সৌদি আরবে সমবেত হওয়া লাখ লাখ মুসলমান তাঁবুনগরী মিনা থেকে সাতসকালে হাজির হচ্ছেন আরাফাত ময়দানে।
সৃষ্টিকর্তার কাছে হাজিরা দিতে তাদের কণ্ঠে “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নিমাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারিকা লাক” ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে বিদায় হজের স্মৃতি বিজড়িত এই ময়দান।
অর্থাৎ “আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, সব প্রশংসা ও কর্তৃত্ব শুধু তোমারই, আর তোমার কোনো শরিক নেই।”
মঙ্গলবার সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তারা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করবেন। হজের খুতবা শুনবেন এবং জোহর ও আসরের নামাজ পড়বেন। আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করাই হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা।
এ বছর আরাফাতের ময়দানে হজের খুতবা দেবেন মসজিদে নববীর ইমাম ও খতিব শায়খ আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুজাইফি। ময়দানের পশ্চিম প্রান্তে মসজিদ আল-নামিরাহয় খুতবা পাঠ এবং নামাজ আদায়ে ইমামতির দায়িত্ব পালন করবেন তিনি।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ পরিস্থিতির উদ্বেগ আর তীব্র গরমের মধ্যেই এবার সৌদি আরবে হজের আনুষ্ঠানিকতায় মিলিত হয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১৫ লাখের বেশি মুসলমান। বাংলাদেশ থেকে এবার হজ পালন করতে গেছেন ৭৯ হাজার ১৬৪ জন।
মক্কার আবহাওয়া দপ্তর ও সৌদি আরবের ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিটিরিওলজি (এনসিএম) পূর্বাভাস দিয়েছে, এবার হজের সময় মক্কার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। সেজন্য সবাইকে ছাতা ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের (আরকান) মধ্যে হজ পঞ্চম স্তম্ভ। শারীরিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলিম নর-নারীর ওপর জীবনে একবার হজ পালন করা ফরজ বা আবশ্যিক।
জিলহজ মাসের নির্দিষ্ট দিনে (মূলত ৯ জিলহজ) হজের নিয়তসহ ইহরাম পরিধান করে আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা এবং মিনা, মুজদালিফা অবস্থান করা ও পবিত্র কাবা শরিফ তাওয়াফ ও সাঈ করা হজ।
মক্কায় কাবাঘর প্রদক্ষিণ, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান, সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে দৌড়ানো, মিনার জামারায় পাথর নিক্ষেপ, আল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি ইত্যাদি হজের ইবাদত।
এর প্রতিটি ইবাদতের মধ্যেই রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্য। এগুলোর সঙ্গে হজরত ইবরাহিমের (আ.) হাতে তার ছেলে হজরত ইসমাইলের (আ.) কোরবানি, আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা–বিশ্বাস, আনুগত্যের শিক্ষা রয়েছে।
এক নজরে হজের কার্যক্রম
৮ জিলহজ সোমবার: মিনায় অবস্থান
৯ জিলহজ মঙ্গলবার সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত: আরাফাতে অবস্থান
৯ জিলহজ মঙ্গলবার সূর্যাস্তের পর থেকে, রাতে মুজদালিফায় অবস্থান
১০ জিলহজ বুধবার: মিনায় অবস্থান, জামারায় বড় শয়তানকে কংকর নিক্ষেপ, কোরবানি, মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোটো করা। মসজিদুল হারামে গিয়ে তা্ওয়াফ, সাঈ করা।
১১ জিলহজ বৃহস্পতিবার: মিনায় অবস্থান; ছোট, মধ্যম, বড় শয়তানকে পাথর মারা।
১২ জিলহজ শুক্রবার: মিনায় অবস্থান; ছোট, মধ্যম, বড় শয়তানকে পাথর মারা, বিদায়ী তাওয়াফ ।
*১৩ জিলহজ যদি অবস্থান করেন: মিনায় অবস্থান; ছোট, মধ্যম, বড় শয়তানকে পাথর মারা
হজ পালনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মুসলমানরা ৮ থেকে ১৩ জিলহজ মিনা, আরাফাত ও মুজদালিফায় অবস্থান করবেন। এই যাত্রার শুরুতে সোমবার তারা জড়ো হন তাবুনগরী মিনায়।
সারা দিন মিনায় থেকে মঙ্গলবার ফজরের নামাজ পড়ে সমবেত হন প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে আরাফাতের ময়দানে।
আরাফাহ ও আরাফাত—এই দুটি শব্দই আরবিতে প্রচলিত। দৈর্ঘ্যে দুই মাইল, প্রস্থেও দুই মাইল এই বিরাট সমতল ময়দানের নাম আরাফাত। ময়দানের তিন দিক পাহাড়বেষ্টিত। এই আরাফাতে আছে জাবালে রহমত বা রহমতের পাহাড়। জাবাল মানে পাহাড়। এই পাহাড়ে একটি উঁচু পিলার আছে। একে কেউ কেউ দোয়ার পাহাড়ও বলেন। পিলারের কাছে যাওয়ার জন্য পাহাড়ের গায়ে সিঁড়ি করা আছে।
আরাফাত ময়দান মিনা থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে। এ ময়দানের প্রান্তে থাকা মসজিদটির নাম মসজিদে নামিরাহ। এ মসজিদে মিনার আছে ছয়টি। প্রতিটি মিনারের উচ্চতা ৬০ মিটার। মসজিদটিতে ৬৪টি গম্বুজ এবং ১০টি প্রধান দরজা রয়েছে।
এ মসজিদের জামাতে অংশগ্রহণকারী হাজিরা জোহর ওয়াক্তে এক আজানে দুই ইকামতের সঙ্গে একই সময় পরপর জোহর ও আসরের নামাজ আদায় করবেন। নামাজের আগে ইমাম হজের খুতবা দেবেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিমদের জন্য হজের খুতবা বাংলাসহ ৫০টির বেশি ভাষায় সরাসরি অনুবাদ করে সম্প্রচার করা হবে।
সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে গেলে আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন হাজিরা। কিবলার দিকে মুখ করে দুই হাত উঁচু করে আল্লাহর গুণবাচক নাম, দরুদে ইবরাহিম, তালবিয়া, তাকরির, জিকির, ইস্তিগফার ও দোয়া করবেন তারা।
তারা সূর্যাস্ত পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে আরাফাতের ময়দান থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে মুজদালিফায় গিয়ে মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করবেন। রাতে সেখানে খোলা মাঠে অবস্থান করবেন এবং শয়তানের প্রতিকৃতিতে নিক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় (৪৯-৭০টি) পাথর সংগ্রহ করবেন।
বলা হয়, হজরত ইব্রাহিম (আ.) নিজ সন্তান ইসমাইলকে (আ.) কোরবানি করার জন্য মিনায় নিয়ে যাচ্ছিলেন। জামারায় পৌঁছালে শয়তান তাকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করে। তখন শয়তানকে লক্ষ্য করে তিনি পাথর নিক্ষেপ করেন।
তিন শয়তানকে তাকবিরসহ পাথর নিক্ষেপ করা হজের অপরিহার্য অংশ। শয়তানের প্রতি ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এই পাথর নিক্ষেপ করা হয়।
শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের সময় যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে, সে জন্য সৌদি হজ কর্তৃপক্ষ হাজিদের ভাগ ভাগ করে জামারাতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে।
জামারা কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত, এখানে তাপমাত্রা থাকে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য জামারার ভেতরে একাধিক ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা আছে। রয়েছে পর্যাপ্ত টয়লেট, খাবারের দোকান ও সেলুন। জরুরি প্রয়োজনে হেলিকপ্টার অবতরণের জন্য রয়েছে হেলিপ্যাডও।
পাথর নিক্ষেপের সুবিধার্থে মিনার পূর্ব দিক থেকে আসা হাজিরা আসবেন নিচতলা ও দোতলায়, মক্কা থেকে আসা হাজিরা তৃতীয় তলায়, উত্তর দিক ও মোয়াইসিম থেকে আসা হাজিরা চতুর্থ তলায় এবং আজিজিয়া থেকে আসা হাজিরা পঞ্চম তলায় উঠে পাথর নিক্ষেপ করবেন।
১২টি করে ঢোকার ও বের হওয়ার পথ আছে এখানে। এখন হাজিদের পাথর মারার নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া আছে। মোয়ালেম নম্বর অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে পাথর মারতে হয়।
বুধবার মুজদালিফায় ফজরের নামাজ আদায় করে হাজিরা কেউ ট্রেনে, কেউ গাড়িতে, কেউ হেঁটে মিনায় যাবেন এবং নিজ নিজ তাঁবুতে ফিরবেন।
জামারায় শয়তানের প্রতিকৃতিতে পাথর নিক্ষেপের পর হাজিদের পশু কোরবানির প্রস্তুতি নিতে হয়। বুধবার তারা মিনায় বড় শয়তানকে সাতটি পাথর মারার পর পশু কোরবানি দেবেন।
অধিকাংশ হাজি ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকে ৭২০ রিয়াল জমা দিয়ে কোরবানি দেবেন। কেউ কেউ নিজে বা বিশ্বস্ত লোক দিয়ে মুস্তাহালাকায় (পশুর হাট ও জবাই করার স্থান) গিয়ে কোরবানি দেবেন।
তারপর তারা মাথার চুল ছেঁটে গোসল করবেন। সেলাইবিহীন দুই টুকরা কাপড় বদল করবেন। এরপর স্বাভাবিক পোশাক পরে (১০ থেকে ১৩ জিলহজের মধ্যে যে কোনো সময়) মিনা থেকে মসজিদুল হারামে গিয়ে কাবা শরিফ সাতবার তাওয়াফ করবেন।
কাবার সামনের দুই পাহাড় সাফা ও মারওয়ায় ‘সাঈ’ (সাতবার দৌড়াবেন) করবেন হাজিরা। সেখান থেকে তারা আবার মিনায় যাবেন।
১১ থেকে ১৩ জিলহজ মিনায় যত দিন থাকবেন, তত দিন তিনটি (বড়, মধ্যম, ছোট) শয়তানকে ২১টি পাথর মারবেন। আবার মসজিদুল হারামে গিয়ে কাবা শরিফ বিদায়ী তাওয়াফ করার পর নিজ নিজ দেশে ফিরবেন। যারা হজের আগে মদিনায় যাননি, তারা মদিনায় যাবেন।