বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক এসোসিয়েশনের (বিপিজিএমইএ) পরিচালনা পরিষদের ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের জন্য একতরফা নির্বাচন করার পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন সংগঠনের সাধারণ সদস্যরা। এ কারণে আসন্ন নির্বাচন স্থগিত করে এখানে প্রশাসক নিয়োগ ও পুনঃতফসিল ঘোষণার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি আবেদন জমা দিয়েছেন তারা। বাণিজ্য সচিব বরাবর আবেদনটি করেন বিপিজিএমইএ’র সদস্য ও ইমপ্রুভ এক্সেসরিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে.এম জহির ফারুক।
বিপিজিএমইএ’র সদস্যরা জানান, বর্তমান সভাপতি শামীম আহমেদ দায়িত্বে থেকেই নিজের মতো করে একটি নির্বাচন করে আবারও সভাপতি হতে চান বলে অভিযোগ উঠেছে। শামীম আহমেদের নেতৃত্বাধীন বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ এই সংগঠনের সাবেক সভাপতি ও এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি জসিম উদ্দিনের অনুসারী। জসিম উদ্দিন পতিত আওয়ামী সরকারের আমলে এফবিসিসিআই’র সভাপতি থাকাকালীন অনেক সুবিধা নিয়েছেন। এখন তিনি অনেকটা অন্তরালে থেকে বিপিজিএমইএ’র আসন্ন নির্বচানে তার অনুসারীদের জেতাতে যেনতেনভাবে একটি নির্বাচন করার জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ জানিয়েছেন সদস্যরা। এ জন্য বিপিজিএমইএ’র সাধারণ সদস্যরা সিডিউল অনুযায়ী আগামী ১৭ই মে নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে, তা স্থগিত করে প্রশাস নিয়োগ ও পুনঃ তফসিল ঘোষণার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি আবেদন জমা দিয়েছেন।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাণিজ্য সংগঠন কর্তৃক অনুমোদিত ও এফবিসিসিআই-এর সদস্যভুক্ত ‘বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক এসোসিয়েশন (বিপিজিএমই) গঠন করা হয়, যা প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারকদের প্রতিনিধিত্ব করে। সংগঠনটির গত ২০০৪ সালে সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর, বিগত দীর্ঘ ২০ বছর যাবৎ প্রকার নির্বাচন ছাড়াই আওয়ামী শাসক ও তার দোসররা মিলে কোনো প্রকার নির্বাচন করতে দেয়নি এবং এখনো অনির্বাচিত সদস্যদের দ্বারাই সংগঠনটি পরিচালিত হচ্ছে।
আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, আওয়ামী দোসররা স্বৈরাচারী সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট মো. জসীম উদ্দিন কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে সুদীর্ঘকাল কোনো প্রকার এজিএম বা ইজিএম, এমনকি বোর্ড মিটিংয়েও বিষয়গুলো উপস্থাপন না করে একতরফা ও অবৈধভাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। যেমন; কোনো ক্রয় কমিটি বা যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে জমি ক্রয় করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। প্রায় ১৫ বছর পূর্বে ৫ কোটি এবং ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই একটি দুর্বল ব্যাংক ও দেউলিয়া প্রায় লিজিং কোম্পানিতে ব্যক্তিগত স্বার্থ সিদ্ধির লক্ষ্যে এফডিআর করা হয়েছিল। ওই অর্থের আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
আশ্চর্যের বিষয়, বোর্ডের কোনো প্রকার অনুমতি গ্রহণ ছাড়াই এবং সংবিধানের বিধি-বহির্ভূতভাবে ৫ থেকে ১০ বছর যাবত চাঁদা প্রদান করেন না এমন সদস্যদের অনেকের নিকট পাওনা চাঁদা পূর্ণ মওকুফ অথবা ৫০ ভাগ চাঁদা রেয়াত দিয়ে বেআইনিভাবে সদস্যপদ পুনঃনবায়ন করা হয়েছে।
সমিতির সদস্য হওয়ার জন্য প্রধান ও আবশ্যিক শর্ত হলো- আবেদনকারী পক্ষকে অবশ্যই শিল্প-কারখানার মালিক হতে হবে। কিন্তু বর্তমান কমিটির সদস্য যারা দীর্ঘ ২০ বছর ধরে বহাল তবিয়তে আছেন, তারা প্রভাব খাটিয়ে তাদের পছন্দের নিকট আত্মীয়দের ভোটার বানানো সহ অযোগ্যদের সদস্য বানিয়ে রেখেছেন। ফলে প্লাস্টিক শিল্পের উন্নয়নে তারা কোনো ভূমিকায়ই রাখছেন না বরং তাদের একমাত্র কাজ হলো পেশী শক্তি প্রদর্শন করে সাধারণ ও মৌলিক সদস্যদের মনে ভীতি প্রদর্শন করা।
আবেদন পত্রে আরও বলা হয়, আওয়ামী পরিবারের আশীর্বাদপুষ্ট মো. আব্দুর রাজ্জাককে (যিনি এখন শারিরীকভাবে ভীষণ অসুস্থ) ২০০৪ সালের ২৬শে আগস্ট থেকে বিপিজিএমইএ’র নির্বাচন পরচালনা পর্ষদে চেয়ারম্যান হিসেবে তাকে নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি চতুরতার সঙ্গে ও পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে যোগশাজশ করে এ যাবতকালের মধ্যে কোনো প্রকার নির্বাচন দেন নাই। এই পরিস্থিতিতে বিপিজিএমইএ’র বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত ঘোষণা করে একজন দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসক নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন সংগঠনটির সাধারণ সদস্যরা। একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদের ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের অনুষ্ঠিতব্য আগামী ১৭ই মের নির্বাচনী তফসিল বাতিল করে পুনঃতফসিল ঘোষণারও দাবি জানানো হয়।
এদিকে বিপিজিএমইএ’র বর্তমান সভাপতি শামীম আহমেদের নেতৃত্বাধীন বর্তমান পর্ষদের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছরের নভেম্বর মাসে। এর পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে ৩ মাস করে দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে নিয়েছেন শামীম আহমেদ। দ্বিতীয় দফার বর্ধিত মেয়াদের সময় শেষ হবে আগামী ২১শে মে। তার আগেই ১৭ই মে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সিডিউল ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ নির্বাচনের সিডিউল ঘোষণার পরেও গত মঙ্গলবার শামীম আহমেদের নেতৃত্বাধীন বর্তমান পর্ষদ আবারও ৩ মাসের সময় বাড়ানোর জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন জমা দেন বলে জানা গেছে। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিপিজিএমইএ’র বর্তমান পর্ষদের মেয়াদ আগামী ২০শে আগস্ট পর্যন্ত আরও তিন মাস বাড়িয়ে দিয়েছে।
নির্বাচনের সিডিউল ঘোষণার পর আবারও মেয়াদ বৃদ্ধি করার খবরে চরম ক্ষুব্ধ হয়েছেন বিপিজিএমইএ’র সাধারণ সদস্যরা। বর্তমান পর্ষদের এ ধরনের খামখেয়ালির কারণেই সাধারণ সদস্যরা পর্ষদ বিলুপ্ত করে প্রশাসক বসানোর জোর দাবি জানিয়েছেন।
মেয়াদ বৃদ্ধি, প্রশাসক বসানোর বিষয় সহ সার্বিক বিষয়ে বিপিজিএমইএ’র বর্তমান সভাপতি শামীম আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, নিয়ম মেনেই মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। আর এফবিসিসিআই সহ অনেক ব্যবসায়ী সংগঠনের সরকার প্রশাসক বসালেও বিপিজিএমইএতে সরকার প্রশাসক বসায়নি-কারণ এখানে কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি এবং কোনো কাগজপত্রের ঘাপলা নাই। আর এই সংগঠনে সাবেক সভাপতির কোনো প্রভাব নেই বলে জানান তিনি।
বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের খামখেয়ালি ও যেনতেন নির্বাচন করার বিষয়ে বিপিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি কেএম আলমগীর ইকবাল বলেন, সাবেক সভাপতি জসিম উদ্দিন ও তার সমর্থকরা গত ২৩-২৪ বছর ধরে এই সংগঠন এক রকম জবরদখল করে রেখেছেন। এই সংগঠন শিল্প মালিকদের, যারা শিল্প মালিক তারাই সদস্য হবেন এখানে। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে শিল্প মালিক না, এমন অনেককে সদস্য করা হয়েছে। এভাবে ভুয়া ভোটার বানিয়ে তারা একটা যেনতেনভাবে নির্বাচন করে আবার চেয়ার ধরে রাখতে চায়। এ জন্য আমরা সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছি পর্ষদ ভেঙে যেন প্রশাসক বসানো হয়।