বুধবার, ২৭ মে ২০২৬, ০৫:০১ পূর্বাহ্ন




‘সব ফসল শেষ, পুরো বছর কেমনে চলবাম’

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শনিবার, ২ মে, ২০২৬ ১০:২৪ am
ফসলের মাঠ ফসল মাঠ Climate Change Conference COP27 সম্মেলন Conference জলবায়ু climate cop কপ জলবায়ু Boro paddy farmers ইরিগেশন Irrigation Rice ধান আমন ধান কৃষক agri সেচ মৌসুম ডিজেল climate jamuna flood Water level Of Jamuna jamuna-river প্লাবন flood flood Disaster Flood Safety adb Flood Flooding overflow water rain snow coastal storms storm surges dangerous floodwaters floodwater বন্যা কবলিত পানি প্রবাহ প্রবাহিত পানি জোয়ার ভাটা কৃষি জোয়ার-ভাটা দুর্যোগ বন্যা বন্যার্ত পানি বন্যা-Kurigram ফসল Flash floods threaten haor crops in Netrokona, farmers fear heavy losses Flash flood haor crops Netrokona farmer
file pic

শুক্রবার সকালে হালকা বৃষ্টি ছিল। দুপুরের পর কিছুটা মেঘলা আকাশ থাকলেও বৃষ্টি নামেনি। কিন্তু বিকালের দিকে আবার আকাশ মেঘে ঢেকে যায়। চারদিকে অন্ধকার হয়ে আসে। টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি হাওড়পারের কৃষকের চোখ থেকে ঘুম চলে গেছে। মনেও স্বস্তি নেই। কৃষকের চোখের সামনে ডুবছে খেতের পাকা ধান। অসহায়ের মতো চেয়ে দেখা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। স্বপ্ন জলে তলিয়ে গেলেও কিছুই যেন করার থাকছে না।

শুক্রবার (১ মে) বেলা ৩টার দিকে বারহাট্টা উপজেলায় গেলে কৃষকদের মধ্যে ফসল হারানোর হাহাকার টের পাওয়া যায়। ভারি বর্ষণ ও ঢলের পানি হাওড়পারের কৃষকের ফসল তোলার এ আনন্দ-উৎসব নিঃশব্দ-নীরব কান্নায় পরিণত হয়েছে।

তাদের এ কষ্ট দেখতে যান নেত্রকোনা-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক আনোয়ারুল হক। তাকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন কয়েকজন কৃষক। ‘সব ফসল শেষ,পুরো বছর কেমনে চলবাম? কিতা খাইবাম?’ এমন প্রশ্ন করে বসেন বাহিরকান্দা গ্রামের কৃষক খালেক নেওয়াজ ও শাজাহান মিয়া। তারা বলেন, ‘দিনে রাতে পানি বাড়ছে। চোখের সামনে পাকা ধান ডুবে গেছে। ধান কাটতো পারি নাই। দেড় হাত পানি কমলে ধান কিছুটা ভাসতে পারে, কিন্তু পানি কমার কোনো লক্ষণ নাই। বউ বাচ্চারে কেমনে বাঁচাইবাম? কিছু ধান খেত পাকি (পেকে) গেছে। কাটার লোক মিলছে না। পানির ধান কাটার জন্য এখন শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা। মজুরি ছাড়াও প্রত্যেক শ্রমিককে ১৫০ টাকা করে যাওয়া-আসার ভাড়া, ধানের আঁটি পাড়ে আনতে নৌকা ভাড়া দিতে হচ্ছে ৫০০ টাকা।

সরেজমিনে দেখা যায়, হাওড়ের বুক থেকে ছোট ছোট নৌকা পাড়ের দিকে ভেসে আসছে। ওই নৌকাগুলো পাড়ে লাগানোর পর কৃষকরা ধানের আঁটি তুলে শুকনা স্থানে রাখছেন। কেউ যন্ত্রে ধান মাড়াই করছেন। কেউ ভেজা ধান স্তুপ করে রাখছেন। কেউ আবার সেই ধান বস্তায় ভরছেন। শ্রমিকরা ধানের বস্তা কাঁধে ও মাথায় করে শুকনা স্থানে নিয়ে তুলছেন।

বারহাট্টা উপজেলার হাজিগঞ্জ এলাকার কৃষক জালাল মিয়া বলেন, ‘আমার সাড়ে পাঁচ একর খেত। কাটছি এক একরের মতো। আর কাটার সুযোগ নাই। গত চাইর (চার) দিনে হাওড়ো পানি বাড়ছে। ধানর ছড়ার আগা পানির নিচে ডুবি গেছে। পানি কমছে না।’

একই এলাকার আরেক কৃষক ফরিদ তালুকদার বলেন, ‘আমরার শান্তি নাই। শ্রমিক নাই, নৌকা নাই। শুকানির লাইগা রোদ নাই। কাটা ধান পচে নষ্ট হচ্ছে। পাঁচ ছয়শো টাকা করেও কেউ কিনে না। ঋণ করে টাকা খেতে দিছি। এখন সব খেত পানির তলে। সব টাকা গেছে। ধান যে কাটব, কামলা নাই। একটা কামলার রোজ ১২শো থেকে দেড় ১ হাজার টাকা। তা-ও নাও দিয়া আনতে হয়।’

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করছে কৃষি বিভাগ। তখন ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ জানা যাবে। শুক্রবার পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে হাওড়াঞ্চলের পনেরো হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে বলে স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন। অন্যদিকে শিলাবৃষ্টিতেও ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

খালিয়াজুরী উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, এখন পর্যন্ত হাওড়ের প্রায় ৫৮ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। তবে বাকি অর্ধেক জমির ধান এখনো মাঠে রয়েছে, যা পুরোপুরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করছে।

হাওড়াঞ্চলের কৃষকদের সারা বছরের জীবিকা নির্ভর করে বোরো ফসলের ওপর। এই ফসল হারালে ঋণ শোধ, সংসার চালানো, এমনকি খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

পাঁচহাট গ্রামের কৃষক কাদির মিয়া বলেন, ‘চোখের সামনে সব ডুবে যাচ্ছে। কেমনে ঋণ শোধ করব, পরিবার চালাব—কিছুই বুঝতে পারছি না।’

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিন উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উজানে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। ভারতের চেরাপুঞ্জিতেও ভারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, যা নতুন করে ঢল নামিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ৮০ শতাংশ পাকা ধান মাঠে রাখা এখন খুব ঝুঁকিপূর্ণ। দ্রুত কেটে ফেলাই সবচেয়ে নিরাপদ। এখনও হাওড়পারের কোনো ফসল রক্ষা বাঁধ ভাঙেনি। তবে বৃষ্টির পানিতে ধানের ক্ষতি হয়েছে।

ধনু নদের খালিয়াজুরি পয়েন্টে বিপৎসীমার কাছাকাছি। তবে কংস নদের পানি জারিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ১০৭ সেন্টিমিটার ওপরে। উপজেলা প্রশাসনকে নিয়ে আমরা এলাকায় অবস্থান করছি। ফসল রক্ষা বাঁধ রক্ষায় আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, জেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ টন ধান। এর মধ্যে হাওড় অঞ্চলে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৯০ টন।

জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ধনু নদে পানি কিছুটা বেড়েছে। বৃহস্পতিবার আমি খালিয়াজুরী হাওড়ে গিয়েছি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে সহযোগিতা করা হবে। আমাদের ইউএনওরা মাঠে আছেন, তাদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পানি বাড়লে ঝুঁকি বাড়বে, সে ক্ষেত্রে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

নেত্রকোনা-২ আসনের এমপি আনোয়ারুল হক ক্ষতিগ্রস্ত বারহাট্টা উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন পরিদর্শন করে বলেন, কৃষকের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। যারা ক্ষতিগ্রস্ত তাদের তালিকা করে সরকারি সহযোগিতা করা হবে। এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কৃষকদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।
(যুগান্তর)




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD