ৫ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি ছাড়া কোনো ভ্যাট ও শুল্ক ধরা হয়নি। এতে একদিকে যেমন আমদানিকারক ও দেশীয় উৎপাদনকারীদের মধ্যে চরম বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে দেশীয় কৃষিকীটনাশক শিল্পের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও দেশীয় কৃষিকীটনাশক শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশে কীটনাশক পণ্য উৎপাদনে বাধা তৈরি করতে বিরাট অঙ্কের শুল্ক চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এতে বাংলাদেশ কীটনাশকে বিদেশি পণ্যের বাজারে পরিণত হয়ে আছে। যেখানে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিশ্বের ১৬০টির বেশি দেশে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। অথচ অপেক্ষাকৃত সহজ প্রযুক্তির কৃষিকীটনাশক উৎপাদনে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। এই সুযোগে আমদানিকৃত নিম্নমানের কীটনাশক দখল করেছে দেশের কৃষিকীটনাশকের বিশাল বাজার।
কীটনাশক খাতে এই শুল্ক ‘বৈষম্যের কারণে সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষক। কারণ কৃষক বেশি দাম দিয়ে নিম্ন মানের কীটনাশক কিনতে বাধ্য হচ্ছে। কেননা আমদানিকৃত কীটনাশক দিয়ে এর গুনগত মান কখনো ঠিক রাখা যায় না। কবে কোথায় উৎপাদন হয়েছে-তার ঠিক থাকে না। এতে কৃষক ও দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমদানিকৃত কৃষিকীটনাশকের কারণে দেশের কৃষির সর্বনাশ হচ্ছে এবং এ শিল্পকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে দিচ্ছে না। যখন এলডিসি গ্রাজুয়েশন হবে তখন আর আমদানিকারকদের দৌরাত্ম্য থাকবে না। তার আগেই দেশীয় কৃষিকীটনাশক শিল্পকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হবে। সেটি করতে না পারলে এলডিসি গ্রাজুয়েশনের পর আমাদের কৃষি খাত চরম বিপাকে পড়বে। সুতরাং এর আগেই দেশীয় কৃষি কীটনাশক শিল্পের সকল বাধা দূর করে বিকাশের সুযোগ করে দিতে হবে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ এগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশনের (বামা) সভাপতিকে এস এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘দেশীয় কৃষিকীটনাশক উৎপাদনকারীদের শুল্ক বাধা এবং কাঁচামাল সংগ্রহে বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। অথচ এ শিল্পের সামনে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন- দেশের ওষুধ শিল্প এক সময় ছিল পুরোপুরি আমদানিনির্ভর, আর এখন ওষুধ শিল্পে বাংলাদেশ প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। আগে যেমন ওষুধের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ছিল বেশি, দেশীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ছিল কম। অথচ এখন দেশীয় ওষুধ উৎপাদনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠান হয়েছে ২০০, আর আমদানিকারক এখন মাত্র ১০-১২টির মতো। এটা সম্ভব হয়েছে দেশীয় ওষুধ শিল্পকে বিকাশের সুযোগ করে দেওয়ায়। একই ভাবে যদি দেশীয় কৃষি কীটনাশক শিল্পকে বিকাশে সহযোগিতা করা হয় তাহলে ওষুধ শিল্পের মতো কৃষিকীটনাশক শিল্পও দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিশ্ব বাজারে রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যাবে। এ জন্য আমরা চাচ্ছি-আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন বাজেটে শুল্ক সংক্রান্ত যে বাধা রয়েছে সেটি যেন দূর করা হয়।’
মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের নির্দিষ্ট করে দেওয়া কিছু দেশ থেকে প্রতিযোগিতা ছাড়া বেশি দামে কাঁচামাল আনতে হয়। কিন্তু আমদানিকারকদের জন্য উৎস উন্মুক্ত থাকায় যেকোনো দেশ থেকে তারা কম দামে কীটনাশক আমদানির সুযোগ পান। তাদের আমদানিকৃত কীটনাশক কবে কোথায় তৈরি হয় তার সুনির্দিষ্ট কোনো ডেইট থাকে না। এ ছাড়া বিদ্যমান শুল্কনীতিও চরম বৈষম্যমূলক।’
এ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, আসন্ন বাজেটে এনবিআরের কাছে প্রধান দুটি চাওয়া রয়েছে কৃষিকীটনাশক শিল্পের উৎপাদকদের। এ রমধ্যে একটি হচ্ছে -কৃষিকীটনাশক শিল্পের জন্য যে ৩২টি কাঁচামাল আমদানি করতে হয় তাতে সব মিলে প্রায় ৫৮ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। সম্প্রতি আন্ত:মন্ত্রণালয়ের বৈঠকেও এই শুল্ক শুন্য করার সুপারিশ করা হয়েছে, কিন্তু এনবিআর সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে না। আন্ত:মন্ত্রণারয়ের বৈঠকেও এই উচ্চ শুল্ককে বলা হয়েছে অযৌক্তিক। তাই ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই শুল্ক শুন্য করতে হবে।
এছাড়া এ খাতের উদ্যোক্তাদের কাঁচামাল আমদানির পর পণ্য খালাস করার সময় চট্টগ্রাম বন্দরে চরম বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। কাঁচামাল বন্দরে আটকে রেখে কাস্টমস কর্মকর্তারা কারখানা ভিজিট করতে আসেন। এতে ৪০ থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত বন্দরে পণ্য আটকে থাকে। ফলে উদ্যোক্তাদের প্রচুর পরিমাণে বন্দরে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। সুতরাং বন্দরে দ্রুত এনওসি দেবার বিষয়টি সহজ করতে হবে। এ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, যদি এই দুটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে আগামী ৩ বছরের মধ্যে কৃষিকীটনাশকে বাংলাদেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা সম্ভব হবে। তখন আর কৃষিকীটনাশক আমদানি করতে হবে না।
জানা গেছে, কৃষিনির্ভর দেশ হওয়া সত্ত্বেও এ দেশের কীটনাশকের চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশই এখনো আমদানিনির্ভর। অথচ গত পাঁচ দশকে দেশে কৃষি উৎপাদন যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি এ সময়ে কীটনাশকের ব্যবহারও বেড়ে হয়েছে প্রায় ১০ গুণ। কিন্তু কীটনাশকের আমদানিনির্ভরতার কারণে ডলারের মূল্যবৃদ্ধিসহ নানা কারণে কীটনাশক বাবদ কৃষকের খরচ বাড়ছে। তাতে কৃষির উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।
কৃষি খাতের বিশ্লেষকেরা বলছেন, বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থে খাতটি এখনো আমদানিনির্ভর। কীটনাশকের কাঁচামাল আমদানিতে কঠিন শর্তের কারণে কীটনাশক উৎপাদনে আগ্রহ কম। কীটনাশক উৎপাদনের চেয়ে আমদানি অনেক সহজ। তাই স্থানীয়ভাবে কীটনাশকের উৎপাদন বাড়াতে হলে সরকারকে এ খাতে নীতিসহায়তা দিতে হবে।
এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘কীটনাশকের কাঁচামাল আমদানিতে রয়েছে উচ্চ শুল্কহার। উচ্চ শুল্কে কাঁচামাল আমদানি করে দেশে কীটনাশক উৎপাদনের চেয়ে আমদানি করা অনেক সহজ ও লাভজনক। তাই দেশে কীটনাশকের উৎপাদন বাড়াতে হলে আমদানি নিরুৎসাহিত করতে হবে। আমদানি করা কীটনাশকের দামও অনেক বেশি পড়ে। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। তাই স্থানীয়ভাবে কীটনাশক উৎপাদনে সরকারের নীতিসহায়তার পাশাপাশি প্রয়োজনে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা উচিত।’
এদিকে কীটনাশক নিয়ে কাজ করা অলাভজনক আন্তর্জাতিক সংস্থা সেন্টার ফর অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড বায়োসায়েন্স ইন্টারন্যাশনালের (কেবি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২ সালে দেশে কীটনাশক ব্যবহারের পরিমাণ ছিল মাত্র চার হাজার টন। এখন তা বেড়ে ৪০ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে, অর্থাৎ পাঁচ দশকের ব্যবধানে কীটনাশকের ব্যবহার বেড়ে ১০ গুণ হয়েছে। ১৯৯৭ সালেও দেশে কীটনাশকের ব্যবহার ছিল ১১ হাজার ৩৬৭ টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, এখন দেশে কীটনাশক আমদানি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টনের মতো।
দেশে কীটনাশকের বাজারের আকার
দেশের কীটনাশক উৎপাদনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাগ্রো কেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বামা)। সংগঠনটির হিসাবে, বর্তমানে দেশে কীটনাশকের বাজার সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার। যার ৫৫ শতাংশ বা ৪ হাজার ১২৫ কোটি টাকার বাজার রয়েছে সাতটি বহুজাতিক কোম্পানির হাতে। আর স্থানীয় আমদানিকারকেরা চাহিদার প্রায় ৪১ শতাংশ বা ৩ হাজার ৭৫ কোটি টাকার কীটনাশক আমদানি করছে। কীটনাশকের বাজারে দেশি উৎপাদনকারীদের হিস্যা মাত্র ৪ শতাংশ বা ৩০০ কোটি টাকার। তবে কেবির হিসাবে, এই দেশের কীটনাশকের বাজারের আকার পাঁচ হাজার কোটি টাকা।