মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬, ০৪:২৫ অপরাহ্ন




আগে দেয়া থাকলে আবারও কি দিতে হবে হামের টিকা?

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬ ৬:৪৭ pm
Staff Nurse নার্স Omicron ভ্যাকসিন vaccine vaccination Booster Dose কোভিড ১৯ টিকা করোনা corona covid corona covid করোনা বুস্টার ডোজ করোনাভাইরাস করোনা ভাইরাস নার্স সেবিকা নার্সিং পেশা
file pic

বাংলাদেশে বর্তমানে শিশুদের সুরক্ষার জন্য দেশব্যাপী হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান কর্মসূচি চালু হয়েছে। অনেক অভিভাবকের মনে প্রশ্ন—যদি শিশু ইতিমধ্যে দুই ডোজ টিকা নিয়ে থাকে, তাহলে আবার কেন অতিরিক্ত ডোজ দরকার? এর উত্তর লুকিয়ে আছে হার্ড ইমিউনিটি এবং হাম রোগের অত্যন্ত সংক্রামক স্বভাবের মধ্যে।

হাম পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১২–১৮ জন পর্যন্ত সংবেদনশীল ব্যক্তিকে সংক্রমিত করতে পারে। একে বলে বেসিক রিপ্রডাকশন নাম্বার। করোনার ক্ষেত্রে এটি ছিল ২ থেকে ৪.৬। হামের জীবাণু বাতাসে ২ ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। এই উচ্চ সংক্রমণ ক্ষমতার কারণে হাম প্রতিরোধে হার্ড ইমিউনিটি ৯৫% এর বেশি হওয়া জরুরি। হার্ড ইমিউনিটি বলতে বোঝায়—যখন একটি জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ মানুষ কোনো রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়, তখন রোগের বিস্তার কমে যায় এবং পুরো সমাজ সুরক্ষিত থাকে।

সব সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে এত বেশি হার্ড ইমিউনিটি প্রয়োজন হয় না। যেমন—ইনফ্লুয়েঞ্জা: প্রায় ৫০–৭০%, কোভিড-১৯ (প্রাথমিক ধারণা): প্রায় ৬০–৭০%, হাম: সর্বোচ্চ, প্রায় ৯২–৯৫% বা তারও বেশি। যদিও হাম টিকার দুই ডোজ প্রায় ৯৭% সুরক্ষা দেয়, তবুও কিছু শিশু সম্পূর্ণ সুরক্ষিত হয় না। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এই সামান্য ফাঁকও বড় আকারের প্রাদুর্ভাব সৃষ্টি করতে পারে।

এই কারণেই গণটিকাদান কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মত অনুযায়ী, এসব কর্মসূচির লক্ষ্য হলো দ্রুত জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চমাত্রার প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করা এবং পূর্বের টিকাদানের ঘাটতি পূরণ করা। একইভাবে ইউনিসেফ এই কর্মসূচিগুলোকে হাম নির্মূলে কার্যকর বলে উল্লেখ করেছে। ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অফ পেডিয়াট্রিকস-ও অতিরিক্ত ডোজকে নিরাপদ ও প্রয়োজনীয় হিসেবে সমর্থন করে।

অতিরিক্ত হাম-রুবেলার টিকা: ব্যক্তিগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়, তবে প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ২ ডোজ নেওয়া থাকলেও নিরাপদ ও উপকারী।

বিষয়টি এমন নয় যে এবারই প্রথম বাড়তি ডোজ দেওয়া হচ্ছে (অর্থাৎ আগে দুই ডোজ দেওয়া থাকলে নতুন করে অতিরিক্ত ডোজ দেওয়ার কর্মসূচি নতুন নয়)। ২০২০ সালেও একইভাবে প্রায় ৩ কোটি বাচ্চাকে হামের বাড়তি টিকা দেওয়া হয়। আগে দুই ডোজ দেওয়া থাকলেও যেসব শিশুকে তখন বাড়তি টিকা দেওয়া হয়েছিল সেসব বাচ্চাদের কারোরই সমস্যা হয়নি। আপনার আশেপাশে খোঁজ করলেই এমন বাচ্চাদের তথ্য পাবেন।

বাংলাদেশে হামের টিকা ১৯৮৯ সাল থেকে এককভাবে দেওয়া হচ্ছে। এরপর ২০১২ সাল থেকে হাম-রুবেলা নামে শিশুদের দেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত এই টিকা দেওয়ার পর মারাত্মক কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়েছে বলে জানা যায়নি। তাই এই টিকা নিরাপদ।

অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করেছেন: ‘যারা আগে টিকা দেয়নি তারা নিলেই তো টিকাদানের হার বাড়বে, হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হবে। যারা আগে নিয়েছে তাদের পুনরায় টিকা নেওয়ার সাথে হার্ড ইমিউনিটির কী সম্পর্ক?’

১) মূল ধারণা: শুধু ‘টিকা দেওয়া’ নয়, কার্যকর ‘রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা’ দরকার। হার্ড ইমিউনিটি নির্ভর করে কতজন মানুষের শরীরে সত্যিকারের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে তার ওপর, শুধু টিকা নেওয়ার সংখ্যার ওপর নয়।

২) সব টিকা নেওয়া শিশুর শরীরে সমান ‘রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা’ তৈরি হয় না। ১–২ ডোজ নেওয়ার পরও কিছু শিশুর শরীরে যথেষ্ট ইমিউনিটি তৈরি হয় না, ফলে তারা এখনও সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে।

৩) হার্ড ইমিউনিটি পরিমাপ করার সময় ‘কার্যকর রোগ প্রতিরোধী’ মানুষ ধরা হয়। কতজন টিকা দিয়েছে তা ধরা হয় না। যদি ৯৫% শিশু টিকা নেয় কিন্তু বাস্তবে কিছু শিশু ইমিউন না হয়, তাহলে কার্যকর ইমিউনিটি ৯৫% এর নিচে থেকে যায়—যা হাম নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট নয়।

৪) অতিরিক্ত ডোজ এই ‘গ্যাপ’ পূরণ করে। অতিরিক্ত ডোজ দেওয়ার মাধ্যমে যাদের আগে ইমিউনিটি হয়নি তারা সুরক্ষা পায় এবং যাদের কম ছিল তাদের ইমিউনিটি বৃদ্ধি পায়।

৫) কেন সবাইকে একসাথে দেওয়া হয়, আলাদাভাবে খুঁজে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি শুধু তাদের দেওয়া হচ্ছে না কেন? কোনো বাচ্চার শরীরে ইমিউনিটি আছে আর কার শরীরে নেই—তা আলাদাভাবে নির্ণয় করা মাঠ পর্যায়ে দুরূহ কাজ। এটি সাধারণ ল্যাব টেস্টে বোঝাও যায় না। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী সবাইকে একসাথে টিকা দেওয়া হয়।

৬) আউটব্রেক কন্ট্রোল = দ্রুত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি। গণটিকাদান দ্রুত সবার মধ্যে সমানভাবে ইমিউনিটি বাড়ায়, ফলে সংক্রমণের চেইন ভেঙে যায়।

হার্ড ইমিউনিটি নির্ভর করে ‘কার্যকর ইমিউন মানুষের সংখ্যা’-র ওপর, শুধু ‘কতজন টিকা নিয়েছে’ তার ওপর নয়।

আগে টিকা নেওয়া শিশুদের আবার টিকা দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো: যাদের ইমিউনিটি হয়নি তাদের কাভার করা, যাদের ইমিউনিটি কম তাদের বুস্ট করা। এতে করে কার্যকর রোগ প্রতিরোধ ≥৯৫% হয়, যা হাম নিয়ন্ত্রণের জন্য অত্যাবশ্যক।

ডা. আবু সাঈদ শিমুল, শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD