২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে মন্তব্য করায় কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে হট্টগোল হয়েছে। বিরোধী দলের সদস্যদের প্রতিবাদের মুখে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল তার বক্তব্যের বিতর্কিত অংশ সংসদের কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ (বাদ) করার নির্দেশ দেন।
রোববার ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে বাজেট অধিবেশনে সম্পূরক বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নেন মনিরুল হক চৌধুরী। এসময় সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত ছিলেন।
বক্তব্যের শুরুতে তিনি প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘ঐতিহাসিক, যুগান্তকারী, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ও গণমুখী’ হিসেবে আখ্যা দেন। ৬ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকার বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রার প্রশংসা করেন। একইসাথে কুমিল্লা-ঢাকা রেললাইন প্রকল্পের উদ্যোগ নেয়ায় প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সময় এই প্রকল্পের জরিপ হয়েছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা সরকারের বিদায়ের পর দেশ পরিচালনায় তারেক রহমান সাহসিকতার পরিচয় দিচ্ছেন।’ বিএনপি ও তারেক রহমানকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছোট করার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ সময় তার বক্তব্য ঘিরে সংসদে পক্ষে-বিপক্ষে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়।
এক পর্যায়ে তিনি জামায়াতে ইসলামীর প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ১৯৬৮ সালে গোলাম আযমের নেতৃত্বে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন এবং জামায়াতকে ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করেন। এ মন্তব্য নিয়ে সংসদে তর্ক-বিতর্ক দেখা দেয়।
পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন তিনি ২০০৪ সালের একটি পারিবারিক দাওয়াতের প্রসঙ্গ তুলে নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক ও পর্দা নিয়ে ব্যক্তিগত মন্তব্য করেন। তিনি পর্দানশীল জামায়াতের নারী এমপিদের উদ্দেশ্যে একপর্যায়ে বলেন, ‘….দু’জনের বক্তব্য শুনেছি, তারা মেধাবী। কিন্তু, বুঝলাম না তো কারা আপনারা?’
বিরোধী দলের সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা এদিকে (সরকার দলীয় নারী এমপিদের) দেখতে বুঝতে পারেন, কিন্তু আমরা ওদিকে তাকালে কিছু বুঝতে পারি না।’
তার এই বক্তব্য ঘিরে বিরোধী দলের সদস্যরা আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান। হট্টগোলের মধ্যে অধিবেশন কক্ষে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল সদস্যদের নিজ নিজ আসনে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। পরে রুলিং দিয়ে তিনি বলেন, ‘এই মহান সংসদ ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে মন্তব্য করার জায়গা নয়। আমরা যদি নিজেদের শালীনতা ও মর্যাদা রক্ষা করতে না পারি, তবে দেশের মানুষের কাছে লজ্জিত হতে হবে।’
এরপর তিনি মনিরুল হক চৌধুরীর ‘পার্সোনাল ফ্রিডম’–সংক্রান্ত বক্তব্য সংসদের কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ করার নির্দেশ দেন।
তীব্র সমালোচনার মুখে মনিরুল হক চৌধুরী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘তার কোনো বক্তব্যে কারো আত্মসম্মানে আঘাত লেগে থাকলে তিনি তা প্রত্যাহার করছেন।’
হট্টগোল চলাকালে ডেপুটি স্পিকার আসরের নামাজের বিরতির জন্য অধিবেশন ৩০ মিনিটের জন্য মুলতবি ঘোষণা করেন।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা জিসান মিয়া প্রধানের নিখোঁজ হওয়া, তাকে উদ্ধারের ঘটনা এবং তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও ভ্রূণ হত্যার অভিযোগ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া বিবৃতিকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে তুমুল হট্টগোলের সৃষ্টি হয়েছে।
বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা: সৈয়দ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ তাহের বিবৃতির বিরোধিতা করলে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। পরে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের রুলিংয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
রোববার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ষষ্ঠ কার্যদিবসে ৩০০ বিধিতে দেয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতিকে কেন্দ্র করে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রায় ৮-১০ মিনিট সংসদে হইচই শুরু হয়। অচলাবস্থা দেখা দেয়।
৩০০ বিধিতে দেয়া বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘গত ১১ জুন কুমিল্লা থেকে নিখোঁজ হওয়া বাংলাদেশ ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক জিসান মিয়া প্রধানের বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল। তবে পুলিশি অনুসন্ধানে জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্রে এক নারীর সাথে জিসানের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে একাধিকবার ধর্ষণের ফলে ওই নারী অন্তঃসত্ত্বা হলে জিসান তাকে জোরপূর্বক ভ্রূণ নষ্ট করার ওষুধ খাওয়ান বলে অভিযোগ রয়েছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, ‘গত ১২ জুন বিয়ের তারিখ নির্ধারিত থাকলেও ১১ জুন রাতে বিয়ের পিঁড়িতে না বসার উদ্দেশ্যে জিসান নিজেই আত্মগোপনে যান। পরে পুলিশ তাকে লাকসাম এলাকা থেকে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নারী বাদি হয়ে জিসানসহ চারজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও ভ্রূণ হত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের করেছেন।’ ইতোমধ্যে দুই আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলেও তিনি জানান।
তিনি আরো বলেন, ‘জিসানের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে সরকারকে দায়ী করার চেষ্টা করেছেন। প্রকৃত ঘটনা জাতির সামনে তুলে ধরতেই সংসদে এ বিবৃতি দেয়া হয়েছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পরপরই বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা: সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বক্তব্য দেয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল জানান, ৩০০ বিধিতে দেয়া বিবৃতির পর এ বিষয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ নেই।
তবে বিশেষ বিবেচনায় বক্তব্যের সুযোগ পেয়ে ডা: তাহের বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি অসংসদীয় এবং এটি সংসদের কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ (বাদ) করতে হবে।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘একটি অনিষ্পন্ন ও বিতর্কিত বিষয় সংসদে এনে একটি রাজনৈতিক দলকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছে।’
তিনি প্রশ্ন তোলেন, জিসান বর্তমানে কোথায় রয়েছেন এবং কুমিল্লা পুলিশ কেন জিসান বা অভিযোগকারী নারীর সাথে সাংবাদিকদের কথা বলতে দিচ্ছে না।
এরপরই সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা ও হট্টগোল শুরু হয়। উভয় পক্ষের সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানালে সংসদ কক্ষে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বারবার সদস্যদের আসনে বসার আহ্বান জানান। তিনি রুলিং দিয়ে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে যদি কোনো অসংসদীয় ভাষা বা সংসদীয় রীতিনীতির পরিপন্থী বিষয় থেকে থাকে, তবে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজন হলে এক্সপাঞ্জ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
ডেপুটি স্পিকারের এ রুলিংয়ের পর পরিস্থিতি শান্ত হলে সংসদের পরবর্তী কার্যসূচি অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হয়।