দক্ষিণ এশিয়ায় ন্যূনতম দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের হারে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। ইউনেস্কো প্রকাশিত বিশ্ব শিক্ষা পরিসংখ্যানে এমনই হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে। শিক্ষাবিদদের মতে, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও এই করুণ অবস্থার মূল কারণ মানসম্মত বেতন এবং সামাজিক মর্যাদার অভাব। এখনই মেধাবীদের শিক্ষকতায় ফিরিয়ে না আনতে পারলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও প্রকট হবে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করে মেহেরুন্নেসা মুন ৭ বছর ধরে ঢাকার শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. আমিন উদ্দীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। তিনি চাকরি শুরু করেছিলেন ১৭ হাজার টাকা বেতনে। মুনের মতো অনেকেই এই পেশায় এসেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনেকে আর থাকেননি।
মেহেরুন্নেসা মুন বলেন, আমাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী বেতন ও সুযোগ-সুবিধা কম। সেই কারণে তারা জীবনমান উন্নত করার জন্য অন্য বিভাগে চলে যাচ্ছে।
শিগগিরই চাকরির বাজারে প্রবেশ করবেন এমন কিছু তরুণের সঙ্গেও কথা হয়। শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে অনাগ্রহই বেশি দেখা যায়।
একজন বলেন, শিক্ষকদের স্যালারি তুলনামূলকভাবে অনেক কম, সরকারি শিক্ষকদের ক্ষেত্রে তা আরও কম। আরেকজন শিক্ষার্থী বলেন, এই পেশায় না গিয়ে যদি কেউ বিসিএস ক্যাডার বা সিএ-এর মতো পেশায় যায়, তাহলে তার মর্যাদা বেশি। আরেকজন প্রার্থী বলেন, ক্লাসরুমের ভেতরে শিক্ষককে সম্মান করা হয়, কিন্তু বাইরে গেলে সেই সম্মান তেমনভাবে দেখা যায় না।
এমন অনাগ্রহের প্রভাব পড়ছে শিক্ষা খাতেও। জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর বিশ্ব শিক্ষা পরিসংখ্যানেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় দক্ষ শিক্ষকের হারে সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ। ফলে শ্রেণিকক্ষ অনেক ক্ষেত্রে আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ হয়ে উঠছে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, “শিক্ষকরা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা আমাদের রাজনীতিবিদ, আমলাতন্ত্র ও রাষ্ট্রকাঠামো পুরোপুরি বুঝতে পারছে না।”
তিনি আরও বলেন, কোনো সরকারই এখন পর্যন্ত শিক্ষকদের বেতন ও মর্যাদা নিয়ে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা নেয়নি। ফলে সম্মানজনক এই পেশা অনেকের কাছে অবহেলিত ক্ষেত্র হিসেবে রয়ে গেছে।
অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান আরও বলেন, সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে কীভাবে মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসবে, কীভাবে তারা সন্তুষ্ট থাকবে বেতন বাড়ানো, সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি বা ক্ষমতায়ন—সব দিক বিবেচনায় নিতে হবে। বিক্ষিপ্ত উদ্যোগের বদলে একটি শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করতে হবে, যা একটি যুগোপযোগী শিক্ষা নীতি প্রণয়ন করবে।
এদিকে ম্যানচেস্টার ইনস্টিটিউট অফ এডুকেশনের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষাদানের মান অনেকাংশে শিক্ষকের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভরশীল।