একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) এখন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ‘বোঝা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই নির্বাচনের আগে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকায় এই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনগুলো কিনেছিল কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন। ওই নির্বাচনে মাত্র ৬টি আসনে ইভিএমে ভোট গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীকালে বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও ইভিএম ব্যবহার করা হয়। তারপর থেকে দেশের বিভিন্ন গুদামে এগুলো পড়ে আছে।
ইসির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অব্যবহৃত এই ইভিএমের রক্ষণাবেক্ষণের পেছনে ব্যয় বাড়ছে। এই খরচ বহন করতে অনাগ্রহ দেখিয়েছে ইসি।
বিপাকে ইসি
ইভিএম প্রকল্পের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। তবে আরও একবছর বাড়ানো হয় প্রকল্পের সময়। সেই সময়ও শেষ হয়েছে ২০২৪ সালের জুন মাসে। পরে ২০২৬ সালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার বাতিল করে এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কমিশন। পাশাপাশি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) থেকেও বাদ দেওয়া হয় ইভিএমের অংশ।
ইসির যুগ্মসচিব মো. মঈন উদ্দিন খান বলেন, ‘‘ইভিএম নিয়ে এখনও অনেক জটিলতা রয়েছে। এ নিয়ে দুদকের দায়ের করা একটি মামলা এখনও চলমান। তাই এ বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ নিতে গেলেই বিষয়টি জটিল হয়ে পড়ে।’’
তিনি বলেন, ‘‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নির্বাচন সংস্কার কমিশন বলেছিল, ইভিএম আর ব্যবহার করার দরকার নেই। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে, তারাও একই মত দিয়েছে। ফলে ইসি এখন আর ইভিএম ব্যবহার করতে চায় না। কিন্তু সমস্যা হলো— এগুলো তো সরকারি সম্পদ। ব্যবহার না করলে সেগুলোর কী হবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’’
মঈন উদ্দিন বলেন, ‘‘তবে এখানে আরেকটি জটিলতা আছে। যেহেতু ইভিএম নিয়ে মামলা হয়েছে, তাই এগুলো এখন মামলার আলামতের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ইভিএম এখন একধরনের আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। চাইলেই এগুলো সরিয়ে ফেলা বা অন্যভাবে ব্যবহার করা সম্ভব নয়।’’
ইভিএম নিয়ে ইসির পরিকল্পনা জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘‘মোটামুটি দেড় লাখের মতো ইভিএম আছে। আমাদের অবস্থান হলো— আমরা শুধু ইনভেন্টরি করে সরকারের ঘাড়ে দায়িত্ব দিতে চাই।’’
তিনি বলেন, কমিশনের পরিকল্পনা হচ্ছে, একটা ইনভেন্টরি করা হবে। স্যাম্পলিংয়ের মাধ্যমে দেখা হবে কতগুলো আছে, কী অবস্থায় আছে। তারপর সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলা হবে— আপনারা এগুলো নিয়ে যান। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ভবিষ্যতে নির্বাচন কমিশন এগুলো দিয়ে আর নির্বাচন করবে না। এগুলোর মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে।’’
রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘‘দুর্নীতি দমন কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে মামলার জন্য কিছু নমুনা রেখে দেওয়া হবে। বাকিগুলো সরকারকে দিয়ে বলা হবে— আপনারা নিষ্পত্তি করেন। যেটা ব্যবহারযোগ্য, ব্যবহার করেন। যেটা ফেলে দিতে হয়, ফেলে দেন। যেটা বিক্রি করা যায়, বিক্রি করেন। আর যদি সরকার কোনোভাবেই নিতে না চায়, তাহলে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে নিলামে বিক্রি করবো।’’
কত ইভিএম কোথায় আছে, ইসির ব্যয় কত?
ইসি সূত্র থেকে জানা যায়, গাজীপুরের বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির গুদামসহ দেশের বিভিন্ন গুদামে বর্তমানে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫২২টি ইভিএম রয়েছে। গুদাম ভাড়া বাবদ জমছে বকেয়ার বিশাল অঙ্ক।
সূত্র আরও জানায়, বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি-বিএমটিএফ তাদের গুদামের প্রতি বর্গফুটের ভাড়া ধরেছে ১৫১ টাকা করে। আর সে হিসাবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে বকেয়া ভাড়া বাবদ ৭০ কোটি টাকা দাবি করেছে বিএমটিএফ। জানা গেছে, ইসি এখন পর্যন্ত এই টাকা পরিশোধ করেনি। অপরদিকে দেশের বিভিন্ন গুদামে রাখা ইভিএমের জন্য ভাড়া বাবদ ইসিকে প্রতি মাসে ১৫ শতাংশ ভ্যাটসহ গুনতে হচ্ছে ৩৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮১৮ টাকা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘‘কোটি কোটি টাকা ভাড়া যাচ্ছে। আমরা বলছি, এই ভাড়া কীভাবে দেবো? তাই আমরা চিন্তা করছি একটি ইনভেন্টরি করার।’’
বিএমটিএফের ভাড়া বাবদ বকেয়া ৭০ কোটি টাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আমরা তাদের মৌখিকভাবে বলেছি— আমাদের কোনও টাকা নেই, দিতে পারবো না। তারা টাকা চাইছে, আর আমরা বিষয়টা ঝুলিয়ে রেখেছি।’’
রহমানেল মাছউদ বলেন, একটা প্রকল্প হলে তার মেইনটেন্যান্স, স্টোরেজ— এসবের বাজেটও থাকার কথা। যদি ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হয়, তাহলে স্টোরেজের জন্যও বরাদ্দ থাকা উচিত ছিল। কোথায় রাখবো, কীভাবে রাখবো— এসবের পরিকল্পনা থাকা দরকার ছিল। আমাদের হাতে এ ধরনের কোনও খাত নেই, যেখান থেকে এই টাকা দেবো। জেলা পর্যায়েও বিভিন্ন জায়গায় স্টোর ভাড়া করা হয়েছে। সেখানেও সমস্যা আছে। প্রাইভেট কোম্পানিগুলো ভাড়া চাচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান হলে একভাবে কথা বলা যায়, কিন্তু ব্যক্তিগত গুদামের মালিকদের তো কিছু না কিছু দিতেই হবে। আমার ব্যক্তিগত মত হলো—কম হোক, বেশি হোক— তাদের (ব্যক্তিগত গুদামের মালিকদের) সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে কিছু ভাড়া নির্ধারণ করে তা দেওয়া উচিত।’’
ইভিএম নিয়ে টিআইবি’র সুপারিশ
অব্যবহৃত-অকেজো ইভিএমের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে একাধিক সুপারিশ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তাদের দেওয়া সুপারিশগুলো হলো:
১. ইভিএম সংরক্ষণের জন্য প্রতি মাসে বিপুল অর্থ ব্যয়সহ রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধ এবং পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে ইভিএম সংক্রান্ত চলমান মামলা দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
২. নির্বাচন-সংক্রান্ত তথ্য ও ভোটারের তথ্য অপব্যবহারের ঝুঁকি হ্রাসে নিলামের আগেই ইভিএমে সংরক্ষিত সব তথ্য মুছে ফেলা এবং সব হার্ডওয়্যার উপযুক্তভাবে ভেঙে ফেলতে হবে এবং তা যে করা হয়েছে— তা নিশ্চিত করতে একটি ‘নিষ্পত্তি সনদ’ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৩. ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১ অনুসরণ করে ইভিএমকে ই-বর্জ্য হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করতে হবে এবং একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ ইভিএম লট আকারে নিলামে বিক্রয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদফতরের অধীনে নিবন্ধিত অভিজ্ঞ ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং কোম্পানিদের কাছে দরপত্র আহ্বানের ব্যবস্থা করতে হবে— যাদের খ্যাতনামা আইটি ব্র্যান্ড, মোবাইল টেলিফোন সেবাপ্রতিষ্ঠান, পুলিশ ও প্রতিরক্ষা বিভাগের সংবেদনশীল ই-বর্জ্য ও যন্ত্রপাতি ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা রয়েছে, যেন নিরাপদ ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ ও পরিবেশগত ঝুঁকি নিরসনের পাশাপাশি সম্ভাব্য রাজস্ব প্রাপ্তির স্বার্থে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা যায়। বাংলা ট্রিবিউন