পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়কমন্ত্রী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করেছেন। সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে তিনি তার পদত্যাগপত্র জমা দেন। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পদত্যাগপত্রে কারণ হিসাবে শারীরিক অসুস্থতার কথা বলা হয়েছে। তবে এই পদত্যাগকে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ষড়যন্ত্রকে দায়ী করে রাঙামাটিতে রাজপথে বিক্ষোভ করেছে দলের একটি অংশ। বিকালে জেলা বিএনপি কার্যালয়ের সামনে সড়ক অবরোধ করে এ বিক্ষোভ করেন তারা। নেতাকর্মীরা বলছেন, তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ। তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে।
এদিকে মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, অসুস্থতা কোনো বিষয় নয়, দীপেন দেওয়ান একরকম বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করেছেন। পাবর্ত্য মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতির একটি বড় সিন্ডিকেট রয়েছে। তিনি ওই সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য কয়েক দফা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু অদৃশ্য কারণে পারেননি। এবারও সিন্ডিকেট ভাঙতে না পেরে তিনি এই পথে হাঁটলেন। তিনি শতভাগ সৎ মানুষ।
সূত্রমতে, প্রথমবার সংসদ-সদস্য হয়েই পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব পান দীপেন দেওয়ান। শেখ হাসিনার পতন-পূর্ববর্তী রাঙামাটি বিএনপির অভিভাবক হিসাবে কাজ করেছেন তিনি। অবরোধ, মিছিল-মিটিংয়ের সবখানেই ছিলেন তিনি।
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের অনেকের ভাষ্য, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলালের সঙ্গে বিরোধ এবং জেলা বিএনপির কিছু শীর্ষ নেতার সঙ্গে দ্বন্দ্ব দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের আসল কারণ। নির্বাচনের তিন মাস পার হলেও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের পুনর্গঠন আজও হয়নি। খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে তুলনামূলকভাবে জটিলতা কম থাকলেও রাঙামাটি জেলা পরিষদ পুনর্গঠন নিয়ে নানা সমীকরণ সামলাতে হয়েছে তাকে। দলীয় নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, বিভিন্ন পক্ষের মতামত, সাংগঠনিক ভারসাম্য রক্ষা এবং পারিবারিক চাপ সব মিলিয়ে তিনি একটি কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ছিলেন।
এ বিষয়ে ফোনে জানতে চাইলে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মো. হেলাল উদ্দীন বলেন, আমি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবরটি দেখেছি। কী কারণে পদত্যাগ করেছেন তা বিস্তারিত জানতে পারিনি। অসুস্থতার খবর শুনেছি।
কাউখালী উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি সাজাইমং মারমা বলেন, ষড়যন্ত্র করে পার্বত্যমন্ত্রী দীপেন দেওয়ানকে পদত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে। দলের কিছু স্বার্থান্বেষী কুচক্রী আছেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসরদের যারা লালন-পালন করছেন মূলত তারাই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার দীপু বলেন, পার্বত্যমন্ত্রী কেন পদত্যাগ করেছেন, সেটি তিনি তার পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন। আমাদের দলে কোনো কোন্দল নেই।
এদিকে মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান হাঁটুর ব্যথায় ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছেন না। থাইল্যান্ডে গিয়ে চিকিৎসাও করিয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী কিংবা সচিবের সঙ্গে কোনো ধরনের মনোমানিল্য ছিল না তার।
প্রতিবাদ, অবরোধ : দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ প্রত্যাহারের দাবিতে বিকালে জেলা বিএনপির দলীয় কার্যালয়ের সামনে দেড় ঘণ্টাব্যাপী সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন জেলা বিএনপির কয়েকশ নেতাকর্মী। তারা বলেন, দীপেন দেওয়ান সম্পূর্ণ সুস্থ। তিনি দায়িত্ব পালনে সক্ষম। তার বিরুদ্ধে দলের স্থানীয় কিছু কুচক্রী ও স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তারা দীপেন দেওয়ানকে পদত্যাগে বাধ্য করছেন। তাই আজকে তারা এ কর্মসূচিতে উপস্থিত হননি। পুনর্বহালের ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত রাজপথ ছাড়া হবে না। এ সময় জেলা বিএনপির সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম চৌধুরী ভুট্টো, সাইফুল ইসলাম পনির, ছাবের আহম্মদ, মুজিবুর রহমান, মানস মুকুর চাকমা, জেলা মহিলা দলের আহ্বায়ক নুরজাহান বেগম পারুল, ইয়াছমিন বাবলীসহ উপস্থিত ছিলেন জেলার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বহু নেতাকর্মীও। এছাড়া বাঘাইছড়ি, কাউখালী উপজেলাসহ বিভিন্ন স্থানে মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ প্রত্যাহার দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহধর্মবিষয়ক সম্পাদক দীপেন দেওয়ান গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের সর্বোচ্চ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেন তিনি। দীপেন দেওয়ানের বাবা সুবিমল দেওয়ান ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা। রাঙামাটি জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বাবার পথ অনুসরণ করে ২০০৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে বিএনপির রাজনীতিতে যোগ দেন দীপেন দেওয়ান। ছাত্র অবস্থায়ও তিনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, রাঙামাটি সরকারি কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখার পাট চুকিয়ে রাজনীতিতেই থিতু হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও পরিবারের চাপে বিসিএসে পরীক্ষা দিতে বাধ্য হন ও সপ্তম বিসিএসে তিনি জুডিশিয়াল সার্ভিসে যোগ দেন। ২০০৬ সালে চারদলীয় জোট সরকারের শেষ সময়ে তৎকালীন উপমন্ত্রী মনিস্বপন দেওয়ান দলত্যাগ করলে খালেদা জিয়ার আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রায় ২০ বছরের জুডিশিয়াল সার্ভিসের চাকরি ছেড়ে যোগ দেন রাজনীতিতে। পরে একের পর এক কালো মেঘের ছায়া এসে পড়ে রাজনৈতিক জীবনে। ওয়ান-ইলেভেন সৃষ্টি হলে আটকে যায় দীপেন দেওয়ানের ভাগ্য। নতুন নির্বাচনি আইনের ফাঁদে আটকে পড়ে তিন মাসের জন্য ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচন করতে পারেননি দীপেন। ২০১০ সালে বিএনপির জেলা সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০১৬ সাল থেকে তিনি কেন্দ্রীয় বিএনপির ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির (শান্তিচুক্তি) পর ১৯৯৮ সালের ১৫ জুলাই পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠিত হয়। তখন এই মন্ত্রণালয়ের প্রথম মন্ত্রী করা হয় খাগড়াছড়ি আসন থেকে নির্বাচিত কল্পরঞ্জন চাকমাকে। ২০০১ সালে মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হন রাঙামাটির সংসদ-সদস্য মনিস্বপন দেওয়ান। ২০০৮ সালে প্রতিমন্ত্রী হন রাঙামাটির এমপি দীপংকর তালুকদার।
এরপর ২০১৪ ও ২০১৮ সালে দুই মেয়াদে প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রী হয়েছেন বান্দরবানের সংসদ-সদস্য বীর বাহাদুর। সবশেষ ২০২৪-এর দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের পর এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছিল খাগড়াছড়ির সংসদ-সদস্য কুজেন্দ্রলাল ত্রিপুরাকে। সে হিসাবে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন রাঙামাটির সাবেক সংসদ-সদস্য দীপংকর তালুকদার। এর ১২ বছর পর এবারের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর রাঙামাটি আসনের সংসদ-সদস্য দীপেন দেওয়ানকে পূর্ণমন্ত্রী করা হয়।
(যুগান্তর)